প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ
একেএম আহসান হাবীব
প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ০৯:৫৯ এএম
গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হলো নির্বাচন। একটি কার্যকর নির্বাচন ব্যবস্থা কেবল জনপ্রতিনিধি নির্বাচনেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা জনগণের মতামতের যথাযথ প্রতিফলন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তাও বহন করে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন (পিআর) বা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বভিত্তিক নির্বাচন পদ্ধতি চালুর প্রস্তাব উঠেছে। যদিও এটি অনেক দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, দলীয় দ্বন্দ্ব ও সামাজিক বাস্তবতায় এই পদ্ধতি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। বরং এর ফলে অস্থিরতা, দলীয় ভাঙন ও বিদেশি প্রভাব বাড়তে পারে।
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রচলিত ফাস্ট পাস্ট দ্যা পোস্ট (এফপিটিপি) পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট এলাকার জনগণ সরাসরি তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে। এতে জনগণ ও এমপির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও জবাবদিহিতা তৈরি হয়। অন্যদিকে পিআর ব্যবস্থায় জনগণের ভোট দলকে দেওয়া হয়, ব্যক্তি প্রার্থীকে নয়। ফলে এমপির দায়বদ্ধতা জনগণের প্রতি নয়, বরং কেবল দলের প্রতি সীমাবদ্ধ থাকে। এতে জনগণের প্রত্যাশা ও দাবি অনেকাংশে উপেক্ষিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন ব্যবস্থায় কোনো একক দল সাধারণত সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় না। ফলে জোট সরকার বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে রাজনৈতিক অবিশ্বাস, প্রতিহিংসা ও দলীয় দ্বন্দ্ব তীব্র, সেখানে বারবার জোট ভাঙবে, সরকার পরিবর্তিত হবে এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হবে। এতে জাতীয় ঐক্য দুর্বল হয়ে ‘আঞ্চলিকতাবাদ রাজনীতির পুনরুত্থান’ হতে পারে।
২০০৮ সালে নেপাল পিআর ব্যবস্থা চালু করার পর গত ১৭ বছরে ১২ বার সরকার পরিবর্তিত হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে নেপাল আজ প্রায় সম্পূর্ণভাবে ভারতের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের জন্য এই অভিজ্ঞতা বড় সতর্কবার্তা। এই ব্যবস্থায় সংসদ সদস্য নির্ধারণ হয় দলীয় তালিকার মাধ্যমে। ফলে কে সংসদে যাবেন, তা পুরোপুরি দলনেতৃত্বের সিদ্ধান্ত। এতে যোগ্যতা বা জনপ্রিয়তার বদলে দলীয় আনুগত্য, অর্থনৈতিক সক্ষমতা বা ক্ষমতার লবিং বেশি প্রাধান্য পায়। এভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত বা অপরাধী চক্র সহজেই সংসদে প্রবেশ করতে পারে। এর ফলে সংসদব্যবস্থা ও গণতন্ত্রের পবিত্রতা ক্ষুণ্ন হয়।
পিআর ব্যবস্থায় অনেক ছোট ছোট দল সংসদে প্রবেশ করে। এতে বৈচিত্র্য বাড়লেও একটি শক্তিশালী, সুসংগঠিত বিরোধী দল গড়ে ওঠে না। দুর্বল, খণ্ডিত বিরোধী দল সরকারকে কার্যকরভাবে চ্যালেঞ্জ করতে পারে না। বাংলাদেশের মতো দেশে এটি ক্ষমতাসীনদের স্বেচ্ছাচারিতা ঠেকাতে ব্যর্থ হবে।
বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই রাজনৈতিক মেরুকরণ চরম আকারে বিদ্যমান। পিআর চালু হলে এই মেরুকরণ আরও বাড়বে, কারণ সংসদে বহু ছোট দল নানা ইস্যুতে বিভাজন তৈরি করবে। এতে আইন প্রণয়ন, বাজেট পাস কিংবা গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সিদ্ধান্তে বারবার অচলাবস্থা সৃষ্টি হবে। জনগণের আস্থা ভেঙে পড়বে এবং রাজপথে সংঘর্ষ ও সহিংসতা বাড়তে পারে।
পিআর ব্যবস্থায় সরকার হয় বহুদলীয় জোটের ওপর নির্ভরশীল। ফলে প্রতিটি নীতি নির্ধারণে বহু পক্ষের সমঝোতা জরুরি হয়ে পড়ে। অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা পররাষ্ট্রনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ধীরগতি ও জটিল হয়ে পড়ে। এতে দীর্ঘসূত্রতা, অকার্যকারিতা ও উন্নয়ন স্থবির হয়ে যায়।
ইতালি দিকে লক্ষ্য করলে দেখবেন পিআর-এর কারণে যুদ্ধোত্তর ইতালিতে একের পর এক সরকার ভেঙেছে ১৯৪৫ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে ৫০টিরও বেশি সরকার পরিবর্তিত হয়েছে। ইসরায়েলেও পিআর পদ্ধতিতে ছোট ছোট দল সংসদে ঢুকে ‘কিংমেকার’ হয়ে যায়। ফলে সরকার গঠনে আপসের রাজনীতি ও জটিলতা বেড়েছে, স্থিতিশীলতা কমেছে।
যেখানে জনগণ সরাসরি প্রার্থীকে ভোট দেয় না, সেখানে তাদের মতামতের প্রতিফলন দুর্বল হয়। একজন এমপি জানেন তার টিকিট নির্ভর করছে দলের হাতে, জনগণের হাতে নয়। এই ধারণা জনগণকে নির্বাচন ও রাজনীতির প্রতি উদাসীন করে তুলতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি দুর্বল করবে।
বাংলাদেশের প্রশাসন রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত। পিআর চালু হলে দুর্বল সরকার প্রশাসনের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারবে না। এতে আমলাতান্ত্রিক স্বেচ্ছাচারিতা বাড়তে পারে। প্রশাসন যখন ‘শক্তিশালী সরকারের নির্দেশনা’ পাবে না, তখন অচলাবস্থা তৈরি হবে।
বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। এখানে যদি নেপালের মতো দুর্বল, অস্থিতিশীল ও জোটনির্ভর সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে আঞ্চলিক শক্তিগুলো বিশেষত ভারত ও অন্যান্য প্রভাবশালী দেশ সহজেই নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে। এতে জাতীয় নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রবল।
প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন ব্যবস্থা তাত্ত্বিকভাবে গণতন্ত্রে বৈচিত্র্য আনার সুযোগ সৃষ্টি করলেও, বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সাংবিধানিক কাঠামো ও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি ভয়াবহ অস্থিতিশীলতা ডেকে আনতে পারে। নেপাল, ইতালি, ইসরায়েল সবখানেই দেখা গেছে, পিআর পদ্ধতি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দুর্বল করে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো জনপ্রতিনিধিত্ব, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জবাবদিহিতা রক্ষা করা। তাই প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন পদ্ধতি গ্রহণের আগে আমাদের ইতিহাস, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও জাতীয় স্বার্থকে সর্বাগ্রে বিবেচনা করা উচিত। তাই পিআর চালু করলে সংকট সমাধান হবে না, বরং নতুন সংকট জন্ম নেবে।