জাতিসংঘে ড. ইউনূস
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৩:২৬ পিএম
বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ ফিরিয়ে দিতে সংশ্লিষ্ট দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ২৬ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনে প্রদত্ত ভাষণে তিনি বিশ্বনেতাদের কাছে এই আহ্বান জানান। ভাষণে তিনি উন্নয়নশীল দেশ থেকে অর্থ পাচার রোধে কঠোর আন্তর্জাতিক আইন প্রণয়নসহ সম্পদ পাচার রোধে আন্তর্জাতিক বিধিবিধান সংযোজন এবং এর যথাযথ প্রয়োগের দাবি জানান। যেসব দেশ ও প্রতিষ্ঠানÑ এ পাচারকৃত সম্পদ গচ্ছিত রাখার সুযোগ দিচ্ছে, তাদের এই অপরাধের শরিক না হওয়ার কথাও তিনি বলেছেন। উল্লেখ্য, গত ১৫ বছরে দুর্নীতির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হয়েছে। বর্তমান সরকার নিরলসভাবে এই সম্পদ ফেরত আনার চেষ্টা করছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আইনি প্রক্রিয়া এবং নানাবিধ প্রতিবন্ধকতার কারণে এই প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বিগত সরকারের আমলে দেশ থেকে নানাভাবে অর্থ পাচারের ঘটনা আজ বহুল আলোচিত। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই অন্তর্বর্তী সরকার পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনতে নানা উদ্যোগে অগ্রসর হচ্ছে। জাতিসংঘে প্রধান উপদেষ্টার ভাষণে প্রসঙ্গটি উত্থাপনও সেই উদ্যোগের অংশ। তবে স্বীকার করতে হবে, অর্থ পাচার নিয়ে অতীতে অনেক আলোচনা হলেও বাস্তবে পাচার রোধ কিংবা অর্থ ফেরত আনার বিষয়ে কার্যকর অগ্রগতি লক্ষ করা যায়নি। পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার ক্ষেত্রে পাচারকারীদের প্রতি কঠোর মনোভাব থাকাটাই বাঞ্ছনীয়। সেই মনোভাবের প্রতিফলন কেবল সভা-সমাবেশেই ছিল। বাস্তবে অর্থ পাচারকারী তো বটেই, পাশাপাশি এ অপকর্মের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা না হলে এ খাতে কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে কি নাÑ সন্দেহ থেকেই যায়।
তারপরও আমরা মনে করি, জাতিসংঘে প্রধান উপদেষ্টার এই সংক্রান্ত বক্তব্যে দেশের জনগণের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও প্রত্যাশা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তার দৃঢ় উচ্চারণ, ‘অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত দিতে হবে’Ñ এই আহ্বান নিছক কূটনৈতিক বক্তব্য নয় বরং দেশের অর্থনীতি, উন্নয়নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কারণ আমাদের দেশে প্রবাসী আয়ের পাশাপাশি রপ্তানি ও কৃষি খাত দেশের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখলেও, দুর্নীতি ও অর্থ পাচার জাতীয় উন্নয়নের বড় ধরনের অন্তরায়। প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হয়। এই অর্থ বিদেশি ব্যাংকগুলো অথবা করস্বর্গ খ্যাত দেশগুলোতে জমা পড়ে থাকেÑ দেশের মানুষের তা কাজে লাগে না। অথচ, যে টাকা দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন বা কর্মসংস্থানে ব্যবহার হওয়ার কথা, সেই টাকা গুটিকয়েক প্রভাবশালীর কারণে দেশ থেকে পাচার হয়ে যায়।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়টি ভাষণে বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে, যা অত্যন্ত সময়োপযোগী। কারণ অর্থ পাচারের বিষয়টি শুধু বাংলাদেশের একক সমস্যা নয়, এটি বৈশ্বিক সমস্যা। আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার বহু দেশ একই সংকটে ভুগছে। তাদেরও উন্নয়নÑ অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে উন্নত দেশের ব্যাংকে সুরক্ষিত থাকে। তাই আন্তর্জাতিকভাবে একযোগে চাপ সৃষ্টি না হলে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা কঠিন বৈকি। আমরা মনে করি, পাচার হওয়া টাকা যেসব দেশে জমা থাকে, সেসব দেশ যদি আন্তরিক না হয়, তবে এই অর্থ ফেরত আনা প্রায় অসম্ভব। আসলে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও বৈষম্য বাড়ছে; অথচ তাদের অর্থের একটি বিশাল অংশ উন্নত দেশের ব্যাংকগুলোতে নিরাপদ আশ্রয় পাচ্ছেÑ এ এক অমানবিক বৈপরীত্য।
আমরা মনে করি, জাতিসংঘের মঞ্চে এ বিষয়টি তুলে ধরা নিঃসন্দেহে একটি সাহসী পদক্ষেপ। কারণ এর মাধ্যমে শুধু বাংলাদেশ নয়, বরং অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের স্বার্থও উচ্চকিত হলো। শুধু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একযোগে চাপই সমাধান আনবে তা নয়, এই ক্ষেত্রে আমাদের নিজস্ব রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সুশাসন ও দুর্নীতি দমনে কঠোর পদক্ষেপ জরুরি। পাচারকারীদের রাজনৈতিক ও আর্থিক প্রভাব ভেঙে দিতে না পারলে অর্থ ফেরত আনা সত্যিই দুরূহ। পাশাপাশি দরকার অর্থ পাচার রোধে শক্তিশালী আইন প্রয়োগ, বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ এবং স্বাধীন আর্থিক নজরদারি।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও অভ্যন্তরীণ সংস্কারের সমন্বয়ে যদি পাচারের অর্থ ফেরত আনা যায়, তবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে। জনগণের রক্ত-ঘামে অর্জিত সম্পদ দেশে ফিরিয়ে এনে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও কর্মসংস্থানে বিনিয়োগ করাই হবে জাতির প্রতি প্রকৃত দায়মুক্তি। দেশের মানুষের প্রত্যাশা একটাই- বিদেশে পাচার হওয়া প্রতিটি টাকা দেশে ফিরুক, দেশের উন্নয়নে লাগুক। জাতিসংঘে প্রধান উপদেষ্টার কণ্ঠে তাই উচ্চারিত হলো- পাচারের টাকা ফেরত দিন। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের তৎপর হওয়া জরুরি। পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার ক্ষেত্রে অনুসন্ধান ও তদন্তে দিতে হবে অধিক গুরুত্ব। অর্থ পাচার নিয়ন্ত্রণ ও পাচারকৃত অর্থ দেশে ফেরত আনতে সরকার আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেবেÑ এটাই প্রত্যাশা।