× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট

ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব ও দাউদ ইব্রাহিম হাসান

প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০২৫ ১২:৩৯ পিএম

অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট

১৪ আগস্ট ২০২৫Ñ শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের রাত যেন এক দীর্ঘ আর্তনাদে ডুবে যায়। ঘড়ির কাঁটা তখন আট ছুঁইছুঁই, আর এক নবজাতক, পৃথিবীর আলো দেখার চব্বিশ ঘণ্টা না পেরোতেই, হঠাৎ শ্বাস নিতে লড়ছে মৃত্যুর সঙ্গে। চিকিৎসকের কণ্ঠে উচ্চারিত হয় এক কঠিন রায়Ñ ‘তাকে ঢাকায় নিতে হবে, এখনই’। কিন্তু অভাবের দেওয়ালে ঠেকে যায় জীবনরক্ষার সেই তাগিদ। এক নিম্নবিত্ত পরিবারের হাহাকার মিশে যায় হাসপাতালের ঠান্ডা বাতাসে। অবশেষে যখন একখানা অ্যাম্বুলেন্স মেলে, তখনও সিন্ডিকেটের নির্মম হাত বাড়িয়ে দেয় তার লোহার শৃঙ্খল। কাগজপত্র, অনুমতি, ভাড়াÑ অজুহাতের পর অজুহাত। আর ঠিক সেই বিলম্বের মধ্যেই এক নিঃশব্দ চিৎকার থেমে যায়। রাস্তায়, মায়ের কোলেই, নিথর হয়ে পড়ে ছোট্ট প্রাণটি। পরে মামলা হয়, কিন্তু গ্রেপ্তার হয় মাত্র একজনÑ একটি নাম, একটিমাত্র মুখ। অথচ সিন্ডিকেটের ছায়াগুলো ছড়িয়ে থাকে আরও গভীরে, আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে।

বাংলাদেশ অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতির হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যা ৯,০০০’রও বেশি, আর সরকারি অ্যাম্বুলেন্সও দেড় থেকে দুই হাজারের কম নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এদের কেউই এই সিন্ডিকেটের দাবানল থেকে মুক্ত নয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজের মতো দেশের সর্ববৃহৎ হাসপাতালে সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যা মাত্র সাত থেকে দশটি, যা প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় অদৃশ্য! সুস্থ পরিবেশেও যেখানে প্রতিদিন একশরও বেশি ট্রিপের চাহিদা থাকে, সেখানে রোগী তার এই মৌলিক অধিকারটুকুও পাচ্ছে না, কারণ এই সিন্ডিকেট চক্র যেন সরকারকে পর্যন্ত বধ করে রেখেছে। সিন্ডিকেটের অলঙ্ঘনীয় জাল ভেদ করে রোগীকে অন্য কোনো অ্যাম্বুলেন্সে নেওয়ার যেন কোনো উপায় নেই, সে যতই মুমূর্ষু হোক না কেন।

এই সিন্ডিকেটের কারবার চলে দিনের আলোয়Ñ সবার চোখের সামনেই। কিন্তু সেই আলোর ভেতরেও যেন অদৃশ্য এক অন্ধকার ঘুরে বেড়ায়। আনসার আর পুলিশ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতেই ঘটে এই লেনদেনের নাটক। ঢাকা মেডিকেল কলেজের কিছু কর্মচারী ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ছায়া তাদের রক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়ায়। তারাই ঠিক করেÑ কোন অ্যাম্বুলেন্স আগে ছুটবে, কার অপেক্ষা দীর্ঘ হবে, আর কোন গন্তব্যে কত দামে পৌঁছা যাবে। অসহায় রোগীর কিংবা তার পরিবারের কাঁপতে থাকা হাত থেকে যে টাকাগুলো বেরিয়ে আসে, তার এক মোটা অংশ হারিয়ে যায় এই ভাগাভাগির অন্ধ চক্রে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলেÑ প্রতিদিন দশ হাজারেরও বেশি মানুষ সেখানে আসে আশার আলো খুঁজতে। অথচ, সেই আশার পথেই দাঁড়িয়ে থাকে লোভের ব্যারিকেড। অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া নির্ধারিত হয় না দূরত্ব বা সময়ে, বরং নির্ভর করে রোগীর শ্বাসের ভারে, মৃত্যুর কাছাকাছি যাওয়ার মাত্রায়।

এক ভুক্তভোগী পরিবারের চোখের জলে মিশে থাকা কথাগুলো আজও কানে বাজেÑ ধানমন্ডির পপুলার হাসপাতাল থেকে ঢাকা মেডিকেল পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার জন্য তাদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছিল তেরো হাজার টাকা। অতি সামান্য দূরত্বের এই মূল্য যেন লজ্জার নয়, এক নগ্ন লুণ্ঠনের প্রতীকÑ যেখানে মানবতা বিক্রি হয় মিটারে, আর জীবনের দাম নির্ধারিত হয় সিন্ডিকেটের ইচ্ছামতো।

সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র হলো ঢাকার বাইর থেকে আসা অ্যাম্বুলেন্সের জন্য নিয়ম। যদি কোনো এলাকার অ্যাম্বুলেন্স ফিরতি পথে সেই এলাকার কোনো রোগীকে পেয়ে যায়, তবে সেই চালক বা মালিককে সিন্ডিকেটকে কমপক্ষে ৩০ থেকে ৪০% টাকা অবশ্যই দিতে হবে। এ যেন রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সের ওপর সিন্ডিকেটের টোল আদায়!

আরেকটি অমানবিক নিয়ম সমগ্র অসংগতির পরশÑ বাইরের কোনো অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে এসে যদি রোগী মৃত্যুবরণ করে, তবে সেই স্পর্শোন্মুখ গাড়িতেই লাশ নেওয়া যায় না। মৃতদেহ বহনের অধিকার কেবল তারাই পাবে, যাদের ভাড়া ও কমিশন আগে থেকেই টিকিট করে রাখাÑ এক কড়া, এক নিয়ম, এক ঘন আঁধার। পঙ্গু হাসপাতালের সাধারণ মানুষের নিজস্ব অভিজ্ঞতা এই সিন্ডিকেটের রক্তাক্ত সত্যকে লুকোতে দেয় না; তারা কাঁদতে কাঁদতে বলে ওঠে, ‘যে টাকা ঠিক করা হবে, যে অ্যাম্বুলেন্স ঠিক করা হবেÑ সেইটাকেই মেনে নিতে হবে।’

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের চিত্র আবার ভিন্ন, সেখানে চলছে ‘স্মার্টধর্মী’ সিন্ডিকেট। এক অ্যাম্বুলেন্স চালক জানালেন, এখানে ৪ থেকে ৫ জনের একটি গ্রুপ আছে, যারা নিয়মিত অ্যাম্বুলেন্সগুলো থেকে টাকা তোলে এবং দিন শেষে ‘সিন্ডিকেট রিসেট’ হিসেবে একটি টোকেন দেয়। প্রতিদিন গড়ে ৪০টির মতো ট্রিপ হয় এবং সিন্ডিকেটের কমিশন রেট ৫,০০০ টাকা! পাশে আর্মি-ক্যাম্প হাসপাতাল থাকার পরও তাদের এই স্পর্ধা দেখে মনে হয়, বাংলাদেশের হাসপাতালগুলো মানবিকতার চরম দুর্দশাকে হার মানিয়ে দিয়েছে।

বিআরটিএর প্রতিবেদন বলছে, দেশে রেজিস্টার্ড অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যা ৬,১৬১টি। কিন্তু এর বাইরেও রয়েছে অসংখ্য অনিবন্ধিত যান। একটি বাস্তবিক অঙ্ক কষা যাক : দেশে প্রতিদিন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রায় এক লাখ মানুষ চিকিৎসা নিতে আসে। এদের মধ্যে গুরুতর রোগীর সংখ্যা আট থেকে দশ হাজার। যদি প্রতি অ্যাম্বুলেন্স ট্রিপ থেকে গড়ে ৩,০০০ টাকা সিন্ডিকেটের পকেটে যায়, তবে প্রতিদিন তাদের আয় দাঁড়ায় ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। বছরে এই অবৈধ আয় প্রায় ৮৭৬ কোটি টাকা, যা প্রায় ৯০০ কোটি টাকা! এক কথায় বলতে গেলে, এটি এমন এক বিশাল অর্থের সমাহার, যা বাংলাদেশের প্রথম বাজেটের সারা দেশের নৈতিক অর্থায়নের সমান ছিল। এই ৯০০ কোটি টাকা এখন শুধু সিন্ডিকেটের পকেট ভরায়, যা সম্পূর্ণ অবৈধ, অনৈতিক এবং অমানবিক উপায়ে অর্জিত।

এই সিন্ডিকেট কেবল অর্থের লেনদেন নয়, এটা জীবনের লেনদেন। মানুষের চরম অসহায়ত্বকে পুঁজি করে চলা এই ব্যবসা, যেখানে মুমূর্ষু রোগীর প্রতিটি মুহূর্তের দাম ওঠে টাকায়। শরীয়তপুরের সেই নবজাতকের মৃত্যু যেন আমাদের সমাজের বিবেকের ওপর এক অমোচনীয় কলঙ্কের দাগ এঁকে দিয়েছে। এই ভয়াবহ চিত্র চোখের কোণে যেমন অশ্রু এনে দেয়, তেমনি মনে এনে দেয় হতাশায় ঘেরা কিছু শব্দাবলি …।


ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব, সহকারী অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় 

দাউদ ইব্রাহিম হাসান, রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা