মূল্যায়ন
মোহাম্মদ ইয়াসিন আরাফাত সাগর
প্রকাশ : ২৫ নভেম্বর ২০২৫ ১০:০৭ এএম
মূল্যায়ন বলতে বুঝি সম্মান করা। সুবিধা দেওয়া। এগিয়ে দেওয়া। সুযোগ দেওয়া। পরিশ্রম বা কাজের প্রাপ্যতা দেওয়া। ছাত্র-ছাত্রী পড়াশোনায় কেমন করে তার মূল্যায়ন হয় পরীক্ষার মাধ্যমে। প্রতিষ্ঠানে মূল্যায়ন হয় প্রমোশনের মাধ্যমে। জীবনের মূল্যায়ন হয়Ñ অর্থ, যোগ্যতা, ক্ষমতা, সম্মান, অবস্থান, বংশগত গৌরব, সততার মাধ্যমে। আর রাজনীতিতে মূল্যায়ন হয় পদ-পদবি, নমিনেশন বা মনোনয়নের মাধ্যমে। বর্তমান সভ্যতায় একটি দেশ গণতন্ত্রের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। আর রাজনীতি হলো এই গণতন্ত্রের প্রাণ। ভোট হলো গণতন্ত্র প্রকাশের মাধ্যম। একজন ব্যক্তি গণতন্ত্র চর্চা করে গণতন্ত্র চর্চার প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে। দল ছাড়াও রাজনীতি চর্চা করা যায়। তবে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গণতন্ত্র চর্চা করলে ওই দেশের কিছু জনসংখ্যার সমর্থন পেতে সুবিধা হয়। এদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতায়, রাজনীতি ও গণতন্ত্র হলোÑ পরিশ্রম, ত্যাগতিতিক্ষা, লেগে থাকা, জীবন বাজি রাখা, নিজের রক্ত ঝরিয়ে, জীবন-যৌবন সুখ ত্যাগ করে, জেলজুলুম বরণ করে, অর্থ ব্যয় করে, গণতন্ত্র চর্চার মাধ্যমে, কোনো গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের হয়ে জনগণ দেশের সেবা করতে থাকা।
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা, জনগণের অধিকার আদায় করা, দেশকে স্বাধীন রাখা, দেশের উন্নয়নে আন্তর্জাতিকভাবে নিয়োজিত থাকা, এ সবকিছু একজন রাজনৈতিক দল এবং নেতাকে দেখতে হয় দেশ ও জনগণের হয়ে। যা জনগণের ভোট অর্জন করে, সরকার গঠনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। আর গণতন্ত্রের এ কাজে নিয়োজিত থাকা এসব ব্যক্তির মূল্যায়ন হয় দলের পদ পাওয়া নির্বাচন এলে মনোনয়ন বা নমিনেশন পাওয়ার মাধ্যমে। যখনই এর ব্যত্যয় হয়, নীতিনির্ধারকরা ভুল সিদ্ধান্ত নেনÑ অযোগ্যদের পদ, নমিনেশন দেন; তখনই দলে বিভেদ তৈরি হয়, দলের সুনাম নষ্ট হয়, দলে বিশৃঙ্খলাতা দেখা দেয়Ñ মনোনীত ব্যক্তি নির্বাচনে পাস করে আসতে পারেন না। দলকে শক্তিশালী করতে পারে না। তাদের দ্বারা দলের সুনাম বৃদ্ধি পায় না। দলের যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি করার মাধ্যম হতে পারে না। আর এসবের ইফেক্ট চলে আসে রাজপথে, সমাজে। জ্বালাও, পোড়াও, ভাঙচুর চলে। খারাপ লোক দলের পদ ও নমিনেশন পেয়ে অর্থনৈতিকভাবে, সামাজিকভাবে নিজে লাভবান হয় নিজস্ব লোকদের লাভবান করে। কেউ চাঁদাবাজি করে। কেউ জুলুম করে। কেউ চরিত্রহীনতার পরিচয় দেয়। বিগত সময় থেকে বর্তমান পর্যন্ত দেশে আমরা এসব দেখছি। তবে বড় পাওয়ার ব্যাপার হলো বর্তমান সমাজে ও দলে এখনও ভালো লোক আছে, যারা নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পেলে ভুলগুলো হবে না। এখনও যারা বিভিন্ন দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেনÑ বেশিরভাগ নেতারাই পরীক্ষিত। তৃণমূল থেকে রাজপথ হয়ে যোদ্ধা হয়েই উঠে এসেছেন।
