প্রশাসন
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৩ নভেম্বর ২০২৫ ১২:৩২ পিএম
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সরকার যায় সরকার আসে। কিন্তু আমলাতন্ত্র থেকে যায়। গণতন্ত্রের রীতি অনুযায়ী ভোটের মাধ্যমে নির্ধারিত সময় পর জনগণ তাদের পছন্দমতো রাজনৈতিক সরকার বেছে নেয়। সেক্ষেত্রে সরকার পরিবর্তন হলেও প্রশাসন রয়ে যায়। কারণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোয় আমলাতন্ত্র একটি স্থায়ী প্রক্রিয়া। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে রাষ্ট্রের এই কাঠামোটির কোনো পরিবর্তন জড়িত না। আমলাতন্ত্র তথা প্রশাসন রাষ্ট্রের নির্ধারিত আইন অনুযায়ী কাজ করে। যেখানে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি পক্ষপাত থাকার কথা নয়। তা পরিচালিত হয় নির্দিষ্ট কাঠামো ও স্তরবিন্যাসের ভিত্তিতে।
আমাদের প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে উঠেছিল ব্রিটিশদের হাত ধরে। এরপর পাকিস্তানি শাসনামল পেরিয়ে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা প্রবেশ করি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে। কিন্তু প্রশাসনের কোথাও কোথাও রয়ে যায় ঔপনিবেশিক মানসিকতার ছাপ। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে কখনও কখনও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে আমাদের প্রশাসনের কাঠামো ও স্তরের নানান স্থানে ফাটল ধরলেও প্রশাসন তার নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে সচেষ্ট থেকেছে। দলীয়করণের চেষ্টার মাঝেও নিজেদের স্বাতন্ত্র্য ধরে রেখেছে। কিন্তু গত ১৫ বছরে শেখ হাসিনা রেজিমে প্রশাসনের খোলনলচে যেভাবে পাল্টে দেওয়া হয়, প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের যে ন্যক্কারজনকভাবে রাজনৈতিক পক্ষাবলম্বন করতে দেখা গেছে, তা গণতান্ত্রিক যেকোনো রাষ্ট্রকাঠামোতেই বিরল।
এখনও এরই ধারাবাহিকতা বহন করছে আমাদের প্রশাসনের একটি অংশ। অথচ ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রত্যাশা করা হয়েছিলÑ পরিবর্তন আসবে আমলাতন্ত্রে। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর বছর ঘুরে গেলেও সে পরিবর্তনের দেখা মেলেনি। বরং ক্ষেত্রবিশেষে হাসিনা রেজিমের অপচ্ছায়ার বিস্তৃতি এখনও কোথাও কোথাও যে রয়ে গেছে, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত ‘সরকারের ভেতরে সক্রিয় আরেক সরকার’ শিরোনামের প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সরকারি ফাইল গায়েব হয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, প্রধান উপদেষ্টা ও সচিবালয়ে উপদেষ্টাদের কার্যালয়ে অহরহ ফাইল গায়ের হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। এমনকি কোনো কোনো উপদেষ্টার দপ্তরে গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের প্রধানদের নিয়োগের ফাইলসহ আরও অসংখ্য ফাইল সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় বন্দি হয়ে থাকার কথাও বলা হয়েছে।
আমরা মনে করি, সর্বোচ্চ পর্যায়ে কারও টেবিলে উদ্দেশ্যমূলকভাবে এভাবে ফাইল আটকে রাখার ঘটনা প্রশাসনে স্থবিরতা ডেকে আনবে। এটি শুধু দুঃখজনকই নয়, অশনিসংকেতও। এমনকি একজন উপদেষ্টার সঙ্গে সরকারের শীর্ষ এক আমলার মধ্যকার মতপার্থক্যের যে বয়ান প্রতিবেদনটিতে উঠে এসেছে, তাও কোনো শুভ ইঙ্গিত বহন করে না।
শেখ হাসিনা রেজিমে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত আমলাতন্ত্রের শৃঙ্খলা ফেরাতে যে উদ্যোগ প্রয়োজন, বাস্তবে তা এখনও অনুপস্থিত। অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের পর বড় রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরেও প্রশাসনের পদপদবি ভাগাভাগিতে ব্যস্ত হওয়ার নজির আমরা দেখেছি। এমনকি যে ছাত্রদের নেতৃত্বে অভ্যুত্থান তাদের মাঝেও কেউ কেউ অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতার কাছাকাছি এসে নিজেদের মতো করে প্রশাসনে রদবদলে এবং ভাগাভাগিতে ব্যস্ত হয়েছেন।
হাসিনা রেজিমে প্রশাসন যেভাবে রাজনৈতিক দলের ঝান্ডা উড়িয়েছে, আমাদের প্রত্যাশা ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রশাসন সেই অপসংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসবে। প্রশাসন কারও ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার হবে না। তা কোনো গোষ্ঠীর হাতিয়ার হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করবে না। বরং সামাজিক ন্যায়বিচার ও সাম্য নিশ্চিতে পরিচালিত হবে। অথচ এখনও শর্ষের মধ্যে থেকে যাওয়া ভূতের আছড়মুক্ত হয়নি প্রশাসন। আমরা মনে করি, প্রশাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরাতে হলে প্রশাসনকে পুরোপুরি বিদলীয়করণ করতে হবে। প্রশাসন তার নির্ধারিত আইন অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে কোনো ভাগাভাগির দ্বন্দ্বে নয়, বরং যোগ্যতার নিরিখেই প্রশাসনের সবস্তরের নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। ক্ষমতার পালাবদলের পর প্রশাসনে যারা রঙবদল করেছে, অযোগ্য হয়েও পদপদবি বাগিয়ে নিয়েছে, তাদের চিহ্নিত করে প্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর জন্যও আমরা বলি।
প্রশাসনে এখনও সক্রিয় একটি পক্ষ, যারা পতিত সরকারের আস্থাভাজন, তারা চাইছে ভোল পাল্টাতে। অন্য পক্ষ, যারা এতদিন উপেক্ষিত ছিল, তারা চাইছে রাতারাতি ক্ষমতার স্বাদ নিতে। আবার একটি পক্ষ সরকারকে পুরোপুরি উপেক্ষা করছে। তারা মনে করছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক সমর্থন না থাকায় নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী তাদের মত প্রতিষ্ঠা করবে। আমরা মনে করি, এ ধরনের সব অপশক্তিকে রুখে দিয়ে আমলাতন্ত্রকে সঠিকপথে আনতে হবে। তাদের মনে করিয়ে দিতে হবে, প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জনগণের সেবক। দেশের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রার জন্য এই শৃঙ্খলা ফেরানো যেমন জরুরি, তেমনি যে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রত্যাশায় জাতি অপেক্ষা করছে, সেজন্যও জরুরি। যদি আমলাতন্ত্রকে সঠিকপথে পরিচালিত করা সম্ভব না হয়, তাহলে অনেক প্রত্যাশিত আকাঙ্ক্ষিত নির্বাচনও প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। আমরা প্রত্যাশা করি, অন্তর্বর্তী সরকার সত্যিকার জনবান্ধব জনপ্রশাসনের ভিত তৈরিতে যোগ্যতা, মেধা ও সততা নিশ্চিতের সঙ্গে সঙ্গে জবাবদিহিও নিশ্চিত করবে। বর্তমান সরকার প্রধানও সংস্কারের সরকার। এ সরকার আমলাতন্ত্রের মতোন স্থায়ী সরকারের সংস্কার করে গণমুখি, গতিশীল, দক্ষ-যোগ্য ও পক্ষপাতমুক্ত করে যাবেÑএটাই আমাদের প্রত্যাশা।