জরিপের ফল
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:৩৩ পিএম
বৈষম্য অর্থ ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে পার্থক্য। এটি এক ধরনের বঞ্চনা যা কারো প্রতি পক্ষপাত এবং কারো প্রতি বিদ্বেষমূলক আচরণকে স্পষ্ট করে। এই পক্ষপাত ও বিদ্বেষ শুধু ব্যক্তি ও জাতিগত ভিত্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, গোষ্ঠী, লিঙ্গ, বয়স এবং শারীরিক অক্ষমতার সঙ্গে রাজনৈতিক পর্যায়েও মানুষ বৈষম্যের শিকার হয়। যা বাড়াতে থাকে বিভাজন রেখা। বৈষম্যের চিত্রটি আমাদের সমাজে শিক্ষাক্ষেত্রে খুব প্রকট। শিক্ষার সুযোগের ক্ষেত্রে বৈষম্য ছাড়াও পরিবার থেকে প্রথম বাইরে আসার পর অনেক সময়েই শিক্ষার সুযোগপ্রাপ্ত অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে হতে হয় হরেকরকম হেনস্থার শিকার। কেউ শারীরিক নিগ্রহের সম্মুখীন হন আবার কাউকে শুনতে হয় মন্দ-কথা। কেউ শারীরিক অক্ষমতা, গায়ের রঙ এমনকি উচ্চতার জন্য নিগৃহীত হন। আর এর প্রায় সবই ঘটে সহপাঠীদের দ্বারা। আবার শিক্ষকের কাছেও অনেক সময় শিক্ষার্থীদের কাউকে কাউকে শুনতে হয় কু-কথা। এ ছাড়া আরও এক ধরনের নির্যাতন রয়েছে, যা চোখ এড়িয়ে যায় বহু মানুষের। সেটি সামাজিক বৈষম্য।
সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে আমাদের ছাত্রসমাজ। তারা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে গণঅভ্যুত্থানে রূপ দেওয়ার মাধ্যমে জাতির ওপর চেপে বসা একটি ফ্যাসিবাদী রেজিমকে হটিয়ে দেয়। অথচ সেই শিক্ষার্থীরাই এখনও বৈষম্যের শিকার! আমাদের কাগজ প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪২ শতাংশ শিক্ষার্থী বৈষম্যের শিকার’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি কোনোভাবেই স্বস্তিদায়ক নয় বরং বিব্রতকর ও বেদনাদায়ক।
২০২৪ সালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বৈষম্যের সম্যক অবস্থা বুঝতে সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশন দেশের ১ হাজার ১৭৩ জন শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর একটি জরিপ পরিচালনা করে। জরিপের ফলে বলা হয়েছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পরে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ১০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪১ দশমিক ৯ শিক্ষার্থীকেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বৈষম্যের শিকার হতে হচ্ছে। ফলে অধিকাংশেরই মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়েছে। ক্লাস ও পড়াশোনার মনোযোগেও ব্যাঘাত ঘটছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ফলাফল বৈষম্যের শিকার হয়েছেন ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী।
দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অনলাইন ফরম পূরণের মাধ্যমে অংশ নিয়ে তাদের যে মত জানান, তাতে ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে তাদের নানাভাবে এবং বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যের শিকার হতে হয়। তাদের মাঝে ৫১ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী এবং পুরুষ শিক্ষার্থী ৪৯ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হন তৃতীয় এবং চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীরা, যাদের হার প্রায় ৪০ শতাংশ।
জরিপ অনুযায়ী, সহপাঠীরাই সবচেয়ে বেশি বৈষম্যমূলক আচরণ করে, যা প্রায় ৫৮ শতাংশ। পরীক্ষার ফলাফলের ক্ষেত্রে শিক্ষকের দ্বারা বৈষম্যের শিকার প্রায় ৬০ শতাংশ। এ ছাড়া শিক্ষকের খারাপ আচরণের শিকার ৫৫ শতাংশ শিক্ষার্থী। লিঙ্গভিত্তিক কারণে ৩০ শতাংশ এবং ধর্মীয় বৈষম্যের শিকার ১৯ শতাংশ শিক্ষার্থী। শারীরিক অক্ষমতার কারণে ৭ শতাংশ এবং জাতিগত পার্থক্যের কারণে বৈষম্যের শিকার ৯ শতাংশ শিক্ষার্থী। এ ছাড়া অর্থনৈতিক কারণে প্রায় ২৩ শতাংশ, শারীরিক অবয়বের কারণে ২৯ শতাংশ এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী বৈষম্যের শিকার। প্রশাসনকে দায়ী করেছেন ৩২ শতাংশ শিক্ষার্থী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের দায়ী করেন প্রায় ১৫ শতাংশ। এ ছাড়া শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার শ্রেণিকক্ষে, যা ৬০ শতাংশ।
আঁচল ফাউন্ডেশন তাদের জরিপের যে ফলাফল প্রকাশ করেছে তাতে শিক্ষাঙ্গনের বৈষম্যের প্রভাব স্পষ্ট। অথচ গত বছর শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনই রূপ নিয়েছিল গণঅভ্যুত্থানে। বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাদের স্পষ্ট অবস্থান ঘোষণার এক বছর পেরিয়ে এসে দেশে বৈষম্য কতটুকু কমেছে, তা একটি মাত্র জরিপে- অল্পসংখ্যক শিক্ষার্থীর মনোভাবে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়েছে, তা যথাযথ না হলেও পরিস্থিতি যে আমাদের খুব বেশি এগিয়ে নিতে পারেনি, সেটি স্পষ্ট। আমরা মনে করি, কোনো শিক্ষার্থী যখন শিক্ষাঙ্গনে তার সহপাঠী অথবা শিক্ষকদের দ্বারা বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হন, তখন তার প্রভাব শারীরিক কিংবা মানসিক নিগ্রহের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। আর এর প্রভাব থেকে যায় পরবর্তী জীবনেও।
আমরা অনেকেই হয়তো প্রত্যক্ষভাবে আগ্রাসী মনোভাবের নই। কিন্তু আমরা যদি অন্যকে নিগৃহীত হতে দেখেও মুখ বুজে থাকি, তাহলে নিগৃহকারীকে প্রকারান্তরে উৎসাহিতই করা হবে। তাই নিগ্রহের ঘটনাকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। শিক্ষাক্ষেত্রে তো বটেই, যেকোনো ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধেই আমাদের সোচ্চার হতে হবে, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করতে হবে। শিশু শেখে নিজের পরিবার থেকে। পরিবারই তার শিক্ষার প্রাথমিক পাদপীঠ। তাই পরিবার থেকেও শিশুকে বৈষম্যবিরোধী আচরণ সম্পর্কের ধারণা দিতে হবে। যাতে তার ভেতরে অন্যকে নিগৃহ করার, অন্যকে হেয় করার, অপমান করে তৃপ্তি লাভের মানসিকতা গড়ে না ওঠে। সেইসঙ্গে প্রতিটি পরিবারেই লক্ষ্য রাখতে হবে, ছেলে ও মেয়ে শিশুর প্রতি যেন বৈষম্য করা না হয়। যদি পরিবারে প্রতিটি শিশু সমান সুযোগ পেয়ে বেড়ে ওঠে, তাদের মধ্যে যদি বৈষম্যের ধারণার জন্ম না হয়, তাহলে তাদের দ্বারা ভবিষ্যতে কেউ বৈষম্যের শিকার হবে না। সেইসঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বৈষম্য প্রতিরোধে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং করা, প্রতিটি বিভাগে অভিযোগ বক্স রাখাসহ প্রয়োজনীয় সকল প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।