সামষ্টিক অর্থনীতি
ড. এস এম জাহাঙ্গীর আলম
প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:১০ এএম
সরকারি অর্থব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজস্বনীতি। সরকার বিভিন্ন অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য যেসব নীতি গ্রহণ করে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো রাজস্বনীতি। সংক্ষেপে সরকারের রাজকোষ পরিচালনার নীতি হলো রাজস্বনীতি। বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ বিভিন্নভাবে রাজস্বনীতির সংজ্ঞা দিয়েছেন। অধ্যাপক স্যামুয়েলসন বলেন, ‘রাজস্বনীতি বলতে আমরা কর ও সরকারি ব্যয়ের সেই রূপদানকেই বুঝি, যার দ্বারা বাণিজ্য প্রশমিত হয়, যা অর্থব্যবস্থাকে সম্প্রসারণশীল করে এবং মুদ্রাস্ফীতি ও মুদ্রাসংকোচন থেকে মুক্তি দিয়ে পূর্ণ নিয়োগ অবস্থায় পৌঁছতে সহায়তা করে।’ অর্থনীতিবিদ মিসেস হিকস্ বলেন, ‘রাজস্বনীতি হলো এমন একটা নীতি, যা অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য সরকারি অর্থব্যবস্থার যাবতীয় উপাদানকে কাজে লাগায়। ‘সুতরাং, রাজস্বনীতি বলতে সরকারের আয়-ব্যয় এবং রাজস্ব আহরণ সংক্রান্ত নীতিকে বোঝায়। এক কথায় সকল প্রকার সরকারি আয়-ব্যয়ের ক্ষেত্রে সরকার যে নীতি গ্রহণ করে তাকে রাজস্বনীতি বলে। কোনো দেশের রাজস্বনীতির উদ্দেশ্য নির্ভর করে মূলত সে দেশের অর্থনৈতিক গতি-প্রকৃতির ওপর। বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার প্রকৃতি বিভিন্ন হওয়ায় তাদের রাজস্বনীতিতে কিছুটা পার্থক্য লক্ষ করা যায়। কিন্তু, তা সত্ত্বেও বিভিন্ন দেশের রাজস্বনীতির কতগুলো সাধারণ উদ্দেশ্য রয়েছে। এগুলো নিচে বিশ্লেষণ করা হলো :
পূর্ণ নিয়োগ অর্জন : পূর্ণ নিয়োগ বলতে এমন একটি অবস্থাকে বোঝায় যখন দেশে প্রচলিত মূল্যে নিয়োগ পেতে ইচ্ছুক এমন সকল উপকরণ নিয়োজিত থাকে। পূর্ণ নিয়োগ অর্জিত না হলে জাতীয় আয়ের কাম্যস্তর বজায় রাখা সম্ভব হয় না। তাই, দেশে যখন অনেক কর্মক্ষম লোক বেকার থাকে এবং প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ অব্যবহৃত থাকে তখন সরকার রাজস্বনীতির মাধ্যমে সেই সমস্ত সম্পদের পূর্ণ ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করে থাকেন। এভাবে দেশে পূর্ণ নিয়োগ অর্জন করা হয় এবং তা বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন : রাজস্বনীতির সাহায্যে বাণিজ্যচক্রে অনাকাঙ্ক্ষিত ওঠানামা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বাণিজ্যচক্রের সমৃদ্ধির সময় চাহিদা বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিলে তা রোধ করার জন্য কর বৃদ্ধি করা যেতে পারে। আবার মন্দার সময় নিয়োগ বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে কর কমানো যেতে পারে। এভাবে চক্রবিরোধী রাজস্বনীতি অনুসরণের মাধ্যমে বাণিজ্যচক্রজনিত ওঠানামা রোধ করা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন করা সম্ভব।
দাম স্তরের স্থিতিশীলতা রক্ষা করা : বর্তমানে প্রত্যেক দেশে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দ্রব্যমূল্যেও স্থিতিশীলতা রক্ষা করা। দ্রব্যমূল্য দ্রুত ওঠানামা করলে সমাজে বিভিন্ন ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া এবং অস্থিরতা দেখা দেয়। দ্রব্যমূল্য বাড়লে ভোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয় আবার দ্রব্যমূল্য হ্রাস পেলে উৎপাদনকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সুতরাং মূল্যস্তরের ওঠানামা দেশের জন্য ক্ষতিকর। এ ক্ষেত্রে সরকার তার রাজস্বনীতির মাধ্যমে মূল্যস্তরের স্থিতিশীলতা রক্ষা করার প্রয়াস নিয়ে থাকে।
আয় ও সম্পদের সুষম বণ্টন : দেশের সম্পদ ও আয় বণ্টনের ক্ষেত্রে বিরাজমান বৈষম্য হ্রাসের উদ্দেশ্যে প্রত্যেক দেশের সরকার প্রয়োজনীয় রাজস্বনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করে। এ ক্ষেত্রে রাজস্বনীতি এমনভাবে কার্যকর করা হয়, যাতে ধনীদের নিকট হতে অধিকতর প্রগতিশীল হারে কর আদায় করা হয় এবং আদায়কৃত অর্থ এমনভাবে ব্যয় করা হয়, যাতে সমাজের দরিদ্র লোকেরাই উপকৃত হয়। তাছাড়া নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ওপর হতে কর হ্রাস এবং বিলাসজাত দ্রব্যের ওপর কর বৃদ্ধি করে আয়বৈষম্য কমানো যায়।
মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ : দেশে মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিলে তা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে সরকার কর হার হ্রাস, সরকারি ব্যয় হ্রাস এবং জনগণের কাছ থেকে ঋণগ্রহণের মাধ্যমে জনগণের ক্রয়ক্ষমতা এবং সামগ্রিক চাহিদা হ্রাস করতে পারে। এভাবে সরকার রাজস্বনীতির মাধ্যমে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
বেকারত্ব নিয়ন্ত্রণ : বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো ব্যাপক বেকারত্ব। বেকারত্ব লাঘবে সরকার বিভিন্ন ধরনের পূর্ত কর্মসূচি অর্থাৎ রাস্তাঘাট নির্মাণ, বাঁধ নির্মাণ, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল এবং বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে সাময়িকভাবে মন্দা ও বেকারত্ব দূর করতে পারে।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন : সাম্প্রতিককালে অনেক অর্থনীতিবিদ রাজস্বনীতির লক্ষ্য হিসেবে কাম্য উন্নয়ন বা উন্নয়ন হার অর্জনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে থাকেন। উন্নত দেশের রাজস্বনীতির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো উন্নয়ন স্তর বজায় রাখা। আর অনুন্নত তথা উন্নয়নশীল দেশের রাজস্বনীতির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো অর্থনৈতিক উন্নয়ন হার ত্বরান্বিত করা।
বাস্তবতা স্বীকার করলে দেখা যায়, রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয়ের প্রবাহ একটু ভালো থাকলেও এখন অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি সূচক নিম্নমুখী। সংকট সব ক্ষেত্রেই। সেখান থেকে অর্থনীতিকে তুলে আনাই এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিগত সরকারের আমলে অনিয়ম, দুর্নীতি, অর্থ পাচার, সিন্ডিকেটের বলয় তৈরি হওয়ার কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জের তালিকাটাও বেশ দীর্ঘ। প্রথমত সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে হবে। এ জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। এ জন্য সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার কোনো বিকল্প নেই। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশ যে উচ্চ প্রবৃদ্ধির যুগে প্রবেশ করতে পেরেছিল, তার প্রধান কারণ স্থিতিশীল সামষ্টিক অর্থনীতি। অথচ সেটাই এখন হুমকির মধ্যে। আমাদের সবচেয়ে বড় উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো, প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা খুবই সন্তোষ পর্যায়ে ছিল, যাকে আমরা ইংরেজিতে ‘ম্যাক্রো ইকোনমিক স্ট্যাবিলিটি’ বলি। অর্থাৎ অর্থনৈতিক মূল খাতগুলোর মধ্যে একটি পারস্পরিক স্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করছিল। অন্যভাবে যদি বলি, সরকারি খাতে অর্থাৎ ‘ফিসক্যাল সেক্টরে’ জিডিপির অনুপাতে বাজেট ঘাটতি ছিল সহনীয় মাত্রায় (৫ শতাংশের নিচে)। বৈদেশিক খাতে আমাদের অনেক দিন ধরেই কারেন্ট অ্যাকাউন্ট এবং ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টের প্রবাহও ইতিবাচক ছিল, যার কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের স্থিতি একটা সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। রিয়েল সেক্টরেও জিডিপি প্রবৃদ্ধি অনেকদিন ধরে ভালো পর্যায়ে ছিল, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ছিল। বৈদেশিক, রিয়েল সেক্টর কিংবা হাউজহোল্ড সেভিংসের কথা যদি বলি সবদিক থেকে আমরা স্থিতিশীল পর্যায়ে ছিলাম। মাঝখানে করোনা-১৯ মহামারী এবং কিছুটা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আমাদের শেষ বছরটা তেমন ভালো যায়নি। আমাদের সবারই জানা আছে, আর্থিক খাতে আমাদের দীর্ঘদিনের সমস্যা অনেকদিন ধরেই ছিল, নন-পারফর্মিং লোন (এনপিএল)-ব্যাংক খাত থেকে প্রকল্প ঋণ নিয়ে তা প্রকল্পে ব্যয় না করে অনেক সময় অর্থ পাচার হয়েছে, এটা কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই চলেছে এবং চলছে। তা সত্ত্বেও অন্যান্য খাত বিশেষ করে আমাদের বৈদেশিক, রিয়েল ও সরকারি খাতের ভালো অবস্থা এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকার কারণে আমরা স্থিতিশীল পর্যায়ে ছিলাম। ২০২৩ সালে আমরা সব সূচকেই ব্যর্থ হয়েছি, জিডিপি প্রবৃদ্ধি আছে কিন্তু প্রবৃদ্ধির হার কমে গেছে। সবদিক বিবেচনায় ২০২৩ সাল ভালো যায়নি।আর ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান তো দৃশ্যমান।
সুতরাং বলা যায়, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধন, সম্পদের কাম্য ব্যবহার, আয় ও সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন, দাম স্তরের স্থিতিশীলতা রক্ষা, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, মন্দা ও বেকারত্ব দূরীকরণ, আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো সৃষ্টি ইত্যাদি লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনে রাজস্বনীতির ভূমিকা অনস্বীকার্য। সরকারি অর্থব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজস্বনীতি। সরকার বিভিন্ন অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য যেসব নীতি গ্রহণ করে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো রাজস্বনীতি। সংক্ষেপে সরকারের রাজকোষ পরিচালনা নীতি হলো রাজস্বনীতি। কাজেই সামষ্টিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে রাজস্বনীতিকে ঢেলে সাজাতে হবে।