কাঁকড়ার কদর
আবু তাহের মুহাম্মদ জাবের
প্রকাশ : ২০ নভেম্বর ২০২৫ ১২:৪১ পিএম
বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশি, জানা-অজানা নানা ধরনের সম্পদের এক বিশাল আধার, যেখানে লুকিয়ে আছে ব্লু-ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতির অপার সম্ভাবনা। এই সুনীল অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ। বাংলাদেশের জন্য এই সম্ভাবনাময় সম্পদের টেকসই ব্যবহার ও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। দেশের অন্যতম সামুদ্রিক মৎস্য গবেষণা কেন্দ্র বঙ্গোপসাগরের বিপুল সামুদ্রিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার, সংরক্ষণ, চাষ ব্যবস্থাপনা, মজুদ নিরূপণ ও টেকসই আহরণ প্রযুক্তি উদ্ভাবন নিয়ে কাজ করছে। এই গবেষণা কার্যক্রমের আওতায় গবেষকবৃন্দ সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য নির্ণয়, সামুদ্রিক মাছের মজুদ নিরূপণ এবং বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রজাতির ব্রিডিং সময়কাল নির্ধারণে উল্লেখযোগ্য সফলতা অর্জন করেছেন।
বাংলাদেশে মৎস্যসম্পদের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান কাঁকড়া। কাঁকড়ার কদর এখনও অনেকাংশই অপ্রতুল, অথচ বৈশ্বিকভাবে কাঁকড়ার বাজার বছরে ৫৫০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে, ব্লু সুইমিং কাঁকড়া (Blue Swimming Crab) এখন একটি অত্যন্ত চাহিদাসম্পন্ন খাদ্য পণ্যে পরিণত হয়েছে, যার সবচেয়ে বড় আমদানিকারক যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এই বাণিজ্যে বাংলাদেশের একটি উল্লেখযোগ্য অংশীদারত্ব রয়েছেÑ ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে দেশটি ৮,৫০০ মেট্রিক টনেরও বেশি হিমায়িত কাঁকড়া রপ্তানি করে প্রায় ৫৫ মিলিয়ন ডলার আয় করে। তবে এই পরিমাণ খুব বেশি না হলেও তা প্রবৃদ্ধির একটি বিশাল সুযোগের ইঙ্গিত দেয়।
বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় কাঁকড়া চাষ একটি লাভজনক ও দ্রুত বর্ধনশীল খাত, বিশেষ করে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের মতো জেলাগুলোতে এর ব্যাপক প্রসার ঘটছে। বাগদা চিংড়ির মতো লবণাক্ত পানিতে কাঁকড়া চাষ করা হয়ে থাকে। কাঁকড়া মোটাতাজাকরণ একটি জনপ্রিয় পদ্ধতি, যা তুলনামূলক সহজ কাজ এবং কম বিনিয়োগে বেশি লাভ করা সম্ভব হয়। কাঁকড়া চাষের জন্য উপকূলীয় অঞ্চল, বিশেষ করে নরম দোআঁশ বা এঁটেল মাটি কাঁকড়া চাষের জন্য বেশি উপযোগী। আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা থাকায় এবং কম খরচে ভালো লাভের কারণে এটি একটি লাভজনক ব্যবসা। কাঁকড়া ফ্যাটেনিং বা মোটাতাজাকরণ একটি জনপ্রিয় পদ্ধতি, যেখানে পুকুর বা বদ্ধ জায়গায় চাষ করা হয়। কালো রঙের প্লাস্টিকের বক্স ব্যবহার করেও কাঁকড়া চাষের উন্নত পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে, যেমনটি সাতক্ষীরার চাষিরা করে থাকেন। চিংড়ির পরেই কাঁকড়া বাংলাদেশের অন্যতম রপ্তানিযোগ্য মৎস্যসম্পদ, যা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। নরম খোলসের কাঁকড়া তথা সফটশেল চাষ একটি সম্ভাবনাময় এবং নতুন উদ্যোগ, যা সাতক্ষীরার মতো অঞ্চলে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।
আমাদের দেশে পর্যটকরা কাঁকড়ার প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হচ্ছে। দেশীয় পর্যটকগণ ফাইভস্টার হোটেল থেকে স্ট্রিটফুড পর্যন্ত সকল স্তরে কাঁকড়া উপভোগ করেন। পর্যটকদের প্রিয় খাবারগুলোর মধ্যে কাঁকড়া অন্যতম। পর্যটন ব্যবসায়ীরা তাদের ট্যুরিজম অফারে খাবারের তালিকায় অন্যান্য সি-ফুডের সঙ্গে কাঁকড়াও অন্তর্ভুক্ত করেন।
সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার, কুয়াকাটার উপকূলীয় অঞ্চলের স্থানীয় বাজারে একটি লক্ষণীয় পরিবর্তন ঘটেছে। ঐতিহ্যবাহী মাড ক্রাব বা শিলা কাঁকড়ার স্থান দখল করেছে ব্লু সুইমিং কাঁকড়া। এই এলাকাগুলোতে ঘুরলে দেখা যাবে, বেশিরভাগ রেস্তোরাঁ এবং রাস্তার খাবারের দোকান এখন ব্লু সুইমিং কাঁকড়ার তৈরি খাবার বিক্রি করছেÑ মসলাদার ভুনা থেকে শুরু করে সুগন্ধি কারি পর্যন্ত। এই রূপান্তরটি শুধু স্বাদের পছন্দের কারণে হয়নি বরং উপকূলীয় এলাকায় শিলা কাঁকড়ার প্রাচুর্যতা হ্রাস পাওয়ায় এই অভিযোজন করা প্রয়োজন হয়েছে। বর্তমানে কাকঁড়ার কদর অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমাগত কাঁকড়ার চাহিদা বাড়ছে, যা আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পরিচায়ক।
আবু তাহের মুহাম্মদ জাবের
সচিব, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়