পর্যটন নগরী
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৩ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৪২ এএম
বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের জন্য বাংলাদেশের গর্ব কক্সবাজার। এ সৈকত ঘিরেই পুরো শহরটিতে গড়ে উঠেছে পর্যটনশিল্প, হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান এবং অর্থনীতির একটা বড় অঞ্চল। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যÑ দূষণ, অপরিকল্পিত স্থাপনা এবং অব্যবস্থাপনার কারণে শহরটি যেন এক ‘ভাগাড়’ শহরে পরিণত হয়েছে। শহরটিতে স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) ছাড়াই চলছে শত শত হোটেল-মোটেল। প্রশাসনিক নজরদারি না থাকায় পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় (ইসিএ) আইনের প্রয়োগ নেই। পরিবেশবিদরা বলছেন, এই অবস্থা চলতে থাকলে অচিরেই সমুদ্রের পানির মান নষ্ট হবে এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়বে।
২ অক্টোবর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘সৈকত শহর যেন ভাগাড়’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শহরের গোলদিঘির পাড়, লালদিঘির পাড়, খুরুশকুল ব্রিজ এলাকা কিংবা বার্মিজ মার্কেটÑ যে পথেই যাওয়া হোক না কেন, চোখে পড়ে ময়লার স্তূপ। শত শত কোটি টাকায় খুরুশকুল সড়ক ও সেতু নির্মাণ করা হলেও সেতুর পাশের বিশাল আবর্জনার স্তূপ এখন নিত্যসঙ্গী। বৃষ্টির দিনে দুর্গন্ধ আরও অসহনীয় হয়ে ওঠে। বার্মিজ মার্কেট এলাকার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশেও জমে থাকে ময়লা। জানা গেছে, কক্সবাজারে পাঁচ শতাধিক হোটেল, মোটেল ও কটেজ আছে। কিন্তু হাতে-গোনা কয়েকটিতে রয়েছে এসটিপি। বাকি হোটেল-মোটেলের বর্জ্য সরাসরি নালা হয়ে চলে যাচ্ছে বাঁকখালী নদীতে। সেখান থেকে বঙ্গোপসাগরে। এখানকার নতুন ভবনগুলোতেও গড়ে ওঠেনি পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থা। পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, কক্সবাজারে তিন শতাধিক হোটেল-মোটেলকে এসটিপি স্থাপনের নোটিস দেওয়া হয়েছে। তবে স্থান অভাবে অনেক হোটেলে তা সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য জেলা প্রশাসন ও পৌরসভার সমন্বয়ে একটি সেন্ট্রাল এসটিপি নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু পৌরসভা বিলুপ্তির কারণে এ প্রকল্পে দেরি হচ্ছে। নানা সময়ে পর্যটনের সুযোগ-সুবিধা বাড়লেও পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রে চরম অবহেলা স্পষ্ট। সৈকতে পা রাখলেই চোখে পড়ে পলিথিন, প্লাস্টিক বোতল, খাবারের মোড়ক, নোংরা বর্জ্য আর দুর্গন্ধে ভরা স্তূপ। যা একদিকে প্রকৃতিকে ধ্বংস করছে, অন্যদিকে পর্যটকসহ স্থানীয়দের মনোবল ভেঙে দিচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, তদারকির কঠোরতা না থাকায় পরিছন্নকর্মীরা তাদের ইচ্ছামাফিক দায়িত্ব পালন করছেন।
জানা গেছে, ১৯৯৯ সালে সরকার কক্সবাজার সৈকতকে ‘পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ (ইসিএ) ঘোষণা করে। সেবার গেজেটে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়Ñ সৈকতের বালিয়াড়ি ও বেলাভূমিতে যেকোনো স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ। ২০১৭ সালে ‘বেলা’র এক রিটের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট জোয়ার-ভাটার লাইন থেকে ৩০০ মিটার এলাকা ‘নো ডেভেলপমেন্ট জোন’ ঘোষণা করে। কিন্তু সেই আদেশও বারবার উপেক্ষিত হয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরেও হাইকোর্টের রায় বাস্তবায়নের নোটিস দেওয়া হলে জেলা প্রশাসন লোকদেখানো উচ্ছেদ অভিযানে নামলেও কার্যত অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। এই ব্যাপারে কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি আ ন ম হেলাল উদ্দিন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেছেন, ‘প্রতিদিন গড়ে লাখো পর্যটক এখানে অবস্থান করেন। কিন্তু হোটেলে এসটিপি না থাকায় তাদের ব্যবহৃত বর্জ্য সরাসরি সমুদ্র বা নদীতে গিয়ে মিশছে। সব হোটেল-মোটেলে এসটিপি স্থাপন বাধ্যতামূলক করতে হবে। শহরের জন্য সেন্ট্রাল এসটিপি দ্রুত নির্মাণ, নিয়মিত ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করতে হবে। ইসিএ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন ও নতুন ভবন নির্মাণের আগে পরিবেশ ছাড়পত্র নিশ্চিত করতে হবে।’
আসলে পর্যটন নগরী হিসেবে কক্সবাজার হওয়া উচিত ছিল পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক নাগরিক সুবিধাসমৃদ্ধ শহর। কিন্তু অবহেলা আর দায়িত্বহীনতার কারণে আজ ‘ভাগাড়ের শহর’। এই দৃশ্য একদিকে যেমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট করছে, অন্যদিকে দেশের ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। যে পর্যটকরা আসেন আনন্দ নিতে, তাদের অনেকেই যেখানে-সেখানে আবর্জনা ফেলে যান। হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোও সঠিকভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করছে না। পৌরসভা বা প্রশাসনের তদারকির অভাব যেন সেই মাত্রা বাড়িয়ে তুলেছে। ফলে কক্সবাজার শহর ও সৈকতের বালি যেন ময়লার স্তূপে ঢেকে যাচ্ছে। এর ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে পরিবেশ ও মানুষের জীবনে। প্লাস্টিক ও পলিথিন সমুদ্রে ভেসে গিয়ে সামুদ্রিক প্রাণী হত্যা করছে। কচ্ছপ, মাছসহ বহু জীব ঝুঁকিতে পড়ছে। সৈকতের আবর্জনা থেকে মশা-মাছি ও দুর্গন্ধ ছড়িয়ে স্থানীয়দের স্বাস্থ্য হুমকির মুখে ফেলছে।
আমরা মনে করি, সংকটের সমাধান অবশ্যই সম্ভব। তবে তার জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। এই ক্ষেত্রে প্রতিটি হোটেল, রেস্তোরাঁ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব বর্জ্য অপসারণ ব্যবস্থা করতে হবে। পৌরসভা ও ট্যুরিস্ট পুলিশকে প্রতিদিন শহরের সংশ্লিষ্ট স্থানসমূহ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। পর্যটন স্পটগুলোতে পলিথিন ও প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করতে হবে। পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে, যাতে নিদিষ্ট স্থানে ‘নিজের ময়লা নিজে ফেলুন’ সংস্কৃতি চালু হয়। মনে রাখতে হবে, কক্সবাজার কেবল একটি শহর নয়, এটি দেশের পর্যটন শিল্পের প্রাণকেন্দ্র। বিশ্বের দীর্ঘতম সৈকতের সৌন্দর্য ধরে রাখতে হলে প্রশাসন, ব্যবসায়ী, স্থানীয় জনগণ এবং পর্যটকÑ সবারই দায়িত্বশীল ভূমিকা জরুরি। সৈকতের মর্যাদা রক্ষায় এখনই সবার সম্মিলিত উদ্যোগ জরুরি।
আসলে পর্যটন মানে কেবল বিনোদনই নয়, এটি দেশের অর্থনীতির জোগানের অংশীদারও। তাই কক্সবাজারের ঐতিহ্য ধরে রাখা মানে স্থানীয় মানুষের আয় বৃদ্ধি, নতুন কর্মসংস্থান এবং দেশের পর্যটন খাতে ইতিবাচক বার্তা। কক্সবাজার আমাদের প্রকৃতির দান, যা আমরা নষ্ট করে চলছি। তাই শুধু পর্যটনের স্বার্থে নয়; বরং আমাদের দায়িত্ববোধ রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে এই সৈকত শহরটিকে বাঁচানো জরুরি।