পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১০:০৩ এএম
বিদ্যুৎ আধুনিক সমাজব্যবস্থায় অন্যতম অপরিহার্য উপকরণ। কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী ও গৃহস্থালির প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীলতা ক্রমেই বাড়ছে। আধুনিক মৌলিক অবকাঠামোয় গ্রামাঞ্চলেও বিদ্যুতের গুরুত্ব ব্যাপক। কারণ গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ কেবল আলো-ঝলমল জীবনের প্রতীকই নয়, এটি উৎপাদনশীল অর্থনীতির চালিকাশক্তিও। আর গ্রামে বিদ্যুতের এই চাহিদা এককভাবে পূরণ করে থাকে পল্লী বিদ্যুৎ। সম্প্রতি পল্লী বিদ্যুৎ কর্মীদের কর্মবিরতির কারণে সৃষ্ট সীমাহীন দুর্ভোগ গ্রাহকদের অবর্ণনীয় সংকটে ফেলেছে, যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।
৮ সেপ্টেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘টানা কর্মবিরতিতে গ্রাহকদের দুর্ভোগ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে জানা যায়, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির (পবিস) একীভূতকরণসহ চার দফা দাবিতে দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির প্রায় ৪৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী অনির্দিষ্টকালের জন্য গণছুটি কর্মসূচি পালন করছে। ৭ সেপ্টেম্বর রবিবার সকাল থেকে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে সারা দেশে এ কর্মবিরতি শুরু হয়। এতে দপ্তরগুলোতে বিলসহ নানা ধরনের সেবা নিতে আসা গ্রাহকরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। উল্লেখ্য, শনিবার ঢাকায় সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচি ঘোষণা করে পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশন। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি, একাধিকবার কমিটি গঠনসহ সংকট সমাধানে সরকারের পক্ষ থেকে নানামুখী আশ্বাসের পরও বাস্তবায়ন করেনি বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়। উপরন্তু দাবি আদায় আন্দোলনকারীদের চাকরিচ্যুতি, বদলিসহ শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। এতে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে সংস্থাটিতে। চাকরিচ্যুত ও বরখাস্ত করা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বরখাস্ত আদেশ বাতিল এবং পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানান তারা। এদিকে গণছুটির নামে অনুপস্থিত কর্মকর্তা/কর্মচারীদের আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে স্ব-স্ব কর্মস্থলে যোগদানের জন্য নির্দেশ দিয়েছে বিদ্যুৎ ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ কথা সত্য যে, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ দেশবাসীর জন্য অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবা। এই সেবা প্রদানে বাধাদান বা বিঘ্ন ঘটানো আইনত শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু এটাও বাস্তবতা যে, বিদ্যুৎ কর্মীদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও অবহেলা কিংবা ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার কারণে যদি এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তাহলে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরও কিছুটা দায় থেকে যায়।
আমরা মনে করি, পল্লী বিদ্যুতে কর্মরতদের ন্যায্য দাবি থাকতেই পারে। কর্মপরিবেশ, বেতন-ভাতা বা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিয়ে অসন্তোষ থাকলে তারা শান্তিপূর্ণ উপায়ে দাবি জানানোর অধিকারও রাখেন। তা সমাধানের দায়িত্ব অবশ্যই কর্তৃপক্ষের। কিন্তু দাবি আদায়ের কৌশল হিসেবে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত করা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। এতে লাখো সাধারণ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত করে তোলে। জরুরি পরিষেবা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একইভাবে বলব, অবহেলা বা দীর্ঘসূত্রতা ন্যায্য দাবিকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া সমস্যার স্থায়ী সমাধানে অন্তরায়ই শুধু নয়, ন্যায্যতাকে অস্বীকার করার শামিল। অতীতেও দেখা গেছে, কোনো ন্যায্য দাবি-দাওয়ার প্রতি কর্তৃপক্ষীয় উদাসীনতা এমন পরিস্থিতিকে অবশ্যম্ভাবী করে তোলে।
আমরা আরও মনে করি, এক্ষেত্রে কর্মীদের দায়িত্ব হচ্ছে শান্তিপূর্ণ উপায়ে দাবি আদায় করা, অন্যদিকে সরকারের দায়িত্ব হলো দ্রুত সমস্যার সমাধানে উদ্যোগী হওয়া। কারণ গ্রাহকদের যে কষ্ট হচ্ছে, তার দায় এড়িয়ে যাওয়ার কারও সুযোগ নেই। এর দ্রুত সমাধান জরুরি। আলোচনার টেবিলে বসে সরকার এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যে সমঝোতার পথ খুঁজে বের করা উচিত। মনে রাখা দরকার, বিদ্যুৎ কেবল একটি সেবা নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার এবং জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম প্রধান শর্ত। তাই কর্মবিরতি নয়, আলোচনাই হওয়া উচিত সমস্যার সমাধানের পথ। সমন্বিত আলোচনার মাধ্যমেই এ অচলাবস্থার অবসান ঘটাতে হবে।
এটা মানতেই হবে, বিদ্যুৎ আমাদের জাতীয় অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশেষ করে গ্রামীণ জীবনে বিদ্যুতের গুরুত্ব অপরিসীম। এ অবস্থায় পল্লী বিদ্যুতের সেবা ও অবকাঠামোকে আরও আধুনিকায়ন করা সময়ের দাবি। দুঃখজনক হলেও সত্য, এখনও দেশের বহু গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহে বৈষম্য দৃশ্যমান। বিদ্যুতের ব্যাপক সক্ষমতার কথা বলা হলেও বহু স্থানে লোডশেডিং নিত্যদিনের ঘটনা। পুরনো লাইন, অপর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি, জনবল সংকট এবং ডিজিটাল মনিটরিংয়ের অভাবে প্রায়ই গ্রাহকদের দুর্ভোগের কথা শোনা যায়। এখন দাবি আদায়ের আন্দোলন দুর্ভোগকে আরও বাড়িয়ে দেবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
তাই আলোচনার মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের ন্যায্য দাবি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাততে আরও গণমুখী করা দরকার। এক্ষেত্রে বিদ্যুৎ কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও কল্যাণ নিশ্চিত করা জরুরি। আধুনিক যন্ত্রপাতি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দক্ষ জনবল তৈরি না হলে কোনো প্রযুক্তিই কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না। এখন সময় এসেছে পল্লী বিদ্যুৎকে কেবল ‘সেবা সংস্থা’ হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে এটিকে একটি আধুনিক, দক্ষ ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা। কারণ বিদ্যুতের আধুনিকায়ন ছাড়া গ্রামীণ উন্নয়ন, শিল্পায়নের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ গড়া সম্ভব নয়। তবে তার আগে দরকার দাবি আদায়ের এই আন্দোলন কীভাবে শান্তিপূর্ণ, যৌক্তিকভাবে সমাধানের লক্ষ্যে পৌঁছানো যায়। এক্ষেত্রে সরকার এবং পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি উভয়কে আলোচনার মাধ্যমে ঐক্যে পৌঁছা এবং জনদুর্ভোগ লাঘবে টানা কর্মবিরতি প্রত্যাহার করা। দাবি আদায়ের নামে গ্রাহক-দুর্ভোগ কাম্য নয়।