× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ইমেইল থেকে

ভারসাম্যপূর্ণ বৈদেশিক ঋণ কৌশল চাই

মো. নূর হামজা পিয়াস

প্রকাশ : ০৪ অক্টোবর ২০২৫ ১২:৩৩ পিএম

ভারসাম্যপূর্ণ বৈদেশিক ঋণ কৌশল চাই

বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে চীনের প্রভাব দিন দিন বাড়ছে। চীন তার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা বিআরআই প্রকল্পের মাধ্যমে এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিশাল অঙ্কের ঋণ দিয়ে অবকাঠামো নির্মাণ করছে। এই প্রকল্পে চীনের অর্থায়নের মাধ্যমে যেসব দেশ উন্নয়নমূলক কাজ করছে, তারা পরবর্তীতে সেই ঋণ শোধ করতে না পেরে চীনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের অধীনে চলে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাপী এই কৌশলকে বলা হচ্ছে ‘ঋণ ফাঁদ কূটনীতি’।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যেই চীনের এই ঋণ ফাঁদের শিকার হয়েছে। শ্রীলঙ্কার উদাহরণ বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত। দেশটি চীনের কাছ থেকে বিশাল অঙ্কের ঋণ নিয়ে অবকাঠামো নির্মাণ করেছিল। কিন্তু ঋণ শোধ করতে না পারায় শ্রীলঙ্কাকে তার হাম্বানটোটা বন্দর চীনের কাছে ৯৯ বছরের জন্য ইজারা দিতে হয়েছে। ২০২৫ সালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক ঋণের প্রায় ২২ শতাংশই চীনের কাছে। এর ফলে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি মারাত্মক সংকটে পড়েছে এবং জনগণ তীব্র দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছে।

পাকিস্তানও একই ধরনের সংকটের মুখোমুখি। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) নামে একটি বৃহৎ প্রকল্পের মাধ্যমে পাকিস্তানে চীনের বিনিয়োগ বেড়েছে। তবে প্রকল্পগুলো থেকে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি না আসায় পাকিস্তান বর্তমানে চীনের কাছে ঋণের ভারে জর্জরিত। পাকিস্তানের বৈদেশিক ঋণের প্রায় ৩০ শতাংশ চীনের কাছ থেকে নেওয়া। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ১৩৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে চীনের ঋণের কারণে দেশটির অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে এবং মুদ্রাস্ফীতি রেকর্ড মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাংলাদেশের জন্যও এই অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। বর্তমানে চীন থেকে নেওয়া ঋণ বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের প্রায় ১৮ শতাংশ। যদিও এটি আপাতদৃষ্টিতে কম মনে হতে পারে, কিন্তু যদি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চীনের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অর্থনীতি বিপদের মুখে পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করে বলেছেন যে, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের মতো পরিস্থিতি এড়াতে হলে বাংলাদেশকে বহুপাক্ষিক ঋণ কৌশল গ্রহণ করতে হবে এবং কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমাতে হবে।

চীন কেবল ঋণের মাধ্যমে নয়, বরং বাংলাদেশের কৌশলগত অবকাঠামোতে সরাসরি বিনিয়োগ করে তার প্রভাব বাড়াচ্ছে। পদ্মা সেতু এবং কর্ণফুলী টানেলের মতো মেগা প্রকল্পগুলোতে চীনা অর্থায়ন ও প্রযুক্তি একটি বড় উদাহরণ। এসব প্রকল্প বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করলেও, বিশেষজ্ঞদের মতে, এর সঙ্গে ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকিও জড়িত। এই কারণে, বাংলাদেশের উচিত এসব বিনিয়োগ গ্রহণ করার সময় নিজেদের জাতীয় স্বার্থের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য সম্পর্ক একপাক্ষিক। বাংলাদেশ প্রতিবছর চীন থেকে প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে। অন্যদিকে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ মাত্র ১ বিলিয়ন ডলারেরও কম। ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য-ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার। এই বিপুল বাণিজ্য-ঘাটতি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে চাপে ফেলছে।

বাংলাদেশের রপ্তানির মূল বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র। দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের প্রায় ৭০ শতাংশ পণ্য ইউরোপ এবং আমেরিকার বাজারে যায়। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। এ কারণে বাংলাদেশের উচিত চীন বা অন্য কোনো দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে বহুমুখী বাণিজ্যনীতি অনুসরণ করা।

চীন বাংলাদেশের জন্য একটি বড় বাজার হতে পারে। দেশটি তাদের বাজারে বাংলাদেশের জন্য কিছু শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়েছে, যা রপ্তানি বৈচিত্র্যের জন্য একটি সুযোগ। তবে এই সুবিধাগুলো সম্পূর্ণরূপে কাজে লাগানোর জন্য বাংলাদেশকে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং পণ্যের মান উন্নত করতে হবে। একই সঙ্গে, ভারতকে পাশে রেখে ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে বিদ্যমান রপ্তানি সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করা বাংলাদেশের জন্য একটি স্মার্ট কৌশল।

বিশ্ব-রাজনীতিতে বর্তমানে অস্থিরতা বিরাজ করছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি ও খাদ্যের বাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে জ্বালানি আমদানির ব্যয় ২০২৫ সালে ১৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে খাদ্যের দামও ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক খেলায় বাংলাদেশ এক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আছে। একদিকে কোয়াড জোট (QUAD) এবং অন্যদিকে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)। এই দুই পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাংলাদেশের জন্য সুযোগ এবং ঝুঁকি উভয়ই নিয়ে আসে। এই পরিস্থিতিতে, বাংলাদেশকে নিজের সার্বভৌমত্ব ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে। কোনো জোটের পক্ষ না নিয়ে, বাংলাদেশ তার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করে চলবে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে তার বৈদেশিক নীতি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করতে হবে। ভারতের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক রক্ষা করা যেমন জরুরি, তেমনি চীনের সঙ্গে সম্পর্কও ভারসাম্যপূর্ণ রাখতে হবে। তবে চীনের ঋণ ফাঁদের ঝুঁকি এড়াতে বাংলাদেশকে সাবধানী নীতি গ্রহণ করতে হবে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তার কূটনৈতিক দক্ষতা এবং অর্থনৈতিক বিচক্ষণতার ওপর। ইতিহাসের শিক্ষা আমাদের বলে যে, কোনো দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা জাতীয় স্বার্থকে বিপন্ন করতে পারে। তাই বাংলাদেশকে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য ভারসাম্যপূর্ণ বৈদেশিক নীতি গ্রহণ করতে হবে এবং চীনের ঋণ ফাঁদ থেকে দূরে থাকতে হবে। রোহিঙ্গা সংকট, বাণিজ্য ঘাটতি এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একটি দৃঢ় ও টেকসই অর্থনীতি গঠন করা।

বাংলাদেশকে অবশ্যই একটি ভারসাম্যপূর্ণ বৈদেশিক ঋণ কৌশল গ্রহণ করতে হবে। কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমানো এবং বহুমুখী বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করা অপরিহার্য। এটি শুধু দেশের অর্থনীতিকে সুরক্ষিতই করবে না, বরং দ্রুত বর্ধনশীল ডিজিটাল অর্থনীতির টেকসই উন্নয়নেও সহায়ক হবে।

  • শিক্ষার্থী , আইন বিভাগ, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা