× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

চিকিৎসায় এআই

হাতের মুঠোয় ডাক্তার

ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব ও দাউদ ইব্রাহিম হাসান

প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:৩৭ এএম

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:২১ পিএম

হাতের মুঠোয় ডাক্তার

সন্ধ্যার নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে ধুলোমাখা বাংলাদেশের এক ছোট্ট গ্রামে। শেফালী বেগম, তার ছেলের জ্বরের তাপ মাপতে গিয়ে দেখছেন পারদ প্রায় ১০০ ছুঁইছুঁই। শহরের হাসপাতালে যেতে প্রায় সারা দিন লেগে যায়, আর মাঝেমধ্যে ডাক্তারও পাওয়া যায় না। এমন এক সময়ে যদি হাতের মুঠোয় ফোনটাতেই ডাক্তারের পরামর্শ মেলে যেত, কেমন হতো? এই স্বপ্নই আজ বাস্তবতার দুয়ারে কড়া নাড়ছে, আর এর নাম ডিজিটাল ও এআই-নির্ভর স্বাস্থ্যসেবা। এই নতুন দিগন্ত বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের চিত্র পাল্টে দিতে পারে, যেখানে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষটিও পাবে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ। কিন্তু এই সম্ভাবনার সঙ্গে মিশে আছে চ্যালেঞ্জের ঘনঘটা।

ভবিষ্যতের দিকে তাকালে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার এক নতুন রূপ চোখে পড়ে। ২০৩৫ সাল নাগাদ আমরা হয়তো দেখব, একজন কৃষক তার বাড়ির উঠোনে বসেই একটি পোর্টেবল ডায়াগনস্টিক ডিভাইসের মাধ্যমে নিজের রক্তচাপ মাপছেন এবং এআই-ভিত্তিক রোগ নির্ণয় প্রযুক্তি তার প্রাথমিক স্বাস্থ্য বিশ্লেষণ করে দিচ্ছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখন যেখানে ডাক্তারের দেখা মেলা ভার, সেখানে এই প্রযুক্তিগুলো হয়ে উঠবে স্বাস্থ্যসেবার নতুন ঠিকানা। ঢাকার কোনো নামকরা হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হয়তো গ্রামের একজন রোগীকে টেলিকমিউনিকেশন (টেলিমেডিসিন) এবং ভার্চুয়াল কনসালটেশন-এর মাধ্যমে পরামর্শ দিচ্ছেন, যেখানে রোগীর আগের সব রিপোর্ট সেন্ট্রাল হেলথ রেকর্ড-এ সংরক্ষিত আছে এবং ই-প্রেসক্রিপশন-এর মাধ্যমে ওষুধ লিখে দেওয়া হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন রোগীর সময় বাঁচবে, তেমনই কমবে খরচ। স্বাস্থ্যসেবা হয়ে উঠবে আরও সুলভ, নির্ভুল এবং প্রযুক্তি-নির্ভর।

তবে এই সোনালি ভবিষ্যতের আড়ালে লুকিয়ে আছে কিছু অন্ধকার ছায়া। ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার সবচেয়ে বড় বিপদ হলো ডেটা সুরক্ষা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ঝুঁকি। রোগীর সংবেদনশীল তথ্য যদি ভুল হাতে পড়ে, তাহলে তা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাব একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অধিকাংশ স্বাস্থ্যকর্মীর ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারে পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই, যা এই সেবা প্রসারে বাধা সৃষ্টি করবে। তাছাড়া, দেশের সব মানুষের কাছে এখনও ইন্টারনেটের অপ্রাপ্যতা একটি প্রকট সমস্যা। গ্রামের গরিব মানুষ হয়তো স্মার্টফোন কেনার সামর্থ্য রাখে না বা ইন্টারনেট সংযোগও পায় না। ফলে সৃষ্টি হতে পারে এক ডিজিটাল বিভাজন। এই বিভাজন প্রান্তিক মানুষকে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত করবে। আরেকটি গুরুতর হুমকি হলো সাইবার হামলা। যদি স্বাস্থ্য ডেটাবেস সাইবার হামলার শিকার হয়, তবে কোটি কোটি মানুষের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য তথ্য ফাঁস হয়ে যেতে পারে, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও হুমকিস্বরূপ।

এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। সবার আগে প্রয়োজন একটি জাতীয় ডিজিটাল স্বাস্থ্য নীতিমালা প্রণয়ন এবং কঠোর ডেটা সুরক্ষা আইন প্রয়োগ করা। এই আইনগুলো রোগীর তথ্যের গোপনীয়তা নিশ্চিত করবে এবং সাইবার হামলা প্রতিরোধে সহায়তা করবে। পাশাপাশি, সকল স্বাস্থ্যকর্মীর ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা প্রশিক্ষণের আওতায় আনা অপরিহার্য। তাদের মধ্যে ডিজিটাল দক্ষতা তৈরি হলে তারা সহজেই নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট সংযোগ এবং ডিজিটাল ডিভাইসের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা। সরকার যদি ভর্তুকি মূল্যে ডিজিটাল ডিভাইস সরবরাহ করে এবং গ্রামে ইন্টারনেট অবকাঠামো সম্প্রসারণ করে, তাহলে ডিজিটাল বিভাজন অনেকটাই কমে আসবে।

যদি এই সমস্যাগুলো সমাধান না হয়, তবে ভবিষ্যতের চিত্রটা হবে আরও ভয়াবহ। ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে প্রান্তিক মানুষ আরও বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়বে। ধনী-গরিবের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবায় বিদ্যমান বৈষম্য আরও বাড়বে, যা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। শহরমুখী রোগীর চাপ বাড়তে থাকবে, হাসপাতালগুলো আরও বেশি ভিড়ে সয়লাব হবে এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট তীব্রতর হবে। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল মানুষ চিকিৎসা খরচ মেটাতে হিমশিম খাবে, যা তাদের দারিদ্র্যচক্রকে আরও দীর্ঘায়িত করবে। গ্রামের একজন দিনমজুর, যে কি না সামান্য জ্বরের জন্য ডাক্তারের কাছে যেতে পারল না, তার অসুস্থতা হয়তো ধীরে ধীরে গুরুতর আকার ধারণ করবে এবং একসময় তা তার কর্মক্ষমতা কেড়ে নেবে। অন্যদিকে, একজন শহুরে মানুষ অনায়াসেই প্রযুক্তির সাহায্যে উন্নত চিকিৎসা পাবে। এই অসমতা বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং একটি অসুস্থ ও অকর্মক্ষম প্রজন্ম তৈরি করবে, যা দেশের উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেবে। শিক্ষা, কৃষি, শিল্পÑ সবকিছুতেই এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। কারণ সুস্থ জনশক্তি ছাড়া কোনো দেশই উন্নতি লাভ করতে পারে না।

এই দুর্বিষহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কার্যক্রম এক নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। তিনি তার গ্রামীণ ব্যাংকের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে গ্রামীণফোনের মাধ্যমে গ্রামে গ্রামে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানোর মডেল নিয়ে কাজ করছেন। তার প্রস্তাবিত পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে, প্রতিটি গ্রামে কমিউনিটি হেলথ ক্লিনিকগুলোকে ডিজিটাল হাব হিসেবে গড়ে তোলা, যেখানে সাধারণ মানুষ সহজেই ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা পাবে। তিনি স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য ব্যাপকভিত্তিক ডিজিটাল সাক্ষরতা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিয়েছেন, যাতে তারা নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ হয়ে ওঠেন। ড. ইউনূস মনে করেন, সমাজের দরিদ্রতম মানুষের হাতে ডিজিটাল ডিভাইস এবং ইন্টারনেট সহজলভ্য করে তোলা গেলেই প্রকৃত ডিজিটাল স্বাস্থ্য বিপ্লব সম্ভব। তিনি হয়তো স্থানীয় উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পের আওতায় সস্তা স্মার্টফোন এবং ইন্টারনেট প্যাকেজ সরবরাহের উদ্যোগ নেবেন, যাতে গ্রামের মানুষ খুব সহজে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। তার এই ধরনের উদ্যোগ দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবাকে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসবে এবং একটি সুস্থ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে সাহায্য করবে। একটি সুচিন্তিত জাতীয় ডিজিটাল স্বাস্থ্য নীতিমালা, কঠোর ডেটা সুরক্ষা আইন, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমরা এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারি। আসুন, আমরা সম্মিলিতভাবে বিশ্বাস করি যে, ‘প্রযুক্তির আলোয় স্বাস্থ্যসেবার প্রতিটি কোণ আলোকিত হবে, যেখানে প্রতিটি জীবন তার প্রাপ্য অধিকার পাবে, আর সুস্থতার পথচলায় পিছিয়ে থাকবে না কেউ!’

  • সহকারী অধ্যাপক ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
  • রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা