সিরিয়াল অগ্নিকান্ড
ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব, সহকারী অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ও দাউদ ইব্রাহিম হাসান, রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশ : ২৩ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৫৭ এএম
মিরপুরের শিয়ালবাড়ীর সেই টিনের চালের নিচে, ছোট্ট ঘরেই ছিল আছিলা বেগম এবং তার পৃথিবী। স্বামী আনোয়ার আর মেয়ে ফরিদাই ছিল তার জীবনের সবটুকু সঞ্চয়। তাদের চাওয়া-পাওয়া ছিল সাধারণভাবে দুবেলা দুমুঠো ভাত খেয়ে শান্তিতে বেঁচে থাকা। কিন্তু ভাগ্য যেন সেদিন রাত থেকেই চুপি চুপি তাদের সেই ছোট্ট স্বপ্নগুলোকে ছাই করে দিতে শুরু করেছিল।
সময়টা ২০২৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর, গভীর রাত ১টা ৫০ মিনিট। কনকনে শীতের মধ্যেও দেশের প্রাণকেন্দ্র থেকে আসা এক আগুনের খবর যেন সবকিছু স্তব্ধ করে দেয়। বাংলাদেশ সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনে আগুনÑ যেখানে দেশের শাসন আর নিয়ন্ত্রণের যাবতীয় দলিল থাকে। আছিলা রাত জেগে গণমাধ্যমে শুনছিলেন, কীভাবে ১৯টি ফায়ার সার্ভিসের ইউনিট প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরে লড়েও সেই আগুন পুরোপুরি নেভাতে পারেনি। সকাল ৮টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও, রাষ্ট্রের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মূল্যবান নথি পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। আছিলা সেদিন দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলেন : ‘এ কেমন দেশ গো! সরকার যেখানে বসে, সেখানেও যদি আগুন লাগে। তবে কি এই আগুন ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলের কোনো প্রমাণের দলিলাদি নষ্ট করার জন্য লাগানো হয়েছিল?’ এই প্রশ্নটা যেন বাতাসে বিষ ছড়াল। এই আগুন ছিল বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, ছিল এক গভীর ষড়যন্ত্রের প্রথম স্ফুলিঙ্গ। আর সেই ষড়যন্ত্রের শিকার হতে চলেছে আমাদের গল্পের নায়ক আনোয়ার।
মাত্র দশ মাসের ব্যবধানে, নিয়তি তার ভয়াল চেহারা নিয়ে ফিরে এলো ১৪ অক্টোবর ২০২৫, মঙ্গলবার। বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে, আছিলা শুনতে পেলেন এক চাপা চিৎকার। দৌড়ে গিয়ে দেখেন, তার স্বামী আনোয়ার যেখানে কাজ করতেন, সেই রূপনগরের ‘আনোয়ার ফ্যাশন’ পোশাক কারখানায় দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন। চারতলা ভবনের পাশে থাকা টিনের চালের রাসায়নিক গুদামে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে সবকিছুকে গ্রাস করল। ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিট এসে পৌঁছানোর আগেই, বহু শ্রমিক ভেতরে আটকা পড়লেন। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন আনোয়ার।
আছিলা পাগলের মতো কাঁপা হাতে কারখানার পোড়া দেওয়াল স্পর্শ করে শুধু চিৎকার করতে পারতেন। সন্ধ্যা গড়াল, রাত নামল, আর সেই আগুনে পুড়ে অঙ্গার হলো ১৬ জন নিরপরাধ প্রাণ। ফরিদা মায়ের আঁচল ধরে শুধু কাঁদছিল : ‘মা, বাবার জামার সেই গন্ধটা আর পাচ্ছি না কেন?’ এই ১৬টি মৃত্যু কেবল প্রাণহানি নয়, ছিল দেশের বর্তমান ইকোনমির সঙ্গে সবচেয়ে বেশি রিলেটেড একটি সেক্টরকে ভেঙে দেওয়ার এক নিষ্ঠুর উদাহরণ।
এ ঘটনার ক্ষত শুকানোর আগেই, পরের দুদিনের ঘটনাগুলো যেন প্রমাণ করলÑ এগুলো কেবল দুর্ঘটনা নয়। ১৭ অক্টোবর ২০২৫, চট্টগ্রাম ইপিজেডের দুটি কারখানায় প্রায় ১৭ ঘণ্টা ধরে আগুন জ্বলল, যেখানে দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পের কনসাইনমেন্ট তৈরি হয়। আর ১৮ অক্টোবর ২০২৫, শনিবার দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে, দেশের প্রবেশদ্বার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে আগুন। ২৮টি ইউনিটকে সেদিন লড়তে হয়েছিল। এই চারটি ঘটনাÑ সচিবালয়, পোশাক কারখানা, ইপিজেড, বিমানবন্দরÑ দেশের প্রশাসন, শিল্প, অর্থনীতি ও যোগাযোগের মূল স্তম্ভ। এই সবগুলোকে একই সময়ে আঘাত করা কি তবে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে স্যাবোটাজ করে অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করার সেই নীলনকশা নয়, যা কিছু শক্তিশালী ও মানুষের টাকা মেরে দেওয়া দোসররা বাস্তবায়ন করছে?