দলকে শক্তিশালী করতে, সমাজকে ভালো রাখতে, দেশকে টিকিয়ে রাখতে ও এগিয়ে নিতে, আপনাদের পরিপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হবে। মতামত দিতে হবে। বাস্তবায়ন করাতে হবেÑ আবেগ দিয়ে, টাকা দিয়ে। পদ, মনোনয়ন দেওয়া যাবে না। আমার পছন্দের লোক না হলেও দলের লোক হলে, ভালো হলে, মনোনয়ন দিতে হবে। দলের পদ দিতে হবে। ভালো কাজ করতে না পারলে বাতিল করে দিতে হবে। খারাপ লোক দলের পদ ও নমিনেশন পেতে পারে। তবে কোনো শিশু দলের পদ ও নির্বাচনের নমিনেশন পায় না। বুঝের লোকেরাই পায়। তাদের লোভ তাদের খারাপ কাজের দ্বারা, দলে, সমাজে কোনো অপকর্ম হলে, সঙ্গে সঙ্গে তাদের বাদ দিতে হবে। এদেশের যোগ্য লোক প্রচুর আছেÑ দায়িত্ব পালনে অসুবিধা হবে না। কোনো রাজনৈতিক দলের প্রধান বা সর্বোচ্চ নেতৃত্ব দলে যারা থাকেন তারা কারও ভাই, কারও বন্ধু হয়ে থাকবে না। তারা জনগণের বন্ধু হবে, দেশের বন্ধু হবে।
মান্যতা থাকলে সহজেই অনেক কিছু সমাধান করা যায়। পীরের ছেলে পীর হতে পারে। ডাক্তারের ছেলে-মেয়ে বাবা-মাকে ছোটবেলা থেকে দেখে সুঁই, রোগী চিনে থাকে। বাহিনীর যারা সদস্য তাদের সন্তানরা অস্ত্র, যুদ্ধ এসব সম্পর্কে ধারণা পায়। এগুলো মিথ্যা না। পারিবারিক একটি শিক্ষা আছে সমাজে। ইমাম সাহেবের সন্তান কুরআন পাঠ, ইসলামী শিক্ষা খুব কাছ থেকে শিখতে পারে। যে যে কর্মের দায়িত্বে সব সময় আছে তাদের পরিবার, সন্তান-আত্মীয়রা সেসব বিষয় অনুধাবন করতে পারে।
অযোগ্যরা পদ পেলে তার পদের আওতাধীন সবই অযোগ্য হয়ে যায়। আর এর পরিধির মানুষরাই কষ্ট অনুধাবন করে। জনপ্রিয় ব্যক্তি বাদ দিয়ে কারও পছন্দের ব্যক্তি দলের মনোনয়ন পেলে, তার মনোনয়ন এর আওতাধীন সমাজ ও জনগণ এর কুফল অনুভব করে কুফলের শিকার হয়। জনগণের কাছে মূল্যায়ন চাওয়ার আগে।
নিজের দলের জনপ্রিয় লোকদের মূল্যায়ন করতে শিখুন। এখন আগের দিন নেই। প্রতীক বা মার্কা দেখে ভোট দেয় না সবাই। জনপ্রিয়তা ও সততার ইমেজ লাগে। আর যে সকল রাজনীতিবিদ নিজের সুবিধা আদায় করতে রাজনীতি করে থাকে তারা জনগণকে তাদের অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী মনে করেন। যে সব সময় জনগণ, কর্মীরা তাকে স্যার স্যার করবে, তার নিজের তৈরি করা নিয়মমতো তার কাছে আসবে, তার স্টাইলে চলবে। এমনটা রাজনীতি নাÑ এমনটা হলো নিজ নীতি। গণতন্ত্র না নিজ তন্ত্র। এরা রাজনৈতিক ব্যবসায়ী। রাজনীতিবিদ জনপ্রতিনিধির কাছে জনগণ নেতাকর্মী যখন দরকার তখনই আসতে পারবে। পারতে হবে। যারা রাজনীতিক ব্যবসায়ী তাদের ভিতর এরকম বদ-আকিদা দেখা যাচ্ছে। জনগণ, ভোটাররা তারা সবাই একই রকম না। কেউ শিক্ষিত, কেউ ধুলা-ময়লা জড়িত। তাদের পায়ে ধুলা থাকতে পারে, তাদের গায়ে ময়লা থাকতে পারে। তারা আপনাদের ড্রয়িংরুমে অনুমতি ছাড়া আসতে পারে। স্যার স্যার নাও করতে পারে। তবে তাদের দূরে ঠেলে দেওয়া যাবে না। খারাপ ব্যবহার করা যাবে না। তাদের কাজ না করা যাবে না। কারণ আপনি রাজনীতিবিদÑ এদের নিয়ে রাজনীতি করতে হবে। সবাই এক শ্রেণি-পেশার লোক না সমাজে। সবাই জনগণ, সবাই ভোটার, সবাই গণতন্ত্রের মানুষ।
যারা রাজনীতিবিদ, তাদের ড্রয়িংরুম হবে ঈদগাহ মাঠের মতন। এখানে সবাই সমানভাবে আসতে পারবে। আমরা সাধারণ জনগণÑ এমনটাই চাই। তাদের আয়ের, তাদের সুযোগ-সুবিধা আদায়ের, পাওয়ার মাধ্যম মনে করে। আর যাদের ড্রয়িংরুম হলো অফিস রুম, তারা জনগণকে কাছে আসতে দেয় না। কর্মচারীর মতো নিজস্ব গ্রুপের লোকবল তৈরি করে প্রকৃত জনগণ নেতা-কর্মীদের দূরে রেখে রাজনীতি করে। এদেরকে প্রতিহত করতে হবে। বিগত দিনে আমরা বাংলাদেশিরা তা দেখেছি। এগুলো চিরমুক্ত রাখতে হবে দল থেকে, সমাজ থেকে। তাহলেই জনগণ শান্তিতে বসবাস করতে পারবে। কারও জীবন ত্যাগ হবে না। জুলুম হবে না।
মোহাম্মদ ইয়াসিন আরাফাত সাগর
তরুণ উদ্যোক্তা