× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

চিকিৎসা

রোগীর গোপনীয়তা বিড়ম্বনা

ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব ও দাউদ ইব্রাহিম হাসান

প্রকাশ : ১৬ নভেম্বর ২০২৫ ১২:০৬ পিএম

রোগীর গোপনীয়তা বিড়ম্বনা

হাসপাতালের ফটকে আজকাল রোগীর চেয়ে বেশি চোখে পড়ে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভদের (এমআর) ভিড়। এই রিপ্রেজেন্টেটিভরা যেন কোম্পানির স্বার্থোদ্ধারে সদা প্রস্তুত শিকারি। একজন রোগী যখন ডাক্তারকে তার সবচেয়ে ব্যক্তিগত রোগ-শোকের কথা জানান, সেই গোপনীয়তা এবং ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষার দায়িত্ব থাকে চিকিৎসকের। অথচ, ডাক্তারদের কক্ষ থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা রোগীর হাত থেকে ব্যবস্থাপত্র (প্রেসক্রিপশন) অনেক সময় জোরপূর্বক নিয়ে মোবাইলে ছবি তোলেন। প্রশ্ন জাগে, রোগীর আগ্রহ এবং অনুমতি না নিয়ে ব্যক্তিগত রোগ সংক্রান্ত প্রেসক্রিপশনের ছবি তোলার অধিকার এই বাইরের মানুষগুলোকে কে দিল? এটি কেবল বিধিবিধান ও নিয়ম অনুযায়ী অযৌক্তিক নয়, বরং এটি রোগীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সংবিধান প্রদত্ত অধিকারের চরম লঙ্ঘন।

বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৩-৯৪ সালে যে কোড অব মেডিকেল প্রোডাক্ট মার্কেটিং প্র্যাকটিস প্রণয়ন করে, সেখানে কোনো রোগীর প্রেসক্রিপশনের ছবি তোলার বিধান লেখা নেই। বরং এ ধরনের কার্যকলাপ স্পষ্টতই অনৈতিক এবং অপরাধ হিসেবে গণ্য হওয়া উচিত। রিপ্রেজেন্টেটিভরা কোম্পানির নির্দেশে এই কাজটি করেন, নিজেদের ইমেজ ক্ষুণ্ন হয় জেনেও তারা ঊর্ধ্বতনদের চাপের কাছে নতজানু। এক গভীর বেদনা নিয়ে তারা বলছেন, কোম্পানির উচ্চপদস্থ লোকজনের নির্দেশ মানতেই তারা বাধ্য হচ্ছেন। এই বলপ্রয়োগের মাধ্যমে কোম্পানি তার লাভ নিশ্চিত করছে, আর জনগণের চোখে রিপ্রেজেন্টেটিভরা বারবার খারাপ হচ্ছেন।

রাজধানীর শাহবাগের ফার্মেসিগুলোতে প্রতিদিন লাখ থেকে কোটি টাকার ওষুধ বিক্রি হয়। কিন্তু সেখানেও চলছে নৈরাজ্য। ওষুধের গায়ে মূল্য নির্ধারিত থাকা সত্ত্বেও, এক দোকানে একটি ওষুধের দাম চাওয়া হচ্ছে ১৫০০, তো অন্য দোকানে সেটিই হয়ে যাচ্ছে ১৮০০ টাকা! এর চেয়েও ভয়ংকর হলো, বিক্রেতা নিজেই যখন ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন বদলে দেওয়ার দুঃসাহস দেখান। ডাক্তার যেখানে চারটি ওষুধ সেবনের নির্দেশ দিলেন, সেখানে ফার্মেসির অ-চিকিৎসক কর্মচারী বলছেন, ‘তিনটি খেলেও চলবে, একটি ওষুধ কম খেলে কোনো সমস্যা হবে না’, অথবা পরামর্শ দিচ্ছেন আরও দামি ব্র্যান্ডের ওষুধ কেনার জন্য। এতে করে একদিকে যেমন চিকিৎসকের পেশাগত মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে, তেমনি পড়াশোনা না জানা মানুষগুলো ভুল চিকিৎসার শিকার হয়ে বিনা ওষুধে মারা যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছেন।

ওষুধের দাম বৃদ্ধির মূল কারণগুলোর মধ্যে একটি হলো মার্কেটিং চেইনের অতিরিক্ত ব্যয়ভার। ওষুধ কোম্পানিগুলো তাদের পণ্য প্রচারের জন্য মার্কেটিং চেইনে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে, যার মধ্যে এই রিপ্রেজেন্টেটিভদের বেতন-ভাতাও অন্তর্ভুক্ত। আর এই বিশাল অঙ্কের অর্থ জোগান দিতে গিয়ে তারা ওষুধের ওপর দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্রেতার টাকা থেকেই মূলত এই রিপ্রেজেন্টেটিভদের বেতন হচ্ছে এবং কোম্পানি লাভবান হচ্ছে। এই করপোরেট লোভের মূল্য দিতে হচ্ছে সেই দরিদ্র মানুষটিকে, যার বেঁচে থাকার জন্য জরুরি ওষুধ কেনার সামর্থ্য নেই।

এ ছাড়াও সরকারের পক্ষ থেকে ওষুধের ওপর যে ১৭.৪০ শতাংশ ভ্যাট আরোপিত হয়েছে, তা-ও সাধারণ মানুষের ওপর বোঝা বাড়াচ্ছে। সরকার জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষার দায়িত্ব এড়িয়ে গিয়ে যেন পরোক্ষভাবে এই ভুলের অংশীদার হচ্ছে। কোম্পানি তৈরি করছে, সরকার ভ্যাট নিচ্ছে। কিন্তু সেই টাকা আসছে রোগীর পকেট থেকেÑ যার ফলে দরিদ্র মানুষ হিমশিম খাচ্ছে।

বাংলাদেশে প্রায় ৮০০ ওষুধ কোম্পানি থাকলেও, আমাদের এই ড্রাগ মার্কেটটা এখনও একপ্রকার ফটোকপি মার্কেট। আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্বে ছাড় পাওয়ার সুবিধা নিয়ে আমরা ওষুধ উৎপাদন করলেও, নতুন ওষুধ তৈরির উদ্ভাবনায় বা গবেষণায় তেমন আগ্রহ দেখা যায় না। আমরা কেবল পেটেন্ট কিনে এনে একই জেনেরিকের হাজারো ব্র্যান্ডের ওষুধ তৈরি করি। ফলে একই মৌলিক উপাদান ব্যবহার করেও কোম্পানিগুলো ‘ভালো এবং খারাপ ব্র্যান্ড’-এর কৃত্রিম ভেদাভেদ তৈরি করে বাজারকে আরও জটিল করে তোলে।

এসব অনিয়ম নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সক্ষমতাও সীমিত। তারা বর্তমানে ১১৭টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম নির্ধারণ করার ক্ষমতা রাখে। হাইকোর্টের একটি সাম্প্রতিক রায়ে অবশ্য ১৯৯৪ সালের পরিপত্রকে অবৈধ ঘোষণা করে ৭৩৯টি জীবনরক্ষাকারী ওষুধের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা সরকারকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবুও অধিকাংশ ওষুধের মূল্য নির্ধারণের ভার কোম্পানিগুলোর হাতে থাকায় এবং শক্তিশালী মনিটরিং টিমের অভাব থাকায়, এই লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির চক্র চলতেই থাকে।

এই পুরো প্রেক্ষাপটে আমাদের ডাক্তার সমাজের ভূমিকা আজ জাতির কাছে প্রশ্নবিদ্ধ। সামান্য স্বার্থ লাভের আশায় একটি খারাপ বা নিম্নমানের কোম্পানির ওষুধও যখন একজন ডাক্তার রেফার করেন, তখন তাদের নৈতিকতা কোথায় থাকে? এই অনৈতিক চর্চা যেন একটি শিক্ষিত সমাজের জন্য এক চরম ধিক্কার। যেখানে রিপ্রেজেন্টেটিভদের উচিত ছিল রোগীকে ওষুধ সেবনের সঠিক নিয়ম বা সুস্থতার পথ বাতলে দেওয়া, সেখানে তাদের সমস্ত আগ্রহ কেবল প্রেসক্রিপশনের ছবি তোলায়Ñ আর এই নির্মম উদাসীনতা আমাদের জাতির সুস্থতাকে আরও দুর্বল করে তুলছে। বুক ফেটে যায় যন্ত্রণায়, তবুও আমরা নীরব কেন? জীবন বাঁচানোর পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি আর ব্যক্তিগত তথ্যের চরম লঙ্ঘন যখন নিয়মে পরিণত হয়, তখন প্রতিবাদের আগুন জ্বালাতেই হবে। কারণ এই লড়াই শুধু পকেটের নয়, এ লড়াই আমাদের বেঁচে থাকার অধিকারের!


ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব, সহকারী অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

দাউদ ইব্রাহিম হাসান, রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা