× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ডিগ্রি যখন মূল্যহীন

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব কি হারাবে দেশের শ্রমবাজার

ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব, সহকারী অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ও দাউদ ইব্রাহিম হাসান, রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ : ০২ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৫২ এএম

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব কি হারাবে দেশের শ্রমবাজার

সূর্য ডুবছে, লাঙলের ফলায় লেগে থাকা মাটি ধুলো হয়ে উড়ছে। গ্রামের কিষান রহমত আলীর চোখে এক অদ্ভুত বিষাদ। তার ছেলে, শহরে নতুন দিনের স্বপ্নের পেছনে ছুটেছিল, এখন ফিরে এসে দেখে তার ডিগ্রি আর কোনো কাজের নয়। কলকারখানায় নাকি এখন রোবট কাজ করে, আর কম্পিউটার নাকি মানুষের মগজের চেয়েও দ্রুত হিসাব কষে। এই ছবিটা শুধু রহমত আলীর একার নয়, এ যেন বাংলাদেশের হাজারো পরিবারের প্রতিচ্ছবি। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব আমাদের দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে, আর আমরা যদি সঠিক প্রস্তুতি না নেই, তবে এই বিপ্লবের জোয়ারে আমাদের মতো অনেক রহমত আলীর ছেলেমেয়ের স্বপ্ন ভেসে যাবে। প্রযুক্তির এই অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রা একদিকে যেমন অপার সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে, তেমনই অন্যদিকে এক গভীর সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দিচ্ছে। আমাদের পুরনো শ্রমবাজারের কাঠামো ভেঙে পড়ছে, আর নতুন পৃথিবীর জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতাগুলো এখনও আমাদের হাতের নাগালের বাইরে। এই সংকট শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি আমাদের সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও এক গভীর ছায়া ফেলছে, যেখানে পুরনো দক্ষতাগুলো মূল্যহীন হয়ে পড়ছে আর নতুন দক্ষতার অভাবে মানুষ বেকারত্বের এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি হচ্ছে।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মানে শুধু প্রযুক্তির জয়গান নয়, এটি ভবিষ্যতের শ্রমবাজারের এক নতুন নকশা। ভাবুন তো, আপনার পাশের বাড়ির ছেলেটা যে একসময় কম্পিউটার সারানোর দোকানে কাজ করত, সে এখন হয়তো ডেটা সায়েন্টিস্ট হয়ে জটিল অ্যালগরিদম নিয়ে কাজ করছে! ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্র কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবটিক্স, ডেটা সায়েন্স, ব্লকচেইন এবং অটোমেশনের মতো প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হবে। এই নতুন পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে আমাদের দক্ষতাকে ঢেলে সাজাতে হবে। শিল্প ও একাডেমির মধ্যে এক নিবিড় সেতুবন্ধ তৈরি করা গেলে শিক্ষার্থীরা সরাসরি শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা অর্জন করতে পারবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারগুলো আর শুধু তাত্ত্বিক আলোচনার কেন্দ্র না হয়ে শিল্পের ব্যবহারিক চাহিদা পূরণের গবেষণাক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে। একই সঙ্গে, ‘লাইফ লং লার্নিং প্লাটফর্ম’গুলো কর্মজীবীদের জন্য এক আশীর্বাদস্বরূপ। ধরুন, একজন পুরনো টেক্সটাইল শ্রমিক যিনি এতদিন হাতে কাজ করেছেন, তিনি এখন অনলাইনে নতুন প্রযুক্তির ওপর প্রশিক্ষণ নিয়ে রোবোটিক পোশাক কারখানার সুপারভাইজার হতে পারবেন। এগুলো কর্মজীবীদের জন্য নতুন দক্ষতা অর্জনের এবং পুরনো দক্ষতাকে আপগ্রেড করার সুযোগ তৈরি করবে, যা তাদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবে।

তবে এই উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পেছনে লুকিয়ে আছে এক অন্ধকার বিপদ। দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে বিশাল সংখ্যক মানুষ চাকরি হারাতে পারে। একসময় যে দক্ষতা ছিল অমূল্য, আজ তা অচল। পুরনো দক্ষতার এই অচলতা বেকারত্বের হারকে আকাশচুম্বী করতে পারে। আর এই বিপদ শুধু শহরের শিক্ষিত তরুণদের জন্য নয়, এটি গ্রামের সাধারণ কৃষক, ছোট কারখানার শ্রমিক, এমনকি আমাদের পুরনো শিক্ষাব্যবস্থাকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। এর ওপর দক্ষ প্রশিক্ষক এবং উন্নত প্রশিক্ষণ অবকাঠামোর অভাব বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। আমাদের কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখনও পুরনো দিনের যন্ত্রপাতিতে আটকে আছে, আর নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত প্রশিক্ষকের সংখ্যা খুবই নগণ্য।

এই ঘোর অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসার জন্য কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমেই, আমাদের জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতিমালায় ফোরআইআর প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। জাপানের মতো দেশগুলো যেভাবে তাদের কারিগরি শিক্ষাকে শিল্পের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত করেছে, আমরাও সেই পথে হাঁটতে পারি।  তাই সরকারি পর্যায়ে এমন নীতি প্রণয়ন করা উচিত, যা কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে শক্তিশালী করবে এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করবে। এ ছাড়া, সরকারি ও বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগে ‘আপস্কিলিং’ এবং ‘রিস্কিলিং’ প্রোগ্রাম চালু করা অত্যাবশ্যক। এটি শুধু নতুনদের জন্য নয়, যারা ইতোমধ্যেই কর্মক্ষেত্রে আছেন, তাদের জন্যও নতুন দক্ষতা অর্জনের সুযোগ করে দেবে।

যদি এই সংকট সমাধান না হয়, তবে এর ভবিষ্যৎ চিত্রটি এক বিভীষিকাময়। কল্পনা করুন, শহরের রাস্তায় হাজার হাজার বেকার যুবক-যুবতি ঘুরছে, তাদের হাতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের কোনো জ্ঞান নেই। তাদের বাবা-মায়েরা ধারদেনা করে যে শিক্ষায় তাদের শিক্ষিত করেছিলেন, সেই শিক্ষা এখন তাদের কর্মহীন করে রেখেছে। এটি শুধু ব্যক্তিগত জীবনকে প্রভাবিত করবে না, দেশের অর্থনীতিতেও এর গভীর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। উৎপাদনশীলতা কমে যাবে, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নেবে, আর সামাজিক অস্থিরতা বাড়বে। কৃষি, শিল্প, সেবা- প্রতিটি সেক্টরে এর প্রভাব পড়বে। কৃষকেরা হয়তো স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তির অভাবে পিছিয়ে পড়বে, পোশাক শ্রমিকেরা রোবোটিক কারখানার কাছে হেরে যাবে, আর ডাক্তাররা হয়তো এআই চালিত ডায়াগনস্টিক সিস্টেমের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে পিছিয়ে পড়বে। সমাজের প্রতিটি স্তরে এক গভীর ডিজিটাল বিভেদ তৈরি হবে, যেখানে প্রযুক্তির জ্ঞানীরা এগিয়ে যাবে আর জ্ঞানহীনরা পিছিয়ে পড়বে, যা সামাজিক বৈষম্যকে আরও বাড়াবে। এটি শুধু বেকারত্ব বাড়াবে না, এটি আমাদের সামাজিক স্থিতিশীলতাকেও হুমকির মুখে ফেলবে, যেখানে হতাশা আর বঞ্চনার এক নতুন সংস্কৃতি তৈরি হবে।

এই দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে যখন বাংলাদেশের সংস্কারের দায়িত্ব নিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূস, তখন আমাদের চোখে আশার আলো দেখা যাচ্ছে। তার প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলো এই সমস্যাগুলোর সমাধানে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। ড. ইউনূস বরাবরই সমাজের তৃণমূল থেকে পরিবর্তনের ওপর জোর দেন। তার গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণ মডেল যেমন সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি এনেছিল, তেমনই তিনি এখন দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বিপ্লবী পদক্ষেপের কথা ভাবছেন। উদাহরণস্বরূপ, তিনি হয়তো ‘সামাজিক ব্যবসা’ মডেলের আদলে এমন দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করবেন, যেখানে শুধু ডিগ্রির ওপর জোর না দিয়ে ব্যবহারিক দক্ষতার ওপর জোর দেওয়া হবে। এই কেন্দ্রগুলো স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দেবে এবং প্রশিক্ষিতদের কর্মসংস্থানের পথও দেখাবে। কল্পনা করুন, গ্রামীণ পর্যায়ে এমন ‘ইউনূস টেক হাব’ তৈরি হলো, যেখানে কৃষকেরা ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করে শস্য পর্যবেক্ষণ শিখছে, বা গ্রামের যুবকেরা থ্রিডি প্রিন্টিংয়ের মাধ্যমে ছোট ছোট জিনিসপত্র তৈরি করছে। তিনি হয়তো এমন একটি জাতীয় প্লাটফর্ম তৈরি করার কথা বলবেন যেখানে আন্তর্জাতিক মানের অনলাইন কোর্সগুলো স্থানীয় ভাষায় সহজলভ্য হবে এবং এর খরচও সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকবে। তার নেতৃত্বে, সরকার হয়তো বিশ্বব্যাংক বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে অংশীদারত্ব করে একটি বিশাল তহবিল গঠন করবে, যা দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করবে। এই ধরনের উদ্ভাবনী উদ্যোগগুলো শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে নয়, রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে এক নতুন বিপ্লব ঘটাতে পারে। তার নেতৃত্ব ও দূরদর্শিতা আমাদের এই চ্যালেঞ্জিং সময়ে সঠিক পথ দেখাতে পারে, যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই। ভবিষ্যতের দ্বার আমাদের সামনে খোলা, শুধু প্রয়োজন সাহসের সঙ্গে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া, আর নতুন দক্ষতার আলোয় নিজেকে আলোকিত করা।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা