× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মৎস্য খাত

পুষ্টি নিরাপত্তায় মনযোগ দিন

ড. মিহির কুমার রায়

প্রকাশ : ১২ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৪৭ এএম

পুষ্টি নিরাপত্তায় মনযোগ দিন

নদীমাতৃক বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সংস্কৃতি মাছের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। মৎস্য খাত দেশের পুষ্টিনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। ফলে কৃষির পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে মৎস্য ও মাৎস্য খাতে দেশের প্রায় ১২ শতাংশ জনগোষ্ঠী, প্রান্তিক ক্ষুদ্র মৎস্যচাষি, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন কার্যক্রমে এক স্বতন্ত্র ভ্যালু চেইন সচল থাকে। পুকুর, নদ-নদী, মোহনা-উপকূল, সমুদ্র থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫০ দশমিক ১৮ লাখ টন মৎস্য উৎপাদন হয়। এর মধ্যে ৮৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ উৎপাদন হয় অভ্যন্তরীণ জলাশয় থেকে এবং বাকি ১২ দশমিক ৫৩ শতাংশ সমুদ্র থেকে। আবার অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের ৫৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ আসে চাষ এবং ২৮ দশমিক ১৩ শতাংশ মুক্ত জলাভূমি থেকে।

উৎপাদিত মৎস্য ও মৎস্যজাত দ্রব্য হাটবাজার, সুপার মার্কেট এবং রপ্তানির মাধ্যমে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশের ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ জিডিপি এবং কৃষি খাতের ২২ দশমিক ২৬ শতাংশ অবদান রেখেছে। ২০২৩-২৪ সালে প্রায় ৭৭ দশমিক ৪ হাজার টন মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করে ৪৫৩১ দশমিক ৮৬ কোটি টাকা আয় হয়, যা দেশের মোট রপ্তানির মাত্র দশমিক ৯১ শতাংশ। ২০ বছর আগের ২০০৩-০৪ অর্থবছরের সঙ্গে বর্তমানে বাংলাদেশের মৎস্য উৎপাদনক্রমের এক তুলনাচিত্র থেকে দেখা যায়, ২০ বছরে মৎস্য উৎপাদন প্রায় ২ দশমিক ৩৯ গুণ বেড়েছে। 

সামনের পথচলায় এ মান ধরে রাখতে পারলে চলতি বছর মৎস্য চাহিদায় কোনো সমস্যা সৃষ্টি হবে না বলে ধারণা করা যায়। তবে মৎস্য ক্ষেত্রে অতিরিক্ত উৎপাদিত ১ দশমিক ৫ থেকে পাঁচ লাখ টন পণ্য সঠিক নীতিমালা ও বাজারজাত ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন। বাংলাদেশের মৎস্য খাত তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছেÑ অভ্যন্তরীণ আহরণ, চাষকৃত মাছ (অ্যাকুয়াকালচার) এবং সামুদ্রিক/লবণাক্ত পরিবেশে আহরণ। অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে সরবরাহ থেকে মূলত মিঠাপানির ২৬৫টি প্রজাতির মাছের মধ্যে কার্পজাতীয় মাছ (রুই, কাতলা, মৃগেল, কালবাউশ ইত্যাদি), দেশীয় ছোট প্রজাতির মাছ (মলা, ঢেলা, পুঁটি, ট্যাংরা, বেলে, টাকি, মেনি ইত্যাদি) এবং চাষকৃত মাছ যেমন দেশি-বিদেশি কার্প, জিয়ল (শিং, মাগুর, কই, শোলমাছ ইত্যাদি), পাবদা, ট্যাংরা, গলদা চিংড়ি, পাঙাশ ও তেলাপিয়া প্রধান। উপকূলীয় লবণাক্ত অঞ্চলে উৎপাদিত হয় ভেটকি মাছ, মালেট বা খল্লা মাছ, ব্ল্যাক টাইগার চিংড়ি (বাগদা), দ্রুত বর্ধনশীল ভেনামি চিংড়ি ও কাঁকড়া। সামুদ্রিক আহরণে জাতীয় মাছ ইলিশসহ লইট্ট্যা, পোয়া, ছুরি, চান্দা, টুনা, চাপিলা, ম্যাকারেলসহ প্রায় ১০০ প্রজাতির বাণিজ্যিক মাছ, সেফালোপড এবং অন্যান্য তলদেশীয় মোলাস্ক পাওয়া যায়।

খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসাবে, বাংলাদেশে মাথাপিছু দৈনিক মাছ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ৬০ গ্রামের বিপরীতে ভোগ ৬২ দশমিক ৫৮ গ্রাম। মাছ ও মাছজাতীয় পণ্য বাংলাদেশের অন্যতম রপ্তানি পণ্য। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউএসএ, জাপান, রাশিয়া, চীনসহ বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দেশে বাংলাদেশের মাছ ও মাছজাতীয় পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। বর্তমানে ১০৫টি মত্স্য প্রক্রিয়াজাত প্লান্টকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৭৩টি ইউরোপীয় ইউনিয়নে রপ্তানির জন্য অনুমোদিত। ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশ হিমায়িত ও তাজা মাছ রপ্তানি করে ৪৭৭. ৩৭ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে। 

দেশে এখন প্রায় চার কোটি লোক মৎস্য খাতে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে জড়িত। লাভজনক হওয়ায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত মানুষ ও করপোরেট প্রতিষ্ঠান মৎস্য চাষে এগিয়ে এসেছে। মৎস্য খাতে বাংলাদেশের অগ্রগতি বিশ্বের অনুপ্রেরণা এখন। ভালো ব্যবস্থাপনা এবং মৎস্যবিজ্ঞানী, মৎস্য অধিদপ্তর ও জেলেদের নিরলস পরিশ্রম, ত্যাগে এটা সম্ভব হয়েছে। হাওর-বাঁওড়, অন্যান্য জলাশয় ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন, দূষণ রোধ এবং জাতীয় আয়ে মৎস্য খাতের বিপুল অবদানকে স্বীকৃতি দিয়ে জেলেদের জীবনমান উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। তবেই এ অগ্রগতি ধরে রাখা সম্ভব। পৃথিবীর প্রায় ৫২টি দেশে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের মাছের চাহিদা রয়েছে। 

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটÑ বিএফআরআই সূত্রে জানা গেছে, দেশে মোট যে পরিমাণ মাছ উৎপাদিত হয়, তার মধ্যে কার্প, অর্থাৎ রুইজাতীয় মাছ ২১ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হয় রুই মাছÑ ১১ শতাংশ। এর পরে রয়েছে পাঙাশ (১১ দশমিক ৫৫ শতাংশ), তেলাপিয়া (৯ দশমিক ৬৯ শতাংশ), কাতলা (পৌনে ৭ শতাংশ) ও সিলভার কার্প (৭ দশমিক ৩ শতাংশ)। গত এক যুগে দেশি ৩৬ প্রজাতির ছোট মাছের চাষ পদ্ধতি উদ্ভাবন করা হয়েছে। এর ফলে এ সময়ে চাষের মাছ উৎপাদন ৬৭ হাজার মেট্রিক টন থেকে বেড়ে প্রায় আড়াই লাখ মেট্রিক টন হয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে মাছের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ায় জাতীয় অর্থনীতিতে নতুন প্রত্যাশার সৃষ্টি হয়েছে। কৃষির অন্যান্য খাত-উপ খাতের তুলনায় মাছের উৎপাদন বাড়ার হার বেশি। বিগত ১৫-১৬ বছরে এ খাতে বছরে ১০ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। মৎস্য বিভাগের হিসাব অনুযায়ী সাগর এলাকায় প্রতিবছর ৮০০ মিলিয়ন টন মাছ ধরা পড়ে। এর মধ্যে মাত্র দশমিক ৭০ মিলিয়ন টন মাছ দেশের জেলেরা ধরে থাকে। বিশাল সমুদ্রসীমায় মৎস্য সম্পদের ১ শতাংশও ধরতে পারছে না বাংলাদেশের জেলেরা উন্নত জাহাজ ও প্রযুক্তির অভাবে। অন্যদিকে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় কী পরিমাণ মৎস্য সম্পদ রয়েছে, সে ব্যাপারেও কোনো তথ্য সরকারের কাছে নেই।

আমাদের সমুদ্রসীমা নিয়ে অনেক দিন নানা ধরনের বিরোধ ছিল, এখন সে অবস্থা নেই। তারপরেও আমরা কেন আমাদের সমুদ্রসীমায় পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারছি না, সেটাও বিবেচনার বিষয়। সমুদ্র সম্পদ আহরণ এবং এর যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে আমাদের অর্থনীতির চেহারাও বদলে দেওয়া সম্ভব। বিশেষ করে, আমাদের সমুদ্রসীমায় মৎস্য সম্পদ আহরণে বিরাজমান সমস্যাগুলো অবিলম্বে এখন মৎস্য খাতটির সমস্যার উত্তরণে বিভিন্ন দিক, যথা পণ্যবৈচিত্র্য থেকে ব্যবসা ও রপ্তানি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার ভূমিকা ও সম্ভাবনা এবং খাদ্যনিরাপত্তায় ক্রমবিকাশমান কাঠামোর দিকগুলো বিবেচনা করা উচিত যেমন : ১. পণ্যবৈচিত্র্য অনুযায়ী রপ্তানি ; ২. প্রধান রপ্তানি পণ্য ও বাজার ; ৩. বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যবৈচিত্র্যে ও তার নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি নিরূপণ; ৪. প্রিমিয়াম বাজারে প্রবেশ; ৫. সরবরাহে ভলিউম ও ধারাবাহিকতা; ৬. এথনিক বাজার; ৭. বাইপ্রডাক্ট পণ্য; ৭. মূল্য সংযোজন; ৮. মান নিয়ন্ত্রণ ও সার্টিফিকেশন; ৯. উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রজাতির বৈচিত্র্য: ১০. দেশীয় ও রপ্তানি বাজারের জন্য পণ্যের ধরন; ১১. বরফে তাজা মাছ সংরক্ষণ; ১২. হিমায়িত মৎস্যপণ্য সরবরাহ; ১৩. গুণগত শুকনো শুঁটকি ও ধূমায়িত মাছ উৎপাদন ১৪. ফারমেন্টেড বা গাঁজানো ও বিশেষ মৎস্যপণ্য প্রচলন বৃদ্ধি ইত্যাদি। 

আসলে বাংলাদেশের মৎস্য খাত এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে ঐতিহ্য ও পণ্য বাজার রূপান্তরে মেলবন্ধন ঘটছে। সমৃদ্ধ জলজ জীববৈচিত্র্য, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং প্রক্রিয়াজাত ও রপ্তানি ব্যবস্থার উন্নয়ন মিলিতভাবে টেকসই প্রবৃদ্ধিতে মজবুত ভিত্তি তৈরি করতে পারে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে বর্তমানের পরিমাণ-নির্ভর উৎপাদন থেকে গুণগত মানের, নিরাপদ খাদ্যসহ মূল্য সংযোজন পণ্যের দিকে মনোযোগ দিতে হবে উচ্চমূল্যের চিংড়ি ও ইলিশ থেকে শুরু করে কাইটোসান ও কোলাজেনের মতো বাইপ্রডাক্ট-পণ্যের বৈচিত্র্য এনে বিভিন্ন বাজারে প্রবেশ সম্ভব। 

বাংলাদেশের মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্যের ভবিষ্যৎ শুধু উৎপাদন বৃদ্ধিতে নয়, বরং নিরাপদ, ট্রেসেবিলিটি, মূল্য সংযোজিত পণ্য সরবরাহের দিকে নজর দিয়ে ভোক্তার আস্থা অর্জন করতে হবে। সমৃদ্ধ জলজ জীববৈচিত্র্য, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং প্রক্রিয়াজাত ও রপ্তানি ব্যবস্থার উন্নয়ন মিলিতভাবে টেকসই প্রবৃদ্ধিতে মজবুত ভিত্তি তৈরি করতে পারে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে বর্তমানের পরিমাণ-নির্ভর উৎপাদন থেকে গুণগত মানের, নিরাপদ খাদ্যসহ মূল্য সংযোজন পণ্যের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।


ড. মিহির কুমার রায়

অধ্যাপক, সাবেক ডিন ও সিন্ডিকেট সদস্য, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা