× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

চিকিৎসা বাণিজ্যের ফাঁদ

দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য আর নয়

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ০৪ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৪৯ এএম

দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য আর নয়

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রায় সকল সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও চিকিৎসা কেন্দ্রে সক্রিয় রয়েছে দালাল চক্রের এক ‘অঘোষিত নেটওয়ার্ক’। আমাদের স্বাস্থ্যসেবা খাতে এই মুহূর্তে যে আস্থার সংকট তার জন্য অনেকাংশেই দায়ী এই চক্রের দৌরাত্ম্য। এদের নেটওয়ার্ক এতটাই সক্রিয় যে, রোগী চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে এলেই এই চক্রের পাতা ফাঁদে পা দিতে হয়। রোগীরা জিম্মি হয়ে যায় তাদের কাছে। রোগী ও তার স্বজনদের আবেগ ও অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে দালালরা তাদেরকে নিদিষ্ট কিছু ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার বা ফার্মেসিতে যেতে বাধ্য করে। বিনিময়ে চক্রটি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে কমিশন পায়, আর রোগী ও তার স্বজনদের গুনতে হয় অতিরিক্ত খরচ। কখনও-বা হাসপাতালের ভেতরের চিকিৎসক ও সহকারীদের সঙ্গে এই চক্রের যোগসাজশের কথা শোনা যায়।

হাসপাতালগুলোর এই ধরনের চিত্র অনেক পুরনো। তবে, সম্প্রতি রাজধানীসহ দেশের জেলা-উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালে এই দালালদের বিস্তার ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এদের কারণে জরুরি বিভাগ থেকে শুরু করে বহির্বিভাগ পর্যন্ত রোগীরা সঠিক পরামর্শ থেকে বঞ্চিত হন। অনেক সময় রোগী সেবার সুযোগ পেলেও চক্রটি সরকারি হাসপাতালগুলোর সেবার প্রাপ্যতা গোপন করে, নানা কৌশলের ফাঁদে ফেলে রোগীদের বাইরে নিয়ে যায়। এতে রোগী অতিরিক্ত ব্যয় ভার কেবল বইতে হয় না, সঠিক চিকিৎসা থেকেও বঞ্চিত হতে হয়। দালাল চক্রটি দেশের স্বাস্থ্য খাতের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। এদের কারণেই সাধারণ মানুষ মনে করে, সরকারি হাসপাতালে প্রকৃত সেবা পাওয়া যায় না। তাই বাধ্য হয়ে  তারা অনেকে ব্যয়বহুল বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকমুখী হন, যা কার্যত কমিশননির্ভর ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।

অপ্রিয় হলেও সত্য যে, চিকিৎসা বাণিজ্যের এই অমানবিক চিত্র দেশের স্বাস্থ্য খাতকে ভঙ্গুর করে তুলছে। অসুস্থ মানুষ চিকিৎসা নিতে গিয়ে যখন সর্বস্ব হারায়, তখন সমাজে ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম হয়। এতে অসুস্থ জনগোষ্ঠী যেমন বাড়ছে, তেমনি রাষ্ট্রের সামাজিক অগ্রগতি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এমনিতেই স্বাস্থ্য খাত নিয়ে সাধারণ মানুষের অভিযোগের শেষ নেই। একদিকে সরকারি হাসপাতালের সীমিত সুযোগ-সুবিধা, অন্যদিকে বেসরকারি খাতে অতিরিক্ত ব্যয়Ñ এই দুইয়ের মাঝে যেন চিকিৎসা বাণিজ্যের এক অদৃশ্য কালো ছায়া ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। যে কারণে স্বাস্থ্যসেবা রাষ্ট্রের নাগরিক অধিকারের অন্যতম হলেও তা আজ লোভ ও লাভের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে, যা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে গভীর সংকটে ফেলছে। আমরা মনে করি, মানুষের এই মৌলিক অধিকারটি কোনোভাবেই দালালদের হাতে জিম্মি হয়ে থাকতে পারে না, হওয়া উচিত নয়। এ অবস্থায় সরকার তথা স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনকে দালাল চক্র দমনে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। হাসপাতালের ভেতরে এবং আশপাশে দালালদের প্রবেশ, বিচরণ ও তৎপরতা কঠোর হাতে দমন করতে হবে। একই সঙ্গে রোগীদের সেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। 

৩ অক্টোবর আমাদের প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘দালাল চক্রের খপ্পরে অসহায় রোগী’ শীর্ষক প্রতিবেদনে সরেজমিন অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এ সম্পর্কীয় অমানবিক সব তথ্য। তথ্যগুলোর সম্মিলিত উচ্চারণ আমাদের স্বাস্থ্যসেবা খাতের আস্থার সংকটের ভয়াবহ চিত্র। আমরা মনে করি, দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। এই ক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালগুলোর সেবার মান বাড়াতে হবে। ওষুধ, চিকিৎসক ও যন্ত্রপাতির ঘাটতি দূর করতে হবে। হাসপাতালের ভেতরে ও আশপাশে দালালদের প্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। হাসপাতালগুলোর সিসিটিভি ক্যামেরা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। চিকিৎসক ও কর্মচারীদের জবাবদিহিতা শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে। অনেক সময় ভেতরের কিছু অসাধু কর্মচারী দালালদের সহযোগিতা করে থাকে। তাদের শনাক্ত করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। চিকিৎসা সংশ্লিষ্টদের নৈতিকতা জাগ্রত করার জন্য পেশাগত শৃঙ্খলা জোরদার করতে হবে। সরকারি হাসপাতালগুলোর আশপাশে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অনুমোদন বন্ধ করতে হবে। ইতোমধ্যে যেগুলো অনুমোদন পেয়েছে সেগুলোর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে। দালালের মাধ্যমে রোগী নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে রোগী ও স্বজনদের সচেতন করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। তবেই রোগীরা স্বেচ্ছায় সরকারি সেবা গ্রহণে আগ্রহ বাড়বে, তারা আর দালালের ফাঁদে পা দেবে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসনিক পদক্ষেপ। দেখা যায় দালাল চক্র অনেক সময় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ছত্রছায়ায় থেকে কাজ করে। তাই এই চক্র ভাঙতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা অপরিহার্য।

আমরা মনে করি, চিকিৎসা খাতে দালালদের ফাঁদ জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়ংকর হুমকি বার্তা। এখনই স্বাস্থ্য খাতের এই দুষ্টচক্র ভাঙতে হবে। জনগণের জন্য সাশ্রয়ী, সহজলভ্য ও মানবিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্র ও সমাজের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত। চিকিৎসা একটি মানবিক সেবাÑ এটি কখনোই ব্যবসার পণ্য হতে পারে না। ব্যবসায় পরিণত হলে তা আর সেবা থাকে না, বরং তখন মানবতার বিরুদ্ধে অন্যায় হয়ে দাঁড়ায়। তাই জনগণের প্রতি দায়িত্বশীল হয়ে রাষ্ট্রকে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় সাধারণ মানুষের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। চিকিৎসা খাত যেহেতু মানুষের মৌলিক অধিকার ক্ষেত্র, এখানে দালালদের কোনো স্থান হতে পারে না। রাষ্ট্র, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও জনগণÑ সবাই দালালদের ফাঁদ তথা দৌরাত্ম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা