সোনার দাম
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০২৫ ১০:০১ এএম
সোনা প্রতিদিনই ভেঙে চলেছে নিজের দামের রেকর্ড। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ হলুদ বর্ণের ধাতুটির সঙ্গে পরিচিত। স্থায়িত্ব, অপরিবর্তনীয় বৈশিষ্ট্য এবং বিনিময়ের সহজ মাধ্যম হওয়ায় সোনা অতি মূল্যবান ধাতু হিসেবে চিহ্নিত। সেই মূল্য বাড়তে বাড়তে এখন প্রকৃত মূল্যের চেয়েও তার দাম অনেক বেশি। সব রেকর্ড ভেঙে দেশে সোনার দাম এখন দুই লাখ ৯ হাজার পেরিয়েছে। সোনার মতো সম্পদ ঘিরে বাজারে যে অবস্থা, তা অর্থনীতির জন্যও যথেষ্ট ঝুঁকির। এমন আগুনে দামের জেরে মানুষের পক্ষে সোনা কেনা আকাশকুসুম কল্পনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন সোনা থেকে। সাধারণের আয় কমেছে। মূল্যস্ফীতির জের টানতে টানতে বাজারে বিরাজ করছে চূড়ান্ত অনিশ্চয়তা। ফলে অনেকের কাছেই সোনা কেনা এখন বিলাসিতা।
প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘সোনার দামে আগুন’ শীর্ষক শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘দীপাবলি, পূজা কিংবা বিয়ের মৌসুম যে সময়টায় স্বর্ণের দোকানগুলোতে থাকত ক্রেতার উপচে পড়া ভিড়, সেই দোকানগুলো এখন ফাঁকা। একসময় যেখানে প্রতিদিন হাত বদল হতো লাখ লাখ টাকার গয়নাপাতি, সেখানে এখন বিক্রেতারা বসে থাকেন হাত গুটিয়ে। কারণ রেকর্ড পরিমাণ মূল্য বৃদ্ধির কারণে সোনা এখন আর সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নেই।’
প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সোনার মূল্য বৃদ্ধির কারণে হলমার্ক করা ২২ ক্যারেটের এক ভরি সোনার দাম ২ লাখ ৯ হাজার ১০১ টাকা। এ ছাড়া প্রতি ভরি ২১ ক্যারেট ১ লাখ ৯৯ হাজার ৫৯৪ টাকা, ১৮ ক্যারেট ১ লাখ ৭১ হাজার ৮৮ এবং সনাতন পদ্ধতির সোনা বিক্রি হচ্ছে ১ লাখ ৪২ হাজার ৩০১ টাকায়। অথচ ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনা ৮ অক্টোবরও বিক্রি হয়েছে ২ লাখ ২ হাজার ১৯৫ টাকায়। অন্যান্য ক্যারেটের সোনাও বর্তমানের চেয়ে কয়েক হাজার টাকা কমে বিক্রি হয়েছে।
সোনার এই আকাশছোঁয়া দাম, এর পেছনে রয়েছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা। সেইসঙ্গে আমেরিকার শীর্ষ ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের সুদ কমানোকেও বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ ছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও ধারাবাহিকভাবে সোনা কিনছে। ব্যাংক সুদ কমায় বিনিয়োগকারীরাও সুরক্ষিত বিনিয়োগ হিসেবে বেছে নিচ্ছেন সোনা। আর সহজে বিনিময়যোগ্য হওয়ায় অস্থিতিশীল বিশ্বে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে বহু আগে থেকেই রয়েছে সোনার কদর। ফলে হুহু করে বাড়ছে হলুদ এই ধাতুটির দাম।
বিশ্বব্যাপী অস্থিরতা ‘হলুদ ধাতু’র দামে প্রভাব ফেলছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শুল্কনীতি, আমেরিকার মুদ্রাস্ফীতির হার এবং যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের ওপরে বাজারে সোনার দাম অনেকাংশে নির্ভর করছে। তা ছাড়া গত সাড়ে তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থামানোর নামে ইউরোপ এবং আমেরিকার মধ্যে চলছে রাজনৈতিক টানাপড়েন। এর সঙ্গে যোগ হয় ফিলিস্তিনের ওপর ইসরায়েলের আগ্রাসন, ইরানের ওপর আক্রমণ, মধ্যপ্রাচ্যের নানা দেশে হামলা চালানো এবং ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ। এগুলোর প্রভাব সোনার বাজারের ওপরে পড়ে।
টাকা ছাপানোর ক্ষেত্রে স্বর্ণমানও গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সোনা মজুত রাখার বিপরীতে সরকার টাকা ছাপায়। কিন্তু যখন স্বর্ণমানের চেয়ে বাজারে কাগুজে নোটের পরিমাণ বেড়ে যায়, তাতে টাকার মান কমে। ফলে সোনার দাম কমল না বাড়ল সেদিকে প্রায় সকলেরই সারা বছর চোখ থাকে। কিন্তু বর্তমানের যে পরিস্থিতি তাতে করে সোনার বাজারে স্বস্তি ফেরার সুযোগ কম, যা এই পেশার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের জন্যও শঙ্কার। সোনার দামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মুদ্রাস্ফীতি। অর্থাৎ মুদ্রাস্ফীতি বাড়লে সোনার দাম বাড়ে। তখন বিনিয়োগকারীরা সোনার ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
এ অবস্থা চলতে থাকলে বিনিয়োগকারীদের জন্যও ঝুঁকির পরিবেশ সৃষ্টি করবে। অর্থনীতি বিশ্লেষকরা সোনার দাম অস্বাভাবিক বাড়ার প্রবণতাকে ভালো চোখে দেখছেন না। তারা মনে করছেন, বিশ্ববাজারে সোনার মতো সম্পদের দামকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে ঐতিহাসিক স্তরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, যা অর্থনৈতিক সতর্কীকরণের বড় লক্ষণ। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সোনার প্রয়োজন নেই বললেই চলে। বাংলাদেশ যে পরিমাণ সোনা আমদানি করে, তার চেয়ে বড় অংশ আসে অনানুষ্ঠানিক বা চোরাই পথে। আমরা মনে করি অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ভরসায় এই দামের পেছনে সাধারণের দৌড়ানো হবে বোকামির নামান্তর। যা টেনে আনবে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি। আর যে অনিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তাহীনতার অজুহাতে সোনার দাম বাড়ছে, তাতে যাদের ইন্ধন রয়েছে তারাই যে সুযোগ বুঝে দাম কমিয়ে ফেলবে না, সে নিশ্চয়তাও নেই কারও কাছেই। তাই সোনাতে সাধারণ মানুষের বিনিয়োগকে আমরা নিরুৎসাহিত করি। সেইসঙ্গে যারা সোনাকে রূপ দিয়ে অলংকারে পরিণত করে, তাদের ব্যবসায় যে মন্দাভাব, আমরা তাদের দিকেও সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার হাত বাড়ানোর জন্য বলি।