ইন্টারনেট স্বাধীনতা
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২১ নভেম্বর ২০২৫ ১০:১৮ এএম
দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের আধুনিকায়ন এবং নাগরিকদের ডিজিটাল অধিকার সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট আইনের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রথমবারের মতো ‘ইন্টারনেট সেবা’ বন্ধের ক্ষমতা পুরোপুরি রহিত করা হচ্ছে আইনে। যুক্ত হচ্ছে ইন্টারনেট অবৈধ নজরদারির জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড-জরিমানাসহ একাধিক নতুন বিধান। রয়েছেÑ কেউ যদি এসব ব্যবহার করে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা বা জনশৃঙ্খলার ক্ষতি করে, ষড়যন্ত্রমূলক যোগাযোগ করে তা হলে তাকে সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড, অথবা সর্বোচ্চ কোটি টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার মতো সাজার প্রস্তাব। এমনসব বিধান রেখে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ ‘বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫’-এর খসড়া প্রস্তুত করেছে। খসড়াটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য শিগগির উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে।
উল্লেখ্য, নতুন এই বিধান প্রণয়নে অংশীজন ও সাধারণ মানুষের মতামত নেওয়া হয়েছে। ২০ নভেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘ইন্টারনেট স্বাধীনতা সুরক্ষিত হচ্ছে’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে।
ফ্যাসিবাদী শাসনামলে আমরা কথায় কথায় ইন্টারনেট বন্ধ করতে দেখেছি। সোশ্যাল মিডিয়ার জনপ্রিয় প্লাটফর্মগুলোতে সরকারের শ্যেনদৃষ্টি, নজরদারি, ব্লক করা, সামান্য সমালোচনার জন্য মামলা-গ্রেপ্তার এবং গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা সংস্থাগুলোর লাঠিয়ালগিরিও আমরা দেখেছি। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান সেই ধারার অবসান ঘটিয়ে রচনা করেছে স্বাধীনতার নয়া সোপান।
জানা গেছে, আইনের খসড়ায় নজরদারি কাঠামো পরিচালনার জন্য ন্যাশনাল টেলিযোগাযোগ মনিটরিং সেন্টারকে (এনটিএমসি) বিলুপ্ত করারও প্রস্তাব রয়েছে। এর পরিবর্তে সেন্ট্রাল লফুল ইন্টারসেপশন প্লাটফর্ম (সিএলআইপি) বা কেন্দ্রীয় আইনানুগ ইন্টারসেপশন প্লাটফর্ম গঠন করা হবে, যা থাকবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে। এই ক্ষেত্রে নজরদারির যেকোনো সিদ্ধান্ত আদালত বা নির্দিষ্ট বিচারিক কাউন্সিলের অনুমোদন সাপেক্ষে হবেÑ খসড়ায় তেমনটি উল্লেখ করা হয়েছে।
এ কথা সত্য, বিশ্ব দ্রুত চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যেখানে ডেটা-অ্যাক্সেসই হবে এগিয়ে থাকার মূল চাবিকাঠি। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে ইন্টারনেট স্বাধীনতা রক্ষা ও প্রসারের উদ্যোগ একটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হিসেবেই বিবেচিত হওয়া উচিত। মনে রাখতে হবে, ইন্টারনেট আজ কেবল তথ্যপ্রাপ্তির মাধ্যমই নয়Ñ এটি যেকোনো দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাণিজ্য, নাগরিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। যে কারণে দেশে ইন্টারনেট স্বাধীনতা সুরক্ষার প্রস্তাবটি নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী এবং ভবিষ্যৎমুখী। তবে প্রশ্ন হলো, গোপনীয়তা রক্ষা ও নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তাÑ এই দুইয়ের ভারসাম্য কতটা রাখা সম্ভব হবে এবং আইনটি বাস্তব প্রয়োগে কতটা ‘স্বাধীন’ ও ‘নিরপেক্ষ’ থাকতে পারবে। কারণ ‘খসড়ায় ‘রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণা’-র মতো অস্পষ্ট শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এর অপব্যবহার হলে সাধারণ ব্যবহারকারীরা বেশি ঝুঁকিতে পড়বেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংজ্ঞা স্পষ্ট না হলে এই ধারা অপব্যবহারের ঝুঁকি রয়েই যাবে। ফলে আইনটি লক্ষ্য অর্জনে বুমেরাং হয়ে উঠতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণ, অনলাইন সংবাদপত্রের ওপর চাপ, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কঠোর প্রয়োগ, কিংবা ধীরগতির ইন্টারনেটÑ দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়গুলো সমাজকে এক ধরনের সীমাবদ্ধতায় আটকে রেখে ছিল। এসব সীমাবদ্ধতা একদিকে সৃজনশীলতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করেছে, অন্যদিকে অনলাইন ব্যবসা, ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ সংস্কৃতি ও ই-গভর্ন্যান্সের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করেছে। এই প্রেক্ষিতে ইন্টারনেট স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রস্তাব কেবল নাগরিক অধিকার রক্ষাই নয়, বরং ডিজিটাল অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার দিকেও একটি বড় পদক্ষেপ।
দেশে বর্তমানে তরুণ সমাজের বড় অংশ অনলাইনভিত্তিক কর্মসংস্থানের ওপর নির্ভরশীল। ফাইভার, আপওয়ার্ক, ইউটিউব, ফেসবুক ও টিকটকসহ নানা প্লাটফর্মে লাখো তরুণ কাজ করছেন। ইন্টারনেট ব্যাহত হলে বা মতপ্রকাশ সীমিত হলে তাদের উপার্জনের স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়বে। এই বাস্তবতায় ইন্টারনেটকে উন্মুক্ত, দ্রুত, নিরাপদ ও স্বচ্ছ রাখার উদ্যোগ তরুণদের কর্মজীবনকে আরও শক্তিশালী করবে।
ইন্টারনেটের স্বাধীনতা মানে অবকাঠামোর উন্নয়নও। সাশ্রয়ী ইন্টারনেট, গ্রামে-গঞ্জে ব্রডব্যান্ড পৌঁছে দেওয়া, মোবাইল ডেটার দাম কমানো, নেট নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা, সারা দেশে অপটিক্যাল ফাইবার শক্তিশালী করাÑ এসব বাস্তবায়ন করলে ডিজিটাল বিভাজন কমবে এবং সকল শ্রেণির মানুষ সমান সুযোগ পাবে। আমরা মনে করি, ইন্টারনেট স্বাধীনতা সুরক্ষার মানে দায়হীনতা নয়। ভুয়া খবর, সাইবার অপরাধ, অনলাইন প্রতারণা, ব্যাংকিং জালিয়াতি কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী অপপ্রচারের বিরুদ্ধে আইন অবশ্যই থাকতে হবে। তবে সেই আইনের প্রয়োগ হতে হবে স্বচ্ছ, মানবিক, মানসম্পন্ন এবং তা যেন মানুষের মৌলিক স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন না করে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও নাগরিকের অধিকারÑ এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্যই হলো আধুনিক গণতন্ত্রের ভিত্তি।
বর্তমানে তথ্যযুদ্ধ, কনটেন্ট সেন্সরশিপ, নজরদারি প্রযুক্তি, সাইবার আক্রমণÑ এসবের চ্যালেঞ্জ বিশ্বজুড়ে। বাংলাদেশ যদি এই সময়ে ইন্টারনেট স্বাধীনতা রক্ষার দৃঢ় অবস্থান নেয়, তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের ভাবমূর্তি উন্নত হবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা একটি উন্মুক্ত ডিজিটাল পরিবেশে বিনিয়োগে আরও আগ্রহী হবেন।
আমরা মনে করি, ইন্টারনেট স্বাধীনতা সুরক্ষার প্রস্তাব দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, গণতান্ত্রিক শক্তিশালীকরণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সৃজনশীলতার পথে এক দৃঢ় পদক্ষেপ। এখন দরকার প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং আইনি কাঠামোকে আধুনিক করে সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। আমাদের বিশ্বাস, ইন্টারনেট স্বাধীনতা রক্ষিত হলেÑ বাংলাদেশ ডিজিটাল যুগের এক নতুন উচ্চতায় অবস্থান করবে। তাই বলতে চাই, যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে, মুক্ত করো হে বন্ধ।