দোসরদের দুরভিসন্ধিমূলক পরিকল্পনা কেবল আগুন আর ধ্বংসেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তারা হাই-ভ্যালু টার্গেট অ্যাসোসিনেশনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের কাঠামোতে আঘাত করেছে, ধর্মীয় স্থানে অতর্কিত হামলা করে মানুষের সবচেয়ে আবেগের জায়গায় বিরোধ সৃষ্টি করেছে। তারা জাল টাকা ছড়িয়ে এবং সাইবার আক্রমণ করে অর্থনৈতিক ট্রানজেকশন অচল করার চেষ্টা করেছে। আর সবচেয়ে জঘন্য কাজটি করেছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের প্রাইস স্যাবোটাজ করার লক্ষ্যে সাপ্লাইচেইনে আঘাত হেনে। তারা দেশের মানুষের একটু ন্যূনতম বেঁচে থাকার সুযোগটুকুও নষ্ট করে দিয়েছে।
এই দুরভিসন্ধির মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে দেশের মানুষ আজ প্রশ্ন তুলছে। দেশের সামরিক-আধা সামরিক বাহিনীর ভেতর উত্তেজনা সৃষ্টি করে, অফিসারদের অপরাধে শামিল করে, সেনাবাহিনীকে অবমূল্যায়ন করে দেশের অসম্মানজনক পরিস্থিতি তৈরির জন্য কি তবে এই ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা একাই দায়ী নন? এই সামরিক বাহিনীকে পথে-ঘাটে মাঠে ব্যবহার করা, আর পুলিশ প্রশাসনকে নিজস্ব দায়িত্ব পালনে বিরত রেখে জাতিকে বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দেওয়াÑ এ সবই যেন এক বিশাল প্ররোচনা।
আর এই সবকিছুর চূড়ান্ত ফল দেখা গেল যখন ‘২০২৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষার রেজাল্টের ভরাডুবি’ হলো। গড় পাসের হার মাত্র ‘৫৮.৮৩ শতাংশ’Ñ যা দেশকে বুঝিয়ে দিল আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কতটুকু ভঙ্গুর। খুবই আফসোসের বিষয়, একটি পরিসংখ্যান করলে খুব ভালোভাবে বোঝা যায় যে, মোট শিক্ষার্থীর প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীই সামান্য উত্তীর্ণ হওয়ার যোগ্যতাটুকুও অর্জন করতে সক্ষম হয়নি। বিশ্ব শিক্ষার খাতিরে প্রতিনিয়ত এগিয়ে যাচ্ছে, আর আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। এই মেধাশূন্যতা কি ‘আগামী ১০০ বছরের জন্য জাতির এক বড় কাল’ হয়ে দাঁড়াবে না? এই প্রশ্নটি কেবল একটি প্রশ্ন নয়, এটি প্রতিটি মা-বাবার চোখে জল এনে দেওয়া এক করুণ বাস্তবতা।
যদি এই আগুন আর ষড়যন্ত্রের পথ বন্ধ না হয়, তবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এক ভয়াবহ পরিণতি বরণ করতে হবে। আনোয়ারের মৃত্যুর পর আছিলা বেগমের মতো হাজারো পরিবার পথে বসবে। দেশের অর্থনীতি এতটাই বিপর্যস্ত হবে যে কেবল অর্থের মাধ্যমে নয়, ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে দিয়ে তৈরি হওয়া ‘গণহিস্টোরিয়া’ এবং সামাজিক অস্থিরতা আমাদের শেষ করে দেবে।
ছাত্রসমাজ আজ মাদকের এক বিশাল সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছে। কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত, ছুরি, ডাকাতিÑ এসবের কারণে দেশের অনেক মানুষই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। শিশুরা আসক্তিতে ডুবে তাদের শৈশব হারাচ্ছে। এ সবকিছুর মূলে রয়েছে শিক্ষা ব্যবস্থার পতন, যেখানে ‘মানবসম্পদকে মানব অর্থনীতিতে পরিণত করার সুযোগ’ নষ্ট হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি যদি না পাল্টায়, তবে দেশের প্রতিটি সেক্টরের মানুষ, প্রতিটি বয়সের মানুষ চরমভাবে ভোগ করবে। আর ফরিদার মতো নিষ্পাপ শিশু, যে বাবার পোড়া গন্ধ খুঁজে বেড়ায়, সে রাষ্ট্রের প্রতি কোনো ‘আস্থা আর শ্রদ্ধা’ নিয়ে বড় হতে পারবে না।
আছিলা বেগম আজ আর কেবল কাঁদেন না। তার চোখে এখন কেবল দৃঢ়তা। তিনি জানেন, তার স্বামীকে ছিনিয়ে নেওয়া আগুনকে পরাজিত করতে হবে। তার মতো লাখ লাখ সাধারণ জনতা, স্কুল শিক্ষার্থী, এবং বিভিন্ন গঠনমূলক সংস্থা আজ দায়িত্বশীলভাবে এগিয়ে এসেছে। তারা বুঝেছে, দেশকে অচল করার দায়িত্ব কিছু খারাপ মানুষ নিলেও, ‘দেশকে ঘুরে দাঁড়ানোর দায়িত্ব দেশের সকল জনগণকেই নিতে হবে।’ সচেতন নাগরিকদের কথা শুনতে হবে এবং সচেতনতা ছড়িয়ে দিয়ে মানুষকে সুন্দর এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের জন্য এগিয়ে আসতে হবে।
যদি পুলিশ তার কাজে আগ্রহ প্রকাশ না করে, তবে দেশের এত বেকার শক্তিকে কাজে লাগিয়ে একটি নতুন বাহিনী তৈরি করতে হবে, যারা দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি সামাল দিতে সদাসর্বদা প্রস্তুত থাকবে। প্রতিটি অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ দায়িত্বে থাকা লোকজনকে ঘুষ ও অপরাধ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে দেশ গঠনে এগিয়ে আসতে হবে। এই মানবিক উদ্যোগেই সমাজের উন্নতি হতে পারে। এই দেশ একদিন আবার ঘুরে দাঁড়াবে, যখন ‘একটি সঠিক কার্যব্যবস্থাকে কার্যকর করা যাবে।’ কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত আওয়াজ।
এ সমস্যার সমাধানে প্রয়োজন গভীর আত্ম-পর্যালোচনা, প্রশাসনিক ও সামরিক বাহিনীর ভেতর সুনির্দিষ্ট সংস্কার এবং জনগণের মধ্যে এক দৃঢ় আকাঙ্ক্ষা। সমস্যাটি প্রতিনিয়তই মানুষ ভোগ করছে। কিন্তু প্রতিরোধ ও প্রতিকারে এগিয়ে আসছে না। এই নীরবতা ভাঙতেই হবে। একটি কার্যকর রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে, যা এই ষড়যন্ত্রের জালকে ছিঁড়ে দিতে পারে। এই সমস্যার সমাধান সম্ভব, যদি খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। আর সেই পদক্ষেপের জন্য আমাদের বুকে ধারণ করতে হবে এক বিদ্রোহের আগুন।