× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ভূমিকম্প

উচ্চঝুঁকি মোকাবিলায় কোনো প্রস্তুতিই আমাদের নেই

ড. আদিল মুহাম্মদ খান

প্রকাশ : ২৩ নভেম্বর ২০২৫ ১১:২৫ এএম

উচ্চঝুঁকি মোকাবিলায় কোনো প্রস্তুতিই আমাদের নেই

৫ দশমিক ৭ মাত্রার এক ভূমিকম্পে গত শুক্রবার কেঁপে ওঠে সারা দেশ। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ১০ জনের মৃত্যুর খবর জানা গেছে। আহত হয়েছে, প্রায় ছয় শতাধিক মানুষ। চিকিৎসা নেওয়ার জন্য অনেকেই ভিড় করে হাসপাতালগুলোতে। 

ভূমিকম্প এবং তার ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে আলাপ-আলোচনা দীর্ঘদিনের। ‍শুধু রাজধানীই নয়, চট্টগ্রামসহ দেশের অধিকাংশ বড়-মাঝারি-ছোট শহরগুলোই ভূমিকম্প দুর্যোগ মোকাবিলায় একেবারেই অপ্রস্তুত। রিখটার স্কেলের সাড়ে ৫ থেকে ৬ মাত্রার ভূমিকম্পেও পুরো নগরী মৃত্যুপুরীতে পরিণত হতে পারে। এই সতর্কবার্তা বহুদিনের। সতর্কতার এই জায়গা থেকে করণীয় সম্পর্কেও কথাবার্তা হচ্ছে। কিন্তু এর কিছুই যেন আমাদের কানে পৌঁছে না। ফলে বাংলাদেশ ভূমিকম্পের উচ্চঝুঁকিতে থাকলেও প্রকৃতপক্ষে কোনো ধরনের প্রস্তুতিই নেই আমাদের।

ভূমিকম্প হওয়ার কিছুক্ষণ পরে বা কয়েক ঘণ্টা পরে বা এক দিন পরেও আফটার শকে আরেকটি ভূমিকম্প আসতে পারে। কয়েক বছর আগে তুরস্কের উদাহরণেও কিন্তু দেখা গেছে আফটার শকেও অনেক ভবন নতুন করে পড়ে গেছে। সে ক্ষেত্রে বেশি ভালনারেবল থাকে এরকম হেলে পড়া ভবন বা ফেটে যাওয়া ভবন। তাই আমাদের অসতর্ক হওয়ারও সুযোগ নেই। 

বাংলাদেশে যে ভূমিকম্পের ঝুঁকি আছে সেটা কিন্তু স্পষ্ট হয়েছে গত কয়েক বছরের বহুবার ছোট ও মাঝারি মানের ভূমিকম্পে। আসলে এগুলো বড় ভূমিকম্পের আলামত। ভূমিকম্পের যে রিটার্ন পিরিয়ড একশ বা দেড়শ বছর, আমরা কিন্তু এখন তার কাছাকাছি আছি। ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রাম, সিলেট এবং ময়মনসিংহেও ভূমিকম্পের ঝুঁকি অনেক বেশি। তবে ঢাকায় ঝুঁকি কিন্তু অনেক বেশি। এখানে ভবনগুলোর মান অত্যন্ত দুর্বল। সেই সঙ্গে জনসংখ্যাও একটি বড় বিষয়। 

রাজধানীতে আমাদের ধনাঢ্য লোকজন যেসব ভবনে থাকেন সেগুলো হয়তো কিছুটা ভালোভাবে তৈরি করা হয়েছে। ফলে সেগুলোতে ঝুঁকি কম। কিন্তু মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষ যেসব ভবনে থাকেন সেগুলোতে ঝুঁকি অনেক বেশি। কারণ অনেক ভবন জলাশয় বন্ধ করে তৈরি করা হয়েছে। এই ভবনগুলো এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ। আর কোনো কারণে বড় ভূমিকম্প হিট করলে আমাদের রাস্তাগুলো এতই ছোট যে সেখানে উদ্ধারকারী যানবাহনগুলো যেতে পারবে না। ফলে আমাদের ঝুঁকি অনেক বেশি।

আবার ভূমিকম্পের মতো বড় ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় ঢাকা শহরে জনসাধারণের আশ্রয় নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপদ এবং খোলা জায়গারও মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে। আতঙ্কিত হয়ে মানুষ যখন হুড়োহুড়ি করে বের হয়ে একটু নিরাপদ বা খোলা জায়গায় আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেন, তখন অধিকাংশ এলাকায়ই সেই খোলা জায়গা খুঁজে পাওয়া যায় না। এই অবস্থার করুণ উদাহরণ আমরা এবারে দেখলাম। আহত হয়ে যারা হাসপাতালে এসেছে, যারা ভর্তি হয়েছে তাদের অধিকাংশই আহত হয়েছে ভবন থেকে হুড়োহুড়ি করে বেরোনোর সময়। আবার পথে-গলির মুখে দাঁড়িয়েও ভিড়ে ধাক্কাধাক্কিতে অনেকে আহত হয়েছে। 

দুঃখজনক হলেও সত্য, ঢাকা শহর এমনভাবে তৈরি ও সম্প্রসারিত হয়েছে যে অধিকাংশ এলাকায়ই ফাঁকা জায়গা নেই। যেগুলো ছিল, সেগুলোও ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়ে গেছে। ফলে ভূমিকম্প বা বড় কোনো বিপর্যয়ের সময় যেখানে গিয়ে মানুষ দাঁড়াতে পারবে, তেমন জায়গা নগরীর অধিকাংশ এলাকাতেই নেই। অথচ নগর-পরিকল্পনার মৌলিক ব্যাকরণ অনুযায়ী প্রতিটি এলাকাতেই হাঁটার দূরত্বের মধ্যে একটি খেলার মাঠ বা খোলা জায়গা থাকা প্রয়োজন। এসব স্থান দুর্যোগের সময় কমিউনিটি স্পেস হিসেবে কাজে লাগতে পারে। নগর-পরিকল্পনার প্রাথমিক নিয়ম অনুযায়ী, প্রত্যেক নাগরিককে ৫০০ থেকে ৮০০ মিটার দূরত্বের মধ্যে একটি খোলা জায়গা, গ্রিন স্পেস বা পার্কের সুবিধা দিতে হবে। ঢাকার মতো জনঘনত্বপূর্ণ এলাকায় এই দূরত্ব অবশ্যই ৫০০ মিটারের মধ্যে থাকার কথা। শহরগুলোয় ২০ থেকে ২৫ ভাগ সবুজ জায়গা থাকা আবশ্যক। অথচ ঢাকায় এই সবুজ জায়গার পরিমাণ কমে ৫ শতাংশ বা তার নিচে নেমে এসেছে। পৃথিবীর সব শহরে এসব মৌলিক বিষয় অনুসরণ করা হয়। কিন্তু ঢাকা শহরের সম্প্রসারণে এসব ভাবনা নিয়ে রাষ্ট্র কাজ করছে না।

আমাদের মনে রাখতে হবে, খোলা জায়গা বা খেলার মাঠ তৈরি করা ব্যক্তিগত উদ্যোগের বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্রকেই উদ্যোগ নিয়ে পরিকল্পনার মধ্যে এটাকে অন্তর্ভুক্ত করতে হয়। এটি রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে, কারণ, ভবন ভেঙে পড়লে সেই ধ্বংসাবশেষ সরাতে রাষ্ট্রকেই ব্যবস্থা নিতে হয়। কিন্তু এই দায়িত্ব পালনে রাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি শৈথিল্য দেখাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সাম্প্রতিক ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানে (ড্যাপ) এ-ও বলা হয়েছে যে এ ধরনের খেলার মাঠ ও খোলা জায়গার ব্যাপক সংকট রয়েছে। সংখ্যাগুলো দেওয়া থাকলেও এগুলো তৈরি করার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। উচ্চতার সঙ্গে কম্পন অনুভূতির সম্পর্ক রয়েছে। বহুতল ভবনে (যেমন- ছয়তলা বা বারোতলা) কম্পনের প্রভাব বেশি হয় এবং এটি বেশি সুইং (দুলতে) করে। অন্যদিকে, গ্রাউন্ড ফ্লোর বা নিচের তলায় (যেমন দুইতলায়) ধসে যাওয়ার একটি ঝুঁকি থাকে।

শত বছর আগের গড়ে ওঠা ঢাকার কেন্দ্রীয় অঞ্চল ছাড়া অন্যসব অঞ্চলই ভূমিকম্পে কমবেশি ঝুঁকিপূর্ণ। প্রায় সব অঞ্চলই গড়ে উঠেছে নরম মাটিতে। এমনকি উত্তরা থার্ড ফেজ প্রকল্পের ভূমিটুকুও গড়ে তোলা হয়েছে জলাভূমি ভরাট করে। ঢাকার মাটি দুই ধরনের। সদরঘাট থেকে সোজা গাজীপুরের মধুপুর পর্যন্ত অংশটি প্লাইস্টোসিন আমলের লাল মাটি দিয়ে গঠিত। এ ধরনের মাটির গঠন খুবই শক্তিশালী। বুড়িগঙ্গা নদী থেকে শুরু করে পুরান ঢাকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, এয়ারপোর্ট, টঙ্গী, গাজীপুর ও সাভারের একাংশ পুরোটাই এ ধরনের শক্ত ভূমি। কিন্তু ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকা বিশেষ করে কেরানীগঞ্জ, হেমায়েতপুর, পূর্বাচলের একাংশ, নারায়ণগঞ্জের একাংশের ভূমি সাম্প্রতিককালের প্লাবন সমভূমি শ্রেণির। এটি এখনও গঠিত হচ্ছে। বন্যা হচ্ছে, বর্ষায় পানি বাড়ছে, এতে পলি দিয়ে এ ভূমির গঠন হচ্ছে। এখানে বিল্ডিং করতে হলে ৩০-৪০ মিটার পর্যন্ত পাইলিং করতেই হবে। এমনকি পাইলিংয়ের মাধ্যমে নির্মিত ভবনের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি থেকেই যায়।

এমন পরিস্থিতিতে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ঢাকায় ভূমিকম্প হলে শুধু বিল্ডিং ভেঙে পড়বে তা-ই নয়, এখানে উদ্ধারকাজ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। বিশেষ করে, যেসব এলাকায় রাস্তা সরু, সেখানে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢুকবে না। ফায়ার সার্ভিসের ভবনও তো ভেঙে পড়বে। রাস্তায় যদি মেট্রোরেল পড়ে যায়, বা এক্সপ্রেসওয়ে ধসে পড়ে তাহলে তো ঢাকার রাস্তায় গাড়িঘোড়া চলবে না। ভূমিকম্পের সময় মানুষ যেন বাসা থেকে বের হয়ে ফাঁকা জায়গায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে, সে ব্যবস্থাও এখানে নেই। 

২০২৩ সালে তুরস্কের ভূমিকম্পের কথা আমাদের স্মৃতি থেকে নিশ্চয়ই হারিয়ে যায়নি। তুরস্কে ভূমিকম্পের যে ক্ষয়ক্ষতি তার পেছনে ছিল তাদের বিল্ডিং অথরিটি। তাদের বিরুদ্ধে চরম দুর্নীতিগ্রস্ততার অভিযোগ ছিল। ফলে সেখানে নিয়ম না মেনেই বড় বড় ভবন হয়েছে। তবে তুরস্কের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য সেখানে অনেক খোলা জায়গা থাকলেও ঢাকায় তা নেই। তুরস্কের মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকার অবকাঠামো লন্ডভন্ড হয়ে যাবে। এর চেয়ে কম মাত্রার হলেও ঢাকার অবস্থা নাজুক হয়ে পড়বে। কেননা, তুরস্কে পর্যাপ্ত খালি জায়গা এবং প্রশস্ত সড়ক রেখে শহর গড়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু ঢাকার ক্ষেত্রে যার অনুপস্থিতি রয়েছে। এখানে ভূমিকম্প হলে বিদ্যুতায়িত হয়ে অনেক জায়গায় আগুন লাগারও আশঙ্কা আছে। তার মানে এ নগরী আগুন, ভূমিকম্পসহ নানাবিধ ঝুঁকির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সে ঝুঁকি কমানোর জন্য কোনো প্রস্তুতি সরকার বা রাষ্ট্র নেয়নি। উল্টো আবাসন ব্যবসায়ীদের চাপের মুখে নতি স্বীকার করে বারবার নগর পরিকল্পনার ব্যত্যয় ঘটানো হয়েছে। সরু রাস্তায় বহুতল ভবন নির্মাণের অনুমোদন দিয়ে নগরীকে আরও বাসযোগ্যহীন করে তুলছে। এখানে ভবন নির্মাণে যেমন বিল্ডিং কোড ও পরিকল্পনা সংশ্লিষ্ট আইন মানা হচ্ছে না, তেমনি প্রভাবশালীদের চাপে নগরায়ণ হচ্ছে স্বেচ্ছাচারীভাবে। ফলে সাময়িকভাবে কেউ কেউ লাভবান হতে পারলেও প্রকৃতির প্রতিশোধ থেকে সম্মিলিতভাবে কেউ রেহাই পাবে না। মনে রাখতে হবে, ভূমিকম্পের ঝুঁকি রোধে প্রস্তুতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে নগরের সঠিক পরিকল্পনাও প্রয়োজন। ভবন নির্মাণে সাবধানতা অবলম্বন করলে ভূমিকম্পে ক্ষতি কমানো সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন সরকারের সব সংস্থার নজরদারি জোরদার করা এবং ভূমিকম্পের ওপর প্রশিক্ষণে জোর দেওয়া।


ড. আদিল মুহাম্মদ খান 

অধ্যাপক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা