কৃষি অর্থনীতি
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:৪৩ এএম
দেশের ‘কৃষি অর্থনীতি’তে আলু অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফসল। ধান এবং গমের পরে মূলত আলুই হলো সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত খাদ্যপণ্য। প্রতিবছর মৌসুমে কৃষকের ঘরে যখন নতুন আলু ওঠে, তখন তারা আশায় বুক বাঁধেনÑ ভালো দামে ফলন বিক্রি করতে পারবেন। কিন্তু মাঝেমধ্যেই বিধি বাম হন। উৎপাদন বাড়লেও সঠিক বিপণন ও বাজার ব্যবস্থাপনার অভাবে কৃষক ফলনের ন্যায্য দাম পান না। এবারও সেই একই দৃশ্য। দেশের হিমাগারগুলোয় বোঝাই হয়ে আছে লাখ লাখ টন আলু, কিন্তু ক্রেতা নেই। ক্রেতার অভাবে বিক্রি হচ্ছে না। ফলে উৎপাদন খরচও উঠছে না। কৃষকরা লোকসানের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছেন।
১৮ সেপ্টেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, দেশে আলুর ফলন বাড়িয়ে কৃষক এখন বিপাকে পড়েছেন। কৃষকের উৎপাদন খরচ কেজিতে গড়ে ১৭ টাকা হলেও বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৫ থেকে ২০ টাকায়। সম্প্রতি সরকার কেজিপ্রতি ২২ টাকা দাম নির্ধারণ করলেও এখনও কার্যকর করা যায়নি। ফলে উৎপাদকরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আগের দুই বছরের চড়া দাম দেখে কৃষকরা এবার বেশি আলু আবাদ করেছেন। কিন্তু অতিরিক্ত উৎপাদনের ফলে আলুর দাম এখন পড়ে গেছে। হিমাগার বোঝাই আলু, কিন্তু ক্রেতা মিলছে না। এতে ক্ষুদ্র থেকে বড় ব্যবসায়ী যারা মজুদ রেখেছেন, তারা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছেন। উল্লেখ্য, ফলন বেশি হওয়ার কারণে শুরুর দিকে হিমাগারগুলোতে জায়গা সংকুলান না হওয়ায় অনেক কৃষকের আলু এক মাসেরও বেশি সময় খোলা আকাশের নিচে পড়েছিল। যার প্রভাবে আলুর পচনও ধরেছিল।
আসলে আমাদের দেশে ফসল সংরক্ষণ ও বিপণনের যে ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে সেটিকে কোনভাবেই পরিপূর্ণ, আধুনিক ও টেকসই বলা চলে যাবে না। এবার মূল্য কমে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধানে, এই বিষয়টিই উঠে আসে। কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, এ বছর দেশে প্রায় এক কোটি টনের বেশি আলু উৎপাদিত হয়েছে, যেখানে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মাত্র ৭০ থেকে ৭৫ লাখ টন। সেই হিসেবে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ টন আলু উদ্বৃত্ত থেকে যাচ্ছে। রয়েছে রপ্তানিতে দুর্বলতা। জানা গেছে, প্রতিবেশী দেশ ভারতে আলু উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের আলু সেখানে বিক্রি হচ্ছে না। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারেও নানা শর্ত ও মান নিয়ন্ত্রণে আমরা পিছিয়ে আছি। রয়েছে সরকারের কার্যকর সংরক্ষণ ও বাজার হস্তক্ষেপ না থাকার বিষয়টিও। যা অতীতে এতটা প্রকট ছিল না। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের কার্যক্রম চলমান থাকার কথা বলা হলেও বাস্তবে কৃষক সেই সেবা পাচ্ছেন না। মৌসুমে আলুর দাম যখন কেজিতে ১০-১২ টাকা ছিল, তখন চাষিরা ভেবেছিলেন হিমাগারে রেখে পরবর্তীতে ভালো দামে বিক্রি করতে পারবেন। কিন্তু এখনও তা কেজিপ্রতি ১৭-১৮ টাকার বেশি ছাড়াচ্ছে না, যেখানে উৎপাদন খরচ পড়েছে ১৮-২০ টাকা। হিসাব স্পষ্ট, চাষিরা প্রতি কেজিতে ৩-৫ টাকা লোকসান গুনছেন। অভিযোগ রয়েছে, এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে একশ্রেণির অসৎ ব্যবসায়ী ও হিমাগার মালিক সস্তায় আলু কিনে মুনাফা করছেন। এখানেও লাভবান হচ্ছেন মধ্যস্বত্বভোগীরা, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষক।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, এ বছর আলুর ব্যাপক ফলন দেখে হিমাগার মালিকদের বাড়তি ভাড়া আদায়ের বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল প্রতিদিনের বাংলাদেশসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম। চাষি এবং সংশ্লিষ্ট মহলের প্রতিবাদে জেলা প্রশাসকদের হস্তক্ষেপে হিমাগারের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ভাড়া নিয়ে আন্দোলন করায় চাষিদের সঙ্গে হিমাগার মালিকদের সঙ্গে মৃদু সম্পর্কের দূরত্ব দৃশ্যমান। পরিস্থিতি উত্তরণের জন্য জরুরি কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত বলে আমরা মনে করি। প্রথমত, সরকারকে আলুর ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ করে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ক্রয় করতে হবে। যেমনÑ ধান বা গম সরকারি গুদামে তোলা হয়, তেমনি আলুও ক্রয় করে সরকারি ব্যবস্থায় সংরক্ষণে রাখা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, রপ্তানিনীতিতে সুবিধা দিতে হবে। রপ্তানিকারকদের ভর্তুকি, পরিবহন ও কোল্ড চেইন উন্নত করতে হবে। আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে আলু প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্যাকেজিং শিল্প গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয়ত, অভ্যন্তরীণ ভোক্তা চাহিদা বাড়াতে আলু দিয়ে বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। এতে শিল্প খাত যেমন সমৃদ্ধ হবে, তেমনি কৃষকও দাম পাবেন।
আমরা মনে করি, কৃষককে বাঁচাতে হলে শুধু উৎপাদন বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, তার ফসলের সঠিক দাম নিশ্চিত করাও জরুরি। আলুর বাজারে এখনকার অবস্থা যদি চলতে থাকে, তাহলে আগামীতে কৃষকরা আলু চাষে নিরুৎসাহিত হবেন। ফলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়তে পারে। তাই এখনই সময়Ñ কৃষকের পাশে দাঁড়ানো এবং কার্যকর বিপণন ব্যবস্থার মাধ্যমে আলুর সঠিক মূল্য নিশ্চিত করা। এতে কৃষকের জন্য আলু সমস্যার বদলে সম্ভাবনায় পরিণত হবে।