অব্যবস্থাপনায় পাটকল
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০২৫ ১১:০৬ এএম
একসময় বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণ ছিল পাট। পাটকলগুলো ছিল গৌরবের নাম, ছিল কৃষকের ভরসা আর রাষ্ট্রের কাছে রপ্তানির প্রধান উৎস। বিশ্বে পরিচিতি ছিল সোনালি আঁশের দেশ হিসেবে। সে সময় সোনালি আঁশের ঘ্রাণে ভরে উঠত গ্রামবাংলার মাঠ, নদীপাড়ের ঘাট। কৃষকের মুখে হাসি, শ্রমিকের হাতে কাজ, দেশের কোষাগারে বিদেশি মুদ্রার প্রবাহÑ সবই ছিল পাটের কল্যাণে। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই জৌলুস ঠাঁই নিয়েছে ইতিহাসের পাতায়। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সেই গৌরবময় শিল্প খাতটি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। সোনালি আঁশের গৌরব যেন আজ কেবলই ইতিহাসে রূপ নিচ্ছে।
উল্লেখ্য, স্বাধীনতার পর জাতীয়করণ নীতির অংশ হিসেবে তৎকালীন সরকার দেশের বেশিরভাগ পাটকলের মালিকানা নেয়। উদ্দেশ্য ছিল, জাতীয় সম্পদ হিসেবে পাট শিল্পকে সংরক্ষণ ও আধুনিকায়ন করা। কিন্তু শুরুতেই অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, অদক্ষ পরিচালনা আর রাজনৈতিক প্রভাব পাটকল শিল্পকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছে। পাশাপাশি সময়ের সঙ্গে যোগ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিবান্ধব না হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রস্তুতির ঘাটতিÑ সব মিলিয়ে পাটকলগুলো হয়ে ওঠে লোকসানি প্রতিষ্ঠান। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়েছে কিন্তু পণ্যের মানোন্নয়ন হয়নি। সিনথেটিক বা কৃত্রিম আঁশও পাটের মস্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়ায়। ২১ অক্টোবর প্রতিদিনের বাংলাদেশে ‘পাটকল নামটাই কি ইতিহাস হয়ে যাবে’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে দেশের পাটকলগুলোর দুরবস্থার নানা চিত্র।
সবচেয়ে বড় অভিযোগ, বিজেএমসির অকার্যকর নীতি ও অবহেলার কারণে- হাজারো শ্রমিকের জীবনে নিয়ে এসেছে অন্ধকার। যাদের ঘামেই একদিন দেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরেছে, আজ তারাই বেকার, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে দাঁড়িয়ে। ধারাবাহিকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে আদমজী, নরসিংদী, খালিশপুরের মতো ঐতিহাসিক পাটকল। ফাঁকা পড়ে থাকা মিলগুলো আজ নিঃসঙ্গ সাক্ষী, যেন এক হারানো গৌরবের স্মারক। অথচ এই পাট দেশের সংস্কৃতি, কৃষি ও শিল্পÑ তিন ক্ষেত্রেই গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। সে কারণে রাষ্ট্রীয় পাটকলগুলো শুধু উৎপাদনকেন্দ্র নয়, ইতিহাস ও মানুষের জীবনের অংশ। আজ যখন একে একে লিজে চলে যাচ্ছে এই শিল্পের দুর্গগুলো, তখন প্রশ্ন জাগেÑ সোনালি আঁশের সেই গৌরব কি ফিরবে না কখনও।
আমরা মনে করি, পরিকল্পনা ছাড়া এভাবে লিজনীতি চলা উচিত নয়। এই নীতি বন্ধ না করা গেলে হয়তো ইতিহাসের পাতায় ‘পাটকল’ শব্দটি কেবলই স্মৃতি হয়ে থাকবে। স্থানীয়রা বলছেন, এভাবে লিজে চলে যাওয়া মানে একসময় জমিগুলো শিল্পকারখানা ছাড়া অন্য কাজে ব্যবহারের ঝুঁকিও তৈরি করছে। সরকার বলছে, লোকসান রোধে ও উৎপাদন সচল রাখতে বেসরকারি ব্যবস্থাপনা জরুরি। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। শ্রমিক হারাচ্ছে চাকরি, সরকারের আয় কমছে, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের প্রভাব বাড়ছে।
ইতিহাসের পাঠ থেকে জানা যায়, ১৯৫০ সালের শুরুর দিকে আদমজী গ্রুপের প্রতিষ্ঠিত আদমজী জুট মিলস বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে পর্যন্ত ছিল লাভজনক প্রতিষ্ঠান। পৃথিবীর অন্যতম বড় পাটকল ছিল আদমজী জুট মিলস। স্বাধীনতার পর আদমজীসহ আরও প্রায় ৮২টি বেসরকারি পাটকলকে জাতীয়করণ করে সেগুলোর ব্যবস্থাপনার জন্য ১৯৭৪ সালে বিজেএমসি গঠন করা হয়। জাতীয়করণ হলেও শুরু থেকেই এই পাটকলগুলো চরম অব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে থাকে। একসময় লোকসানের বিষয়টি সামনে আসে। এমনি এক বাস্তবতায় ২০০২ সালে এশিয়ার সবচেয়ে বৃহৎ আদমজী জুটমিলটির সব শ্রমিক-কর্মচারীকে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে বিদায় করার মধ্য দিয়ে দেশের শিল্প খাতের এক সুবর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটে। কালক্রমে খুলনা-যশোরের রাষ্ট্রায়ত্ত নামকরা পাটকলগুলোও একই পরিণতির শিকার হয়। একে একে থেমে যেতে থাকে এসব কারখানার সাইরেন। বেকারত্বের অভিশাপ নেমে আসে অসংখ্য শ্রমিকের জীবনে। সেবার খুলনা-যশোর অঞ্চলের ৯টি রাষ্ট্রীয় পাটকলের মধ্যে ছয়টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে লিজের মাধ্যমে। এর মধ্যে আবার দুটি মিলের মালিকানা নিয়েছে ভারতীয় কোম্পানি। উল্লেখ্য, সরকার ২০২০ সালে একসঙ্গে ২৫টি রাষ্ট্রীয় পাটকল বন্ধের ঘোষণা দেয়। এ মধ্য দিয়েই শুরু হয় নতুন অধ্যায় লিজ দেওয়া প্রক্রিয়া।
আজ যখন প্রশ্ন উঠছে, পাটকল কি শুধু ইতিহাস? তখন উত্তর খুঁজে পাই আমাদেরই ব্যর্থতার। আমরা মনে করি, সময় এখনও ফুরিয়ে যায়নি। যদি রাষ্ট্র, উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তি মিলে নতুন করে পরিকল্পনা নেয়, তবে ‘সোনালি আঁশ’ আবারও ঝলমল করবে বিশ্ববাজারে। তাই আশা হারানো ঠিক নয়, বিশ্ব যখন প্লাস্টিকের বিকল্প খুঁজছে, তখন পরিবেশবান্ধব পাটজাত দ্রব্য আবার নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে। যদি পরিকল্পনা হয় সঠিক, প্রযুক্তি হয় আধুনিক, আর প্রশাসন হয় স্বচ্ছ, তবে সোনালি আঁশ আবারও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। তাই পাটকে ইতিহাস নয়, ভবিষ্যতের সম্ভাবনা হিসেবে দেখতে হবে। সরকার এই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপারে একটি সুনিদিষ্ট নীতিমালা তৈরি করে এই সম্ভাবনাকে ধরে রাখবে, টিকিয়ে রাখবে সেই বিশ্বাস আমাদের রয়েছে। আমরা চাই, এই লিজ প্রক্রিয়া থেকে সরকার ফিরে আসুক।
তার জন্য শুধু প্রয়োজন ইচ্ছাশক্তিÑ সরকার, উদ্যোক্তা, শ্রমিকের। মনে রাখতে হবে, পাট শুধু একটি ফসল নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্য, আত্মমর্যাদা, স্বপ্নের প্রতীক। সেই স্বপ্ন আবার ফিরিয়ে আনাই হোক সবার অঙ্গীকার। যে অঙ্গীকারে আমরা একদিন বলতে পারি, পাটকল ইতিহাস নয়, আমাদের পুনর্জাগরণের প্রতীক।