পরিবেশ
ড. আনোয়ার হোসেন চৌধুরী, সহকারী অধ্যাপক, বিআইজিএম
প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০২৫ ১০:৫৭ এএম
ছবি: সংগৃহীত
গত ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ জাতিসংঘের ৮০তম সাধারণ অধিবেশনে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে ভাষণ দেন তার মধ্যে শুধুমাত্র ‘জলবায়ু পরিবর্তন ও নবায়নযোগ্য শক্তি’ নিয়ে যে বক্তব্যটুকু দেন তা নিম্নরূপ : “জনাব ট্রাম্প দাবি করেন যে, ‘জলবায়ু পরিবর্তন’ আসলে বিশ্বের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এক ‘বড় প্রতারণা”। তার মতে, বৈশ্বিক জলবায়ুর উদ্যোগগুলো আসলে উন্নত অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করছে এবং এই দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ব্যাহত করছে।
এই ভাষণে জনাব ট্রাম্প ‘নবায়নযোগ্য শক্তিনীতির’ কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘সৌর ও বায়ুশক্তি কোনো কার্যকর সমাধান নয়, বরং এগুলো ব্যয়বহুল, অনির্ভরযোগ্য এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর প্রযুক্তি। এমনকি তিনি নবায়নযোগ্য শক্তিকে ‘একটি ঠাট্টা’ বলে আখ্যা দেন। তার মতে, ‘ইউরোপসহ যে দেশগুলো কার্বন নির্গমন হ্রাসনীতি গ্রহণ করেছে, তারা নিজেদের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদি সংকটে ফেলে দিচ্ছে’। তাই তিনি সেসব দেশকে সতর্ক করে বলেন যে, ‘যদি দেশগুলো এই নীতিতে অটল থাকে, তবে তাদের অর্থনীতি ধ্বংসের মুখে পড়বে’।
এ ছাড়া এই ভাষণের মাধ্যমে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্তকে ট্রাম্প পুনরায় ন্যায্যতা দেন। তিনি দাবি করেন যে, এই চুক্তিটি প্রকারান্তরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একপেশে অবিচার করেছে এবং অন্য দেশগুলোর ওপর ভিন্ন ধরনের প্রশমন প্রত্যাশা চাপিয়ে দিয়েছে। তার মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার একটি বৈশ্বিক কৌশল মাত্র।
সবশেষে, ট্রাম্প জলবায়ু পরিবর্তনের বৈজ্ঞানিক সংহতি ও প্রচলিত মতকেও এই ভাষণের মাধ্যমে প্রশ্নবিদ্ধ করেন। তিনি জাতিসংঘ ও অন্যান্য বৈশ্বিক সংস্থার জলবায়ু পূর্বাভাসকে ভুল বলে আখ্যা দেন এবং বলেন যে, তিনি মনে করেন, এসব সতর্কবাণী আসলে অতিরঞ্জিত ও বিভ্রান্তিকর। তার পুরো বক্তব্যে বৈশ্বিক জলবায়ু পদক্ষেপের প্রতি অবিশ্বাস এবং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক অবস্থান স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।
ট্রাম্পের এই ভাষণ শুধু বিতর্কিত নয়, বরং সমগ্র গ্লোবাল সাউথের জন্য এক সম্ভাব্য হুমকিস্বরূপ। কারণ, গ্লোবাল নর্থ যদি জলবায়ু-সংক্রান্ত তাদের দায়দায়িত্ব ট্রাম্পের কথায় এড়িয়ে চলে, তবে ভবিষ্যতে জলবায়ু তহবিল ও নতুন প্রযুক্তির হস্তান্তর প্রক্রিয়া ভীষণভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। এতে সাউথের ঝুঁকি নিরসন কার্যক্রম (যেমন বন্যা-প্রতিরোধ বাঁধ, নবায়নযোগ্য শক্তি প্রকল্প, জলবায়ু-সহিষ্ণু কৃষি) আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে বইকি!
এ ছাড়াও গ্লোবাল নর্থ (বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ) যেই উন্নয়ন ও জলবায়ুর পরিবর্তন প্রশমনের পথে চলে, গ্লোবাল সাউথ (দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলো) তাদের উন্নয়ন ও জলবায়ুর পরিবর্তন প্রশমনে প্রায়শই গ্লোবাল নর্থকেই অনুসরণ করে থাকে। কারণ, জলবায়ু তহবিল ও এই বিষয়ক সহায়ক প্রযুক্তি সমূহের সহায়তা সাধারণত উত্তর গোলার্ধের দেশসমূহ থেকেই আসে। আন্তর্জাতিক জলবায়ুনীতি ( যেমনÑ প্যারিস চুক্তি, সিওপি সম্মেলনের সিদ্ধান্ত) গ্লোবাল নর্থের প্রভাবেই নির্ধারিত হয়। দক্ষিণ গোলার্ধের ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকির সম্মুখীন দেশগুলো ( যেমনÑ বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, মালদ্বীপসহ আরও বহু দেশ) নিজেদের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে গ্লোবাল নর্থের সহায়তা ছাড়া এগোতে পারে না।
যদি নর্থের বড় শক্তি (যেমন- যুক্তরাষ্ট্র) জলবায়ু উদ্যোগকে ‘প্রতারণা’ বলে আখ্যা দেয় এবং অন্যরা এজন্য ভবিষ্যতে অর্থায়ন বন্ধ করে দেয় তাহলে আমাদের মতো উন্নয়নশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য জলবায়ু অভিযোজন ও প্রশমন প্রকল্পের জন্য ভবিষ্যতে তহবিল জোগাড় কঠিন হবে। এর ফলশ্রুতিতে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো এককভাবে জলবায়ু পরির্তনের নেতিবাচক প্রভাবের সঙ্গে লড়াই চালাতে বাধ্য হবে, অথচ এ কথা সবারি জানা যে এই বিষয়ে আমাদের সামর্থ্য সীমিত। ফলে, নিদিষ্ট সময়ে রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের যা কিছু করার কথা ছিল ( আইএনডিসি), সেগুলো হয়তো আমরা অর্জন করতে পারব না। এ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশীদাররা যদি সবুজ শক্তিকে ভবিষ্যতে টেকসই বা নির্ভরযোগ্য জ্বালানি পন্থা মনে না করে, তবে সাউথের নীতিনির্ধারকরাও ভবিষ্যতে এই বিষয়ে দ্বিধায় পড়তে পারেন।
জাতিসংঘে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি বিশ্বদর্শনের প্রকাশ, যা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয়তাবাদ ও সংকীর্ণ স্বার্থকে বৈশ্বিক সহযোগিতা ও বৈজ্ঞানিক সত্যের ঊর্ধ্বে স্থান দেয়। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা। বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ছয়টি স্তম্ভের ওপর নির্মিত একটি কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, যার মধ্যে খাদ্য নিরাপত্তা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং দুর্যোগ প্রশমন কৌশল অন্তর্ভুক্ত। তবে কোনো দেশের একার পক্ষে এই লড়াইয়ে এককভাবে জয়লাভ করা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ ও বিশ্বসমাজের জন্য এটা উপলব্ধির সময় যে, ট্রাম্পের বিভ্রান্তিকর বক্তব্য ও বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আক্রমণ আমাদের সম্মিলিত ভবিষ্যতের জন্য হুমকিস্বরূপ। জলবায়ু পরিবর্তন কোনো ‘প্রতারণা’ নয়, এটি একটি বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা। এই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হলে জাতিসংঘের মতো ফোরামগুলোকে আরও শক্তিশালী করা এবং বৈজ্ঞানিক সত্যের ভিত্তিতে সম্মিলিত পদক্ষেপই একমাত্র পথ। নতুবা, বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়বে।