× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

তরুণ ভোট

নির্বাচনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের চাবিকাঠি

সাঈদ বারী, প্রকাশক ও কলাম লেখক

প্রকাশ : ১০ নভেম্বর ২০২৫ ১৪:০৫ পিএম

আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০২৫ ১৪:০৭ পিএম

 নির্বাচনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের চাবিকাঠি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আসন্ন সাধারণ নির্বাচন একটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে নানা কারণে ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত ছিল দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ ভোটার, যাদের বয়স এখন ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। তারা কেউই ২০১৪, ২০১৮ কিংবা ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে কার্যত ভোট দিতে পারেনি। এ সময়ে কেউ প্রথমবারের মতো ভোটের অধিকার পেয়েছেন, আবার কেউ প্রাপ্তবয়স্ক হলেও ভোটের সুযোগ পাননি। এই প্রজন্মের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় নির্ণায়ক শক্তি।

বাংলাদেশের মোট ভোটার সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ১২ কোটি ১৮ লাখ। এর মধ্যে আনুমানিক ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশই তরুণ ভোটারÑ সংখ্যায় প্রায় চার কোটি। অর্থাৎ প্রতি তিনজন ভোটারের একজনই তরুণ। এরা কেবল সংখ্যা নয়, প্রতিনিধিত্ব করে নতুন প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা, পরিবর্তনের ইচ্ছা এবং প্রযুক্তিনির্ভর নতুন দৃষ্টিভঙ্গিকে। এই বিশাল ভোটব্যাংককে উপেক্ষা করা যে কোনো রাজনৈতিক দলের জন্যই আত্মঘাতী হবে।

তরুণ সমাজ এখন ভিন্ন এক মানসিকতায় বেড়ে উঠেছে। তারা ডিজিটাল যুগের সন্তানÑ সোশ্যাল মিডিয়া, তথ্যপ্রযুক্তি ও বৈশ্বিক যোগাযোগের জগতে তারা প্রতিনিয়ত সংযুক্ত। তাদের রাজনৈতিক চেতনা ও চিন্তাধারা প্রচলিত দলীয় সংস্কৃতি বা নেতৃত্বের ছক অনুযায়ী নয়। তারা দলীয় আনুগত্যের চেয়ে বাস্তব উন্নয়ন, সুশাসন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধকে বেশি গুরুত্ব দেন। তারা চান এমন রাজনীতি, যেখানে থাকবে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। তাই তাদের ভোট কেবল সংখ্যা নয়, এটি একটি মূল্যবোধের প্রতীকও বটে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে তরুণদের ভূমিকা সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, সর্বশেষ ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানÑ সবখানেই তরুণরাই ছিল নেতৃত্বে ও প্রেরণায়। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ধীরে ধীরে তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে সংযোগ হারিয়েছে। তাদের দলীয় রাজনীতি সীমিত হয়ে পড়েছে পরিবার ও গোষ্ঠীভিত্তিক প্রভাববলয়ে। তরুণদের অংশগ্রহণ সেখানে অনেকটা প্রতীকী পর্যায়ে এসে ঠেকেছে।

এই প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালের নির্বাচনকে তরুণরা দেখছে এক নতুন সম্ভাবনার আলো হিসেবে। বহু বছর পর তারা প্রত্যাশা করছে এমন একটি ভোটযুদ্ধ যেখানে তারা নিজের মতামত স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে পারবে, যেখানে তাদের ভোট প্রকৃত অর্থেই গণতন্ত্রের প্রতিফলন ঘটাবে। এই আশা পূরণ করতে না পারলে রাজনৈতিক দলগুলোকে ভবিষ্যতে ভয়াবহ আস্থাহানির মুখে পড়তে হবে।

বর্তমানে তরুণদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ কর্মসংস্থান। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, কিন্তু তাদের জন্য পর্যাপ্ত চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। সরকারি চাকরিতে প্রতিযোগিতা খুবই কঠিন, আর বেসরকারি খাতে স্থিতিশীলতা ও ন্যায্য মজুরি এখনও অনিশ্চিত। তা ছাড়া শিক্ষাব্যবস্থার মান, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, দক্ষতা প্রশিক্ষণÑ সব ক্ষেত্রেই ঘাটতি প্রকট। ফলে তারা এমন নেতৃত্ব খুঁজছে, যারা কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব সমাধানের পথ দেখাবে।

তরুণদের আরেকটি বড় চাওয়াÑ রাজনীতিতে নৈতিকতা ও স্বচ্ছতা। দুর্নীতি, দলীয়করণ ও সুযোগসন্ধানী রাজনীতির প্রতি তাদের গভীর বিরক্তি আছে। তারা চায় নতুন নেতৃত্ব, যেখানে থাকবে যোগ্যতার মূল্যায়ন, নেতৃত্বের নবায়ন ও জনসেবার দায়বোধ। সামাজিক মাধ্যমে তাদের তীক্ষ্ণ মন্তব্য, সচেতন বিশ্লেষণ এবং তথ্যনির্ভর আলোচনা প্রমাণ করে, এই প্রজন্ম কেবল দর্শক নয়Ñ তারা সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হতে চায়।

তরুণদের রাজনৈতিক সচেতনতা যদিও বেড়েছে, কিন্তু তাদের আস্থার সংকটও ততটাই গভীর। বিগত কয়েকটি নির্বাচনের অভিজ্ঞতা তাদের মধ্যে একধরনের হতাশা সৃষ্টি করেছে। অনেকেই মনে করে, ভোট দিলেও ফলাফল নির্ধারিত থাকত আগে থেকেই। তাই আগ্রহ হারিয়েছে অনেকে। এই অনাগ্রহই রাজনীতির জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ। কারণ গণতন্ত্র তখনই টিকে থাকে যখন নাগরিকরা বিশ্বাস করে যে তাদের ভোটের মূল্য আছে। সুতরাং তরুণদের এই বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি।

রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত এই প্রজন্মকে কেবল ভোটার নয়, অংশীদার হিসেবে দেখা। নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি নয় বরং স্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা দিয়ে তাদের সামনে আসা দরকার। কীভাবে তারা তরুণদের জন্য চাকরি সৃষ্টি করবে, কীভাবে শিক্ষাব্যবস্থায় আধুনিকতা আনবে, কীভাবে ডিজিটাল অর্থনীতিকে বাস্তবে রূপ দেবেÑ এসব প্রশ্নের বাস্তবসম্মত উত্তর দিতে হবে। সামাজিক মাধ্যম ও অনলাইন প্রচারণায় তরুণরা যতটা সক্রিয়, রাজনৈতিক দলগুলোরও ততটা বুদ্ধিদীপ্ত হতে হবে যোগাযোগে।

একই সঙ্গে, তরুণ ভোটারদেরও বুঝতে হবে তাদের দায়িত্ব কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তারা কেবল অভিযোগ করলেই চলবে না; গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করাই পরিবর্তনের প্রথম ধাপ। নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রে যাওয়া, সচেতনভাবে প্রার্থী বাছাই করা এবং সঠিক নেতৃত্বকে সমর্থন দেওয়াÑ এই তিনটি কাজই পারে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে।

এই নির্বাচন হতে পারে এক ঐতিহাসিক মোড়, যেখানে তরুণদের ভোটই নির্ধারণ করবে রাজনীতির গতিপথ। তাদের ভোট কেবল সংখ্যা নয়Ñ এটি হতে পারে গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণের প্রতীক। যদি তারা একত্রে সিদ্ধান্ত নেয়, যদি তারা পরিবর্তনের পক্ষে দাঁড়ায়, তবে কোনো রাজনৈতিক শক্তিই তাদের ইচ্ছাকে উপেক্ষা করতে পারবে না।

আজ বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্নÑ তরুণদের মন জয় করতে পারবে কে? যে দল তাদের বিশ্বাস ফিরিয়ে দিতে পারবে, বাস্তব সম্ভাবনা দেখাতে পারবে এবং তাদের স্বপ্নের সঙ্গে রাজনীতির সেতুবন্ধ ঘটাতে পারবেÑ তাদের হাতেই থাকবে বিজয়ের চাবিকাঠি।

তরুণরা আজ আর নীরব নয়। তারা প্রশ্ন করতে জানে, উত্তর চাইতেও জানে। তারা পরিবর্তন চায়, তবে সেই পরিবর্তন হোক গণতন্ত্রের ভিত শক্ত করে, সহনশীলতা ও যুক্তির ভিত্তিতে। তাই বলা যায়, আসন্ন নির্বাচন কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর পরীক্ষাই নয়, এটি তরুণ প্রজন্মের আত্মপ্রকাশেরও মঞ্চ। তারা যদি তাদের ভোটের শক্তি চিনে নেয়, তবে এই দেশ আবার নতুন করে দিকনির্দেশনা পাবে।

এই প্রজন্মের ভোটেই নির্ধারিত হবেÑ বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে কি না গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির পথে। তরুণরা যদি সামনে আসে, তবে আসন্ন নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, হতে পারে আশার এক নতুন সূচনা।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা