মাহজাবিন আলমগীর, শিক্ষিকা ও কলাম লেখক
প্রকাশ : ০৩ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৫৭ এএম
চলতি বছর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের সব শিক্ষার্থীর হাতে সময়মতো বই পৌঁছেনি। প্রায় তিন মাস পর শিক্ষার্থীদের হাতে বই ওঠে। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে শিক্ষা বিভাগ। শিক্ষার্থীদের লেখাপড়াও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই অভিজ্ঞতা থেকে এবারও বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে বই উঠবে কি না এ নিয়ে শঙ্কা রয়েই গেছে। তবে অভিভাবক-শিক্ষার্থীদের জন্য আশার কথা শুনিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা। তিনি গত ২১ সেপ্টেম্বর ক্রয়সংক্রান্ত এক সভায় বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে উত্থাপন করেছেন। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কোন প্রতিষ্ঠানকে বই ছাপানোর দায়িত্ব দেওয়া হবে সে বিষয়ে শিগগিরই সিদ্ধান্তের কথা তিনি জানিয়েছেন।
চলতি বছর শিক্ষার্থীদের হাতে বই দেরিতে আসার মূল কারণ ছিল দেরিতে বই ছাপতে দেওয়া। সে অভিজ্ঞতার সামনে এবার এখনই বই ছাপানোর অর্ডার দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও তিনি জানিয়েছেন। সেইসঙ্গে আগে যারা বই ছেপেছিল তাদের কাগজের মান, মুদ্রণ ত্রুটি এসব বিষয়ও গুরুত্ব সহকারে দেখার বিষয়েও জানিয়েছেন। খবরটি শিক্ষার্থী-শিক্ষক-অভিভাবকদের জন্য আশা জাগানিয়া। এতে করে বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে বই ওঠা নিয়ে যে অনিশ্চিয়তা তা কেটেছে।
দেখতে দেখতে ২০২৫ সালের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সময় পেরিয়েছে। আর কয়েক মাস পরেই শিক্ষার্থীরা নতুন একটি শিক্ষাবর্ষে পদার্পণ করবে। নতুন শিক্ষাবর্ষ মানেই নতুন পাঠ্যবই। নতুন শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থীদের মাঝে নতুন পাঠ্যপুস্তক নিয়ে এক প্রকার আগ্রহ তৈরি হয়। নতুন বই হাতে পেলে শিক্ষার্থীরা উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠে। চলতি বছরে পাঠ্যপুস্তকের সংকটে বই উৎসব থেকে বঞ্চিত হয়েছে শিক্ষার্থীরা। কোনো কোনো বিদ্যালয়ে মাধ্যমিকের বই পেতে মার্চ-এপ্রিল মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। এতে স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটেছে। দেরিতে বই হাতে পাওয়া মানে শিক্ষাবর্ষে পিছিয়ে পড়া। ফলে বই পাওয়ামাত্রই ছাত্রছাত্রীদের ওপর যেমন অত্যধিক পড়াশোনার চাপ তৈরি হয় তেমনি শিক্ষকদেরও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিলেবাস সম্পন্ন করানোর উৎকণ্ঠা ছিল। যার জের এখনও রয়েছে।
পাঠ্যপুস্তকের পরিবর্তন নিয়েও আমাদের ভাবার সময় এসেছে। শিক্ষার্থীদের কোনোভাবেই পরীক্ষার সামগ্রী করে তোলার সুযোগ নেই। তাই পাঠ্যপুস্তক এবং শিক্ষাব্যবস্থা এমন হওয়া প্রয়োজন, যা হবে যুগোপযোগী ও আধুনিক। একই সঙ্গে কর্মমুখী শিক্ষার বিষয়েও আমাদের নজর দেওয়া দরকার। এজন্য ঘন ঘন পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন না করে বরং বিশেষজ্ঞ কমিটি দ্বারা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষানীতি ও শিক্ষা কমিশন এ ক্ষেত্রে জরুরি। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ছাড়া, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া একান্ত জরুরি না হলে অপ্রয়োজনে পাঠ্যপুস্তকের পরিবর্তন কাঙ্ক্ষিত ফল বয়ে নাও আনতে পারে। যার মাশুল দিতে হতে পারে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের। এ ক্ষেত্রে সর্বাধিক খেসারত দিতে হয় ছাত্রছাত্রীদেরকে।
এজন্য বছরের শুরুতেই যেমন বই হাতে পাওয়া দরকার, তেমনি শিক্ষার্থীরা পরিপূর্ণরূপে পড়াশোনা শুরু করতে পারে, তাদেরও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রস্তুতি চলছে। নির্বাচনের ভোটকেন্দ্রগুলো সাধারণত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই হয়। ফলে নির্বাচনের সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি থাকে। তাই জানুয়ারিতে শিক্ষার্থীরা বই হাতে না পেলে স্বাভাবিক শিক্ষাকার্যক্রম শুরু হতে মার্চের শেষ কিংবা এপ্রিল হয়ে যাবে। কারণ, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পবিত্র রমজানের ছুটি শুরু হবে। নির্বাচন ও রমজানের ছুটির আগে শিক্ষাকার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে জানুয়ারিতে শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছানোর বিষয়ে সরকারকে এখনই গুরুত্ব দিতে হবে।
পাঠ্যপুস্তকের মুদ্রণ থেকে শুরু করে এর বিষয়বস্তু নিয়ে হেলাফেলা করার সুযোগ নেই। আমাদের মনে রাখতে হবে এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ। এজন্য বছরের শুরুতেই সকল শিক্ষার্থীর হাতে নতুন বই পৌঁছানো অতি আবশ্যিক। যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাক্রম স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারবে। নতুন বই পাওয়ার অনাবিল আনন্দে কোমল মুখগুলো খুশিতে ঝলমলিয়ে উঠুকÑ এটাই প্রত্যাশা।