সয়াবিন তেল
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১২ নভেম্বর ২০২৫ ১২:৫৭ পিএম
দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় যখন দিন দিন বাড়ছে, তখন আবারও সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ৯ টাকা ২৭ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি)। এই প্রস্তাব নিঃসন্দেহে জনগণের কাঁধে নতুন করে বোঝা চাপাবে। প্রস্তাবটি এমন একসময় দেওয়া হলো যখন বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আগে থেকেই আকাশছোঁয়া। বছরের শেষ দিকে এসে এভাবে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ার প্রস্তাব করা হলো, যেখানে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবন টানাপড়েনে জর্জরিত। ভোক্তাদের জন্য এটা দুঃসংবাদই বটে।
উল্লে্খ্য, ১০ নভেম্বর এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানায় ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি)। কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, গড় লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) মূল্য, ইন-বন্ড ও এক্স-বন্ড খরচ বৃদ্ধি এবং মার্কিন ডলারের বিনিময় হার বেড়ে যাওয়া। কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়, গত ২৭ জুলাইয়ের মূল্য সমন্বয় সভায় ৩ আগস্ট থেকে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৮৯ টাকা দরে বিক্রির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তবে এর পরে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা এবং ডলারের দাম বৃদ্ধির প্রভাবে আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। তারা বলছে, নভেম্বরের শুরুতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন সয়াবিন তেলের দাম ১,০৬২ ডলারে এবং পাম তেলের দাম ১,০৩৭ ডলারে পৌঁছে। এই পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ বাজারে নতুন করে দাম সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা জরুরি হয়ে পড়েছে। এই বাস্তবতার আলোকে সবচেয়ে সহজ সমাধান হচ্ছে, দাম বাড়ানো। সেই প্রস্তাবই করা হয়েছে। বিটিটিসির প্রস্তাব অনুযায়ী, ডলারের বিনিময় হার ১২২.৬০ টাকা ধরে হিসাব করা হয়েছে। এতে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য প্রতি লিটার ১৮৯ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৯৮.২৭ টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে খোলা (নন-বোতলজাত) সয়াবিন তেলের দাম ৮.৮৫ টাকা বাড়িয়ে লিটারপ্রতি ১৭৭.৮৫ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যমতে, গত এক বছরে দেশে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ইতোমধ্যেই প্রায় ১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
আমরা বলি, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য বৃদ্ধি ও ডলারের দর ঊর্ধ্বগতির কারণে দেশীয় বাজারে সয়াবিন তেলের দাম সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই দাম বাড়ানোর বোঝা কেন কেবল ভোক্তার ওপরই পড়বে! সরকারের কি এই ব্যাপারে কোনো বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই। এমনিতেই দেশীয় বাজারে নানা সময়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের মজুদদারি, ভেজাল তেল বিক্রি, ওজনে কম দেওয়া ও অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি দীর্ঘদিনের চলমান সমস্যা। আমাদের প্রশ্ন, সেসব ক্ষেত্রে কার্যকর নজরদারি না নিয়ে সরাসরি ভোক্তার ঘাড়ে এই বোঝা চাপানো কতটা ন্যায্য এবং যৌক্তিক?
তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব পড়ে প্রতিটি পরিবারে, প্রতিটি ঘরে। এতে রান্নাঘরের আগুন নিভে যাওয়ার উপক্রম হয়। সাধারণ দিনমজুর, শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ে। বাজারে তেলের দাম বাড়লে ঘরোয়া সবজি ভাজি থেকে শুরু করে দোকান-রেস্তোরাঁর খাবারের দামও বেড়ে যায়। এক কথায় এই ধরনের সিদ্ধান্তের সরাসরি প্রভাব পড়ে পুরো দেশের জনগণের জীবনযাত্রায় এবং অর্থনীতিতে।
আমরা মনে করি, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দরকার ছিল মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিষয়টি বিবেচনা করা। সরকার চাইলে কয়েকটি উপায়ে ভোক্তাদের ওপর চাপ কমাতে পারতÑ যেমন : তেল আমদানিতে কর-ছাড়, ভর্তুকি বৃদ্ধি বা পর্যাপ্ত মজুদ গড়ে তুলে বাজার স্থিতিশীল রাখা। একই সঙ্গে বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি জোরদার করা, যাতে অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ানো না হয়। এই ক্ষেত্রে বড় বড় তেল আমদানিকারক ও রিফাইনারি কোম্পানিগুলোর লাভের হিসাবও খতিয়ে দেখা দরকার। তারা যেন বৈশ্বিক অজুহাতে অতিরিক্ত মুনাফা না করে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। আমদানি-নির্ভার সয়া বীজের বিকল্প স্বাস্থ্যকর দেশীয় তেলবীজগুলোর উৎপাদন বাড়ানোও প্রয়োজন বলে মনে হয়। এই মুহূর্তে রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব হলো নাগরিকদের জীবনযাত্রা সহজ রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। কারণ প্রতিটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে থাকা উচিত মানুষ, কেবল ব্যবসা নয়।
আমরা আরও মনে করি, সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর এই প্রস্তাব পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। জনগণের জীবনমান রক্ষায় মানবিকতার জায়গা থেকে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া উচিত। নইলে নিত্যপণ্যের আগুনে দগ্ধ এই জনজীবন আরও বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। রাষ্ট্র তথা সরকারের এই ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা করা যেমন জরুরি, তেমনি মানুষের জীবনযাত্রার কষ্টও। রাষ্ট্রের দেখা উচিত, যাতে ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ না পড়ে। এই মুহূর্তে দরকার মানবিক চিন্তা ও বাস্তব পদক্ষেপ, যাতে জনগণ টিকে থাকতে পারে, মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারে। আশা করি, সরকার ভোক্তা-সাধারণের স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেবে।