মহিউদ্দিন খান মোহন
প্রকাশ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:১৬ এএম
চব্বিশের ৫ আগস্ট সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানের পর যে ক্রিয়া-কর্মটি জনসাধারণকে যারপরনাই আতঙ্কিত অবস্থায় রেখেছে, তা ‘মব সন্ত্রাস’। সে সময় পতিত আওয়ামী লীগের লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহৃত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছিল ভীতসন্ত্রস্ত। সে কারণে তারা ছিল পুরোপুরি নিষ্ক্রিয়। এ সুযোগে এক শ্রেণির দুর্বৃত্ত-দুষ্কৃতকারী তাদের অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে মব সন্ত্রাসে লিপ্ত হয়। ঘটতে থাকে নানা ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। কতিপয় মিডিয়া এবং তাদের বশংবদ ইউটিউবার-সাংবাদিকরা ওইসব ন্যক্কারজনক ঘটনাকে ‘বিপ্লবী জনতার স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া’র মোড়কে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করে। যদিও নৈতিকতার মানদণ্ডে সেটা কখনোই বিবেচ্য হতে পারে না। ক্রমবর্ধমান সে মব সন্ত্রাসের পরিপ্রেক্ষিতে আমার লেখা নিবন্ধ ‘মগের মুল্লুক থেকে মবের মুল্লুক’ প্রকাশিত হয়েছিল গত ২৬ জুন প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ। সে নিবন্ধের শেষ প্যারায় লিখেছিলাম, ‘হাসিনার পতনের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদী যুগের অবসান হলেও মব সৃষ্টি করে সরকারের কাছ থেকে অনৈতিকভাবে দাবি আদায়সহ নানা অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটে চলেছে। অথচ অজ্ঞাত কারণে সরকার এই মব সন্ত্রাস বন্ধ করতে পারছে না। সবকিছু দেখেশুনে অনেকেই মন্তব্য করছেন, বাংলাদেশ কি তাহলে মবের মুল্লুকে পরিণত হলো?’
প্রশ্নটি এখনও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়নি। বিভিন্ন ঘটনায় আমরা মব সংঘটিত হতে দেখছি এই মব সন্ত্রাসের হোতারা তাদের অপকর্মকে জায়েজ করার জন্য একটি সাধারণ সূত্র (কমন ফর্মুলা) ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ তকমা ব্যবহার করে চলেছে। আওয়ামী লীগের সময় যেমন ব্যবহার করা হতো ‘স্বাধীনতাবিরোধী চক্র’ কথাকে। গ্রামের জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ হোক, কিংবা রাজনৈতিক কোনো উদ্দেশ্য হাসিলের নিমিত্তে হোক, মব সন্ত্রাসকে হালাল করার জন্য এখন ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ সনদই যথেষ্ট। ঠিক এমনই পরিস্থিতি আরও একবার এই দেশে সৃষ্টি হয়েছিল স্বাধীনতার পর পর। তখন যে কাউকে ‘পাকিস্তানের দালাল’ বলে পিটিয়ে মেরে ফেললেও কোনো কৈফিয়ত দিতে হতো না। সে নৃশংসতা দেখেই প্রখ্যাত সাংবাদিক নির্মল সেন দৈনিক বাংলায় তার বিখ্যাত কলাম ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই’ লিখেছিলেন। আজ নির্মল দা নেই। তাই অমন শক্ত হাতে অধিকতর শক্ত কথায় মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কলম ধরার লোকের বড্ড অভাব। তা ছাড়া অজকাল মবের ভয়ে অনেকেই ‘জব’, মানে জবান বন্ধ করে নিজেকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা করছেন। কারণ সবারই তো ঘাড়ে একটি মাত্র কল্লা, আর ছাতির ভিতরে একটিই হৃদপিণ্ড। উচিত কথাটি বললে ঘাড় থেকে কল্লা বিচ্ছিন্ন কিংবা পিঞ্জরের ভেতরের হৃদযন্ত্র নিষ্পন্দন হয়ে যাওয়ার সমূহ আশঙ্কা তো রয়েছে।
চলমান মব সন্ত্রাসের সর্বশেষ ন্যক্কারজনক ঘটনাটি ঘটেছে গত ২৮ আগস্ট সেগুনবাগিচায় রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে। ‘মঞ্চ-৭১’ নামের একটি সংগঠন আয়োজিত আলোচনা সভায় কতিপয় যুবক ‘জুলাই যোদ্ধা’ ব্যানারে একত্র হয়ে হামলা চালিয়ে তা পণ্ড করে দিয়েছে। পাশাপাশি সেখানে উপস্থিত বর্ষীয়ান মুক্তিযোদ্ধা, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক-কলামিস্ট, সাংবাদিক-সংস্কৃতিজনসহ আয়োজক ও অংশগ্রহণকারীদের লাঞ্ছিত করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে। পুলিশও বিনা পরিশ্রমে আসামি পেয়ে তাদেরকে নিয়ে ঢুকিয়ে দেয় থানাহাজতে। ঘটনাটি ইতোমধ্যে সংবাদমাধ্যমের বরাতে সবাই অবগত হয়েছেন। তাই তার আনুপূর্বিক বর্ণনা দিয়ে নিবন্ধের আকৃতি বৃদ্ধির চেষ্টা থেকে বিরত থাকাই বাঞ্ছনীয়।
প্রশ্ন হলো, মঞ্চ-৭১-এর উদ্যোক্তা বা অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিগণ কি কোনো বেআইনি কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়েছিলেন? তারা কি গোপন কোনো মিটিং করতে বসেছিলেন? যদি তা হয়েও থাকে তাহলে সেটা দেখার জন্য দেশের আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা আছে, তারা প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু যারা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে অনধিকার প্রবেশ করে সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটাল, তারা কারা? কী তাদের রাজনৈতিক পরিচয়? সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো, তারা সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটালেও পুলিশ তাদের কিছুই বলেনি। বরং আক্রান্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের হাজতে ঢুকিয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করে দিল! এ ধরনের ঘটনা আমরা পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের পনেরো বছর দেদার ঘটতে দেখেছি। লীগ সন্ত্রাসীরা বিএনপিসহ বিরোধী দলের ওপর হামলা করেছে, আর মামলা হয়েছে আক্রান্তদের বিরুদ্ধে। সেই রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি দূর হবেÑ এ আশা নিয়েই এদেশের মানুষ জুলাই আন্দোলনে শরিক হয়েছিল। কিন্তু হতাশার ব্যাপার হলো, তাতে সরকার বদল হয়েছে, রাজনীতির চরিত্রের এতটুকু পরিবর্তন হয়নি।
যে ১৬ জনকে হাজতে ঢুকিয়েছে পুলিশ, তাদের সবাইকে আমি চিনি না, চেনার কথাও নয়। তবে তিনজন আমার খুব পরিচিত। দুজন তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য, একজনের সঙ্গে রয়েছে সাক্ষাৎ পরিচয়। মুক্তিযোদ্ধা-রাজনীতিক আবদুল লতিফ সিদ্দিকী সবারই পরিচিত। আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী ছিলেন। আবার সে সরকারের রোষানলে পড়ে কারাবাসীও হয়েছেন। তিনি কোনোদিক দিয়েই আমার পছন্দের ব্যক্তি নন। তারপরও বিনা অপরাধে তাকে হেনস্থা করাটা মানতে পারছি না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী-দার্শনিক ভলতেয়ারের একটি উক্তি আমি মনেপ্রাণে ধারণ করিÑ ‘তোমার মতের সাথে আমি একমত না হতে পারি, কিন্তু তোমার কথা বলার স্বাধীনতা রক্ষার জন্য জীবনও দিতে পারি।’ লতিফ সিদ্দিকীর রাজনৈতিক আদর্শ আমার কাছে কখনোই গ্রহণীয় ছিল না, এখনও নেই। কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধান প্রদত্ত তার যে অধিকার, সে অধিকার খর্ব হলে মুখ বুঁজে থাকা সম্ভব নয়। গ্রেপ্তার আরেকজন শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের শিক্ষক, জাতীয় দৈনিকসমূহে নিয়মিত কলাম লেখেন তিনি। একজন কলাম লেখক হিসেবে আমি তার সহযোদ্ধা। কোন অপরাধে তিনি গরাদবন্দি হলেন সরকারের কাছে তা জানতে চাওয়া কি অপরাধ বলে গণ্য হবে? তৃতীয়জন আমার ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত। সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্না। মেইনস্ট্রিম জার্নালিস্ট হিসেবে সারা দেশেই তিনি সুপরিচিত। তার সঞ্চালনায় অনেক টকশোতে অংশগ্রহণ করেছি। একসময়ের ছাত্রলীগ কর্মী হলেও সাংবাদিকতা কিংবা টকশো উপস্থাপনায় কখনও তার ছাপ লক্ষ করিনি। বরং তীর্যক প্রশ্ন করায় ধনাঢ্য এক আওয়ামী লীগ নেতার পুত্রের রোষের শিকার হয়েছিলেন তিনি। ঘটনাটি ঘটেছিল আমার সামনেই। দেশের উত্তরাঞ্চলের সাবেক ওই মন্ত্রিপুত্র টিভি টকশোতে যেতেন সশস্ত্র প্রহরী নিয়ে। এর কয়েক মাস পরেই মঞ্জুরুল আলমকে সে টিভি চ্যানেল থেকে বেরিয়ে যেতে হয়। অর্থাৎ চাকরি হারান তিনি।
একজন মানুষের, তা তিনি সাংবাদিক হোন কিংবা শিক্ষক বা অন্য কোনো পাবলিক পেশার, তার নিজস্ব রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকতেই পারে। থাকতে পারে কোনো বিশেষ দল বা আদর্শের প্রতি সমর্থন। তবে কর্মক্ষেত্রে অর্থাৎ দায়িত্ব পালনের বেলায় যদি সে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব না করে, তাহলে কারও বলার কিছু থাকতে পারে না। অধ্যাপক হাফিজুর রহমান কার্জন ও সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্না স্ব-স্ব কর্মক্ষেত্রে নিষ্ঠাবান সন্দেহ নেই। তাদের রাজনৈতিক আদর্শের জন্য বানোয়াট অভিযোগ এনে এভাবে হেনস্থাকে ফ্যাসিবাদী শাসনের এক্সটেনশন বললে কি অত্যুক্তি হবে?
গ্রেপ্তার ১৬ জনকে আদালতে তোলা হয়েছিল ২৯ আগস্ট। তাদের মধ্যে লতিফ সিদ্দিকী জামিন চাননি ‘আদালতের জামিন দেওয়ার ক্ষমতা নেই’ এই কথা বলে। এজলাসে তোলার সময় গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশে হাত উঁচিয়ে সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্না বলেছেন, ‘সাংবাদিকরা সন্ত্রাসী-দর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে এই হাতে লেখে। দেখেন আমার এই হাতেই হাতকড়া। বলুন, সাংবাদিকরা কী লিখবে, কার পক্ষে লিখবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আপনাদের কি মনে হয় আমরা সন্ত্রাসী? মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে বলা বা মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলা, এগুলোকে সন্ত্রাস করা বলে?’ সাংবাদিক পান্নার এসব প্রশ্নের জবাব আছে বলে মনে হয় না। শক্তি যেখানে রাজত্ব দখল করে, যুক্তি সেখানে থই পায় না।
মঞ্চ-৭১-এর অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে যে ঘটনা কতিপয় মবতন্ত্রী ঘটিয়েছে, তার নিন্দা জানানোর ভাষা নেই। তারপরও অনেকেই নিন্দা করেছেন, প্রতিবাদ জানিয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক গঠিত গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমদ, সাংস্কৃতিক সংগঠন- উদীচী, রাজনৈতিক দল- জাসদ এবং সাংবাদিক ডেভেড বার্গম্যানসহ অনেকেই ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন। কিন্তু তাতে কি ঘটনার হোতা এবং অতি-উৎসাহী পুলিশের বোধোদয় হবে?
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, উল্লিখিত ব্যক্তিদের নিরাপত্তাজনিত কারণে হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারপর তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দায়ের করে জেলহাজতে পাঠানো হলো কেন? সেখান থেকে তো তাদের যার যার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়ার কথা। কিন্তু পুলিশ তা না করে দিয়ে দিল মামলা। পতিত আওয়ামী লীগের সময় আমরা এ ধরনের বহু ঘটনা দেখেছি। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তা নির্মূল হবেÑ এ আশায় যারা বুক বেঁধে ছিলেন, তারা যে চরম হতাশায় মুষড়ে পড়বেন, সন্দেহ নেই। কেননা, দেশে এখন সংবিধান, রাষ্ট্রীয় আইন কোনোকিছুই কার্যকর নেই। আছে শুধু মব। চারদিকে এই মবতন্ত্রের জয়জয়কার। প্রধান উপদেষ্টা সাংবাদিকদের মন খুলে তার সমালোচনা করতে বলেছিলেন। প্রশ্ন হলো, সেসব সমালোচনা তিনি কান খুলে শোনেন কি না।
সরকারের দুর্বলতা, প্রশাসন ও পুলিশের শৈথিল্য মব সন্ত্রাসকে আজ মহামারির রূপ দিয়েছে। কবে, কোথায় গিয়ে এর সমাপ্তি ঘটবে, তা ভবিতব্যই জানে!