ইমেইল থেকে
সাদিয়া সুলতানা রিমি
প্রকাশ : ২৫ অক্টোবর ২০২৫ ১১:২৬ এএম
আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৩১ এএম
সম্প্রতি দুটি মৃত্যুর সংবাদ মনকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী হোটেলে খেতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই মারা গেছেন। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক তরুণ বান্দরবানে ঘুরতে গিয়ে হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকে প্রাণ হারিয়েছেন। দুটি ঘটনা ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ঘটলেও এর পেছনে লুকিয়ে আছে একই ভয়াবহ বাস্তবতা বাংলাদেশের তরুণ সমাজ আজ এক গভীর সংকটে নিমজ্জিত। অল্প বয়সে হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি বিকল, কিংবা ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা যেন এখন নিত্যনৈমিত্তিক। প্রশ্ন জাগে, একটি তরতাজা প্রজন্ম কেন এভাবে হঠাৎ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে?
এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের চোখ ফেরাতে হয় প্রতিদিনের খাবারের থালার দিকে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত যা কিছু আমরা খাই ভাত, মাছ, মাংস, সবজি, ফল সবকিছুতেই মিশে আছে ভেজাল ও বিষ। আমরা প্রতিদিন অজান্তেই গ্রহণ করছি মৃত্যু-ডেকে-আনা রাসায়নিক। যে দুধ শিশুদের সবচেয়ে নিরাপদ খাদ্য হওয়ার কথা, সেটিতেও মেশানো হয় ডিটারজেন্ট ও ইউরিয়া। বাজারের ফল পাকানো হয় ক্যালসিয়াম কার্বাইডে, মাছকে টাটকা রাখতে ব্যবহার হয় ফরমালিন, আর শাকসবজিতে থাকে অতিমাত্রায় কীটনাশক ও টেক্সটাইল ডাই।
এক সময় মনে করা হতো, এসব সমস্যা কেবল বয়সি মানুষদের। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, অফিসপাড়ার তরুণ, এমনকি কিশোর বয়সিরাও হার্ট অ্যাটাকে মারা যাচ্ছে। ডাক্তারদের মতে, খাবারের বিষাক্ত উপাদানগুলো শুধু শারীরিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নষ্ট করে না, এটি মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলে। বিষাক্ত রাসায়নিক মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটার ব্যাহত করে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং ঘুমের সমস্যা সৃষ্টি করে। ফলাফল অসুস্থ দেহ ও বিপর্যস্ত মন নিয়ে বড় হচ্ছে এক পুরো প্রজন্ম।
আমরা এমন এক সমাজ তৈরি করেছি, যেখানে সততা নয়, প্রতারণা সফলতার মাপকাঠি। ব্যবসায়ী জানে সে ভেজাল মেশাচ্ছে, তবুও করে, কারণ জানে কেউ তাকে জবাবদিহি করতে আসবে না। ভোক্তাও জানে খাবারে বিষ আছে, তবুও চুপ করে খায়, কারণ বিকল্প নেই। প্রশাসনও জানে, কোথায় ভেজাল হচ্ছে, কিন্তু সেখানে রাজনৈতিক প্রভাব, ঘুষ, আর স্বার্থের জাল ছড়িয়ে আছে। এক কথায় এ এক সম্মিলিত নীরবতার সংস্কৃতি। এই নীরবতা শুধু অপরাধীদের উৎসাহিত করে না, এটি ধীরে ধীরে জাতির নৈতিক ভিত্তিও ধ্বংস করে দেয়।
এখন সময় এসেছে এই নীরবতা ভাঙার। আমরা যদি চাই, পরবর্তী প্রজন্ম সুস্থভাবে বাঁচুক, তাহলে তিনটি ক্ষেত্রে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে :
১. ফরমালিন, কার্বাইড, কীটনাশক ও ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার ও বিক্রির বিরুদ্ধে কঠোরতম আইন প্রয়োগ করতে হবে। শুধু আইন করলেই চলবে না, তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। আদালতের মাধ্যমে দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিলে তবেই ভয় সৃষ্টি হবে। খাদ্যে ভেজালকে ‘অপরাধ’ নয়, ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’-এর পর্যায়ে বিবেচনা করা উচিত, কারণ এটি জাতিকে ধ্বংস করছে।
২. সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে গবেষণায় বড় পরিসরে অর্থায়ন জরুরি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে আধুনিক টেস্ট ল্যাব স্থাপন করতে হবে, যাতে নিয়মিতভাবে খাদ্যের মান যাচাই করা যায়। স্থানীয় প্রশাসনকে প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রতিটি জেলার বাজার মনিটরিং জোরদার করা উচিত।
৩. আইনের প্রয়োগ যতই কঠোর হোক, নৈতিকতার জাগরণ ছাড়া সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। ব্যবসায়ী, উৎপাদক, পরিবেশকÑ এমনকি ভোক্তাদের মধ্যেও নৈতিক চেতনা ফিরিয়ে আনতে হবে। স্কুল-কলেজের শিক্ষাক্রমে ‘খাদ্য নিরাপত্তা ও নৈতিক ব্যবসা’ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। সমাজের প্রতিটি স্তরে সৎ ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি না হলে আমরা বারবার একই জায়গায় ফিরে যাব।
সময় এসেছে জেগে ওঠার, নড়েচড়ে বসার। ভেজালের বিরুদ্ধে যুদ্ধটা শুধু সরকারের নয়Ñ এটি প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। দোকানদার, কৃষক, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, সাংবাদিক সবাইকে যুক্ত হতে হবে এই সংগ্রামে। আমরা চাই ভেজালের বিরুদ্ধে যুদ্ধটা হোক সবার।
সাদিয়া সুলতানা রিমি
শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়