× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ইতিহাসের সত্য যেন অস্পষ্ট না হয়

মহিউদ্দিন খান মোহন

প্রকাশ : ১০ নভেম্বর ২০২৫ ১০:২৯ এএম

ইতিহাসের সত্য যেন অস্পষ্ট না হয়

ইতিহাস বিকৃতি বা ইতিহাসের সত্যকে চাপা দিতে আমাদের মতো পারঙ্গম জাতি পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি আছে কি না সন্দেহ। আমরা সবসময় চেষ্টা করি ঐতিহাসিক সত্যকে নিজের সুবিধামতো পরিবেশন করতে। এক্ষেত্রে সুবিধা হলো আমাদের স্মৃতিশক্তি বেশ দুর্বল। কেউ কেউ বলেন, জাতি হিসেবে আমাদের স্মৃতিশক্তি মাছের মতো। মাছের স্মৃতিশক্তি ক্ষণস্থায়ী হওয়ায় বড়শি থেকে ছুটে গেলেও পরমুহূর্তে আবার সে বড়শির টোপ গিলতে দ্বিধা করে না। এই মৎস্যসদৃশ স্মৃতিশক্তির কারণেই আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অনেক মূল্যবান দলিল বিকৃত হয়েছে।

আমাদের জাতীয় জীবনে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর একটি ঐতিহাসিক দিন। তবে এ দিনটি সৃষ্টির পেছনে রয়েছে এক বিরাট প্রেক্ষাপট। ১৯৭৬ সাল থেকে ৭ নভেম্বর দিনটি রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছিল। কিন্তু (২০০৯) সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হওয়ার পর তা বাতিল করা হয়। গত ১৫ বছর দিবসটি বিএনপি দলীয়ভাবে উদযাপন করলেও দিবসটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশ করা যায়নি।

এবার দিবসটি উপলক্ষে বিএনপির পক্ষ থেকে কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করা হয়েছে। সে ক্রোড়পত্রে চোখ বোলাতে গিয়ে চোখ আটকে গেল। ক্রোড়পত্রে ‘স্মৃতিতে ৭ নভেম্বর’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেছেন বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদ (অব.) বীরবিক্রম। যেহেতু ’৭৫-এর ৭ নভেম্বরে মেজর হাফিজের ভূমিকা সম্বন্ধে অবগত ছিলাম, তাই আগ্রহ নিয়ে পড়তে শুরু করলাম, কী লিখেছেন খালেদ মোশাররফের এই সহযোগী। কিন্তু প্রথম প্যারা পড়েই হোঁচট খেলাম। তিনি শুরু করেছেন এভাবেÑ ‘রাত ১২টায় তুমুল গোলাগুলিতে দুটোর ‘দিকলর’ (সম্ভবত টাইপং মিসটেক) শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। দূর থেকে মিলিত কণ্ঠে স্লোগানের শব্দ ভেসে এল ‘সিপাহি জনতা ভাই ভাই, অফিসারের রক্ত চাই। স্তম্ভিত হয়ে গেলাম।...।’ মেজর হাফিজ এরপর তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমানের মুক্তি ও অন্যান্য বিষয় উল্লেখ করলেও তিনি নিজে কী করেছেন, কোথায় গেছেন সে সম্পর্কে কিছু লেখেননি। তিনি এটাও উল্লেখ করেননি, পঁচাত্তরের ৩ নভেম্বর তিনি কোথায় ছিলেন, কী করেছেন। তার ওই নিবন্ধটি পাঠ করলে যে কারও ধারণা হবে, মেজর হাফিজ বুঝি ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লবের পক্ষশক্তি ছিলেন। অথচ ইতিহাস বলে, ৩ নভেম্বর তিনি ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের সহযোগী হিসেবে সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে বন্দি করা এবং ওই অভ্যুত্থানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। তার সে সময়ের কার্যকলাপের সবিস্তার বর্ণনা রয়েছে তারই ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও কোর্সমেট মেজর নাসির উদ্দিনের লেখা ‘বাংলাদেশ : বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তর’ গ্রন্থে। মেজর নাসির তখন কুমিল্লাস্থ সামরিক একাডেমিতে প্রশিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছেন। এরই মধ্যে একদিন ঢাকা থেকে টেলিফোনে মেজর হাফিজ তাকে একদিনের জন্য ঢাকায় যেতে বললেন। মেজর হাফিজের তলব পেয়ে মেজর নাসির পরবর্তী কোনো এক শনিবার ঢাকার উদ্দেশে রওনা হলেন। তাকে দাউদকান্দি ফেরিঘাট পর্যন্ত পৌঁছে দেন মেজর ইমামুজ্জামান। অপর পাড়ে মেজর হাফিজের জিপ অপেক্ষা করছিল। মেজর নাসির সে জিপে ঢাকায় পৌঁছেন। রাত শেষ হওয়ার আগেই তিনি পুনরায় ময়নামতিতে ফিরে আসেন। মেজর নাসির লিখেছেন, ‘সম্ভবত ২৩ অক্টোবরের কথা। ঢাকা সেনানিবাসে পৌঁছলাম রাত ১০টায়। জিপ তীব্র গতিতে এমপি চেকপোস্ট পার হয়ে সোজা গিয়ে ঢুকল মেজর হাফিজের বাসায়।’ (পৃষ্ঠা : ১৭৯)। সেখানে আরও কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলার পর মেজর হাফিজ তাকে অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যাবলি বিস্তারিত অবহিত করেন। ১ নভেম্বর রাতে কুমিল্লা সেনানিবাসের মেসে মেজর নাসিরের সঙ্গে দেখা করেন ক্যাপ্টেন তাজুল ইসলাম (পরে এমপি ও শেখ হাসিনার মন্ত্রী)। ক্যাপ্টেন তাজ নাসিরকে বলেন, ‘ডি ডে’ ২-৩ নভেম্বর মধ্যরাতে। আপনাকে অবশ্যই ২ নভেম্বর রাত ১০টার মধ্যে ঢাকা সেনানিবাসে থাকতে হবে। ঢাকা পৌঁছে মেজর হাফিজের অবস্থান জেনে তারপর সেনানিবাসে প্রবেশ করতে হবে।’ (পৃষ্ঠা : ১৮২)।

পরিকল্পনা মোতাবেক ২ নভেম্বর রাত ১০টার মধ্যেই মেজর নাসির কুমিল্লা থেকে ঢাকায় এসে পৌঁছেন। তিনি লিখেছেন, ‘মেজর হাফিজের বাসায় পৌঁছে তাকে তৈরি অবস্থায় পেলাম। … হাফিজ বলল, ‘কি রেডি?’ বললাম, ‘হ্যাঁ’। হাফিজ জিপের স্টিয়ারিংয়ে গিয়ে বসল। রাতের নিস্তব্ধতা গুঁড়িয়ে জিপ বেরিয়ে এলো ৪৬ ব্রিগেডের বিএমের (ব্রিগেড মেজর) বাসভবন থেকে।’ এরপর তারা যান ব্রিগেড কমান্ডার কর্নেল শাফায়াত জামিলের বাসায়। সেখানে থেকে মেজর হাফিজ ও মেজর নাসির চলে আসেন প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের দপ্তরে।’ সে ঘটনা আমরা শুনব মেজর নাসিরের ভাষ্যে। তিনি লিখেছেন, ‘আমি আর হাফিজ চলে এলাম ১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের দপ্তরে। রাত ১২টা হতে তখনও কয়েক মিনিট বাকি। ক্যাপ্টেন হাফিজুল্লাহ ইতোমধ্যে এসে পড়েছে। সে যাবে এই অভ্যুত্থানের সব থেকে দুরূহ কাজটি সম্পন্ন করতে। জেনারেল জিয়াকে অন্তরীণ করার দায়িত্ব তার ওপর। রাত ১২টা বাজতেই হুইসেলের তীব্র শব্দে জেগে উঠল ঘুমন্ত সৈনিকেরা। এরপর খুলে দেয়া হলো অস্ত্রাগার। ক্যাপ্টেন হাফিজুল্লাহর ৪০ জন সৈনিককে আগেভাগে অস্ত্র-গোলাবরুদ সরবরাহ করতে হবে। মেজর হাফিজের অনুরোধে ক্যাপ্টেন হাফিজুল্লাহর প্লাটুনকে তৈরি হতে খানিক সহায়তা করলাম। হাফিজুল্লাহর উত্তেজনা তখন চরমে। উত্তেজনার কারণে সে অনেকটাই বেসামাল। হাফিজুল্লাহকে আবারও শুনিয়ে দেওয়া হলো তার কর্তব্য। প্রথমত জেনারেল জিয়াকে জানিয়ে দিতে হবে, জেনারেল স্টাফ প্রধানের (খালেদ মোশাররফ) নির্দেশে তাকে অন্তরীণ করা হচ্ছে। তাকে আরও জানাতে হবে যে, পরবর্তী কোনো নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত তাকে তার বাসভবনে নিষ্ক্রিয় থাকতে হবে। তিনি যদি এই নির্দেশ অমান্য করেন, তাহলে ‘ওয়ার্নিং শটস ফায়ার’ করে তাকে সতর্ক করতে হবে। তারপরও তিনি যদি তার গোঁয়ার্তুমি অব্যাহত রাখেন, এক্ষেত্রে নির্দেশ খুবই পরিষ্কারÑ তার মৃত্যু নিশ্চিত করতে হবে। এই নির্দেশের বাস্তবায়নে ক্যাপ্টেন হাফিজুল্লাহ তার সৈন্যদল নিয়ে প্রস্থান করল গন্তব্যে।’ (পৃষ্ঠা : ১৮৭)। মেজর নাসিরের এই বর্ণনা থেকে স্পষ্ট যে, জিয়াউর রহমান যদি সেদিন ওই নির্দেশ না মানতেন তাহলে ওই রাতেই তাকে হত্যা করা হতো। আর সে হত্যার নির্দেশ খালেদ মোশাররফের পক্ষে ক্যাপ্টেন হাফিজুল্লাহকে দিয়েছিলেন মেজর হাফিজ।

৩ নভেম্বরের ব্যর্থ অভ্যুত্থানে মেজর হাফিজের সরাসরি জাড়িত থাকার উল্লেখ রয়েছে আরও তিনজন সাবেক সামরিক কর্মবকর্তার বইয়ে। তাদের একজন কর্নেল শাফায়াত জামিল (একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, রক্তাক্ত মধ্য-আগস্ট ও ষড়যন্ত্রময় নভেম্বর), দ্বিতীয়জন লে. কর্নেল এমএ হামিদ (তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা) ও অপরজন ব্রিগেডিয়ার এম শাখাওয়াত হোসেন (রক্তাক্ত দিনগুলো : ১৯৭৫-৮১)। ৩ নভেম্বরের ব্যর্থ অভ্যুত্থানে খালেদ মোশাররফের অন্যতম সহযোগী ছিলেন কর্নেল শাফায়াত জামিল। আর অভ্যুত্থানে সংশ্লিষ্ট না থাকলেও ঢাকা সেনানিবাসে কর্মরত থাকার সুবাদে বাকি দুই কর্মকর্তা ঘটনাবলি খুব কাছ থেকে অবলোকন করার সুযোগ পেয়েছিলেন। তাদের মধ্যে লে. কর্নেল এমএ হামিদ ৭ নভেম্বরের পর সেনা শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সেনাপ্রধান জেনারেল জেয়াউর রহমানকে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করেছিলেন। তাদের প্রত্যেকের স্মৃতিকথায় স্পষ্ট করেই উল্লেখ আছে, মেজর হাফিজ ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে খালেদ মোশাররফের সহযোগীদের একজন ছিলেন। তখন ৪৬ ব্রিগেড, যেটা ঢাকা ব্রিগেড নামে পরিচিত ছিল, তার ব্রিগেড কমান্ডার ছিলেন কর্নেল শাফায়াত জামিল আর মেজর হাফিজ ছিলেন ব্রিগেড মেজর। নিবন্ধের কলেবর বহুলাংশে বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কায় তাদের বইয়ের হুবহু উদ্ধৃতি দেওয়া থেকে বিরত থাকেত হলো।

তারপর ইতিহাস সবাই জানেন। ৭ নভেম্বর সিপাহি জনতার বিপ্লব সফল হওয়ার পর বঙ্গভবন থেকে বেরিয়ে পালাতে গিয়ে খালেদ মোশাররফ, তার দুই সহযোগী কর্নেল নাজমুল হুদা ও কর্নেল হায়দার বিক্ষুব্ধ সৈনিকদের হাতে নিহত হন। অন্যদিকে বঙ্গভবনের দেওয়াল টপকে পালাতে গিয়ে পা ভেঙে নারায়ণগঞ্জে পালিয়ে যান শাফায়াত জামিল। পরে জিয়াউর রহমানের নির্দেশে তাকে ঢাকার সিএমএইচে এনে ভর্তি করা হয়। আর মেজর হাফিজ প্রথম ইস্ট বেঙ্গলের সঙ্গে পালিয়ে যান ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। পরে সেখান থেকে তাকে ফেরত আনা হয়।

আমি অবাক হয়েছি, মেজর হাফিজ যখন নিবন্ধটি লিখেছেন, তখন কি তার একবারও মনে পড়েনি, ৩ নভেম্বর রাতে ক্যাপ্টেন হাফিজুল্লাকে তিনি কী নির্দেশ দিয়েছিলেন জিয়া সম্পর্কে? সত্যকে গোপন করে ইতিাহাস চর্চা হয় না। আমরা জানি মেজর হাফিজ একজন কুশলী ফুটবলার ছিলেন। সুযোগসন্ধানী গোলদাতা হিসেবেও তার বেশ সুনাম ছিল ঢাকার মাঠে। তার সে কুশলতার প্রমাণ তিনি রাজনীতির মাঠেও রেখেছেন। জিয়ার বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান এবং তাকে প্রয়োজনে হত্যার নির্দেশদাতা হওয়া সত্ত্বেও অনেককে পাশ কাটিয়ে জিয়া প্রতিষ্ঠিত বিএনপিতে ঠিকই জায়গা করে নিয়েছেন। এমনকি ওয়ান-ইলেভেনের কুচক্রীদের মদদে বিএনপির ‘অস্থায়ী মহাসচিব’ পদ দখল করলেও এখন হয়ে গেছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য। রাজনীতির চক্কর বুঝি একেই বলে! সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, দলীয় ক্রোড়পত্রে বিএনপির নীতিনির্ধারকরা কী করে জিয়াকে হত্যার নির্দেশদাতা পঁচাত্তরের ৭ নভেম্বরের বিপ্লবের প্রতিপক্ষ একজনকে দিয়ে অমন একটি নিবন্ধ লেখালেন? তারা কি ইতিহাস সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ? হবে হয়তো বা।

মেজর হাফিজের প্রতি আমার কোনো ব্যক্তিগত বিদ্বেষ নেই। তার আরও তরক্কি হলেও কোনো আপত্তি নেই আমার। কেবল ইতিহাসের সত্যতা যাতে মুছে না যায় তার জন্যই এই আলোচনা। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা