× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সবিশেষ

রাজনীতির রঙ্গরস

হাসনাত মোবারক, সাংবাদিক

প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৫ ১০:২৫ এএম

আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২৫ ১৫:২৭ পিএম

রাজনীতির রঙ্গরস

‘রাজনীতির মতো জুয়া পৃথিবীতে আর নেই’- এই কথাটি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন ডিসরেইলির। এজন্যই কি ফরাসি দার্শনিক ও সাহিত্যিক আলবেয়ার কামু বলেছিলেন, ‘আমি রাজনীতির যোগ্য নই, কেননা আমি প্রতিপক্ষের মৃত্যু কামনা করতে অক্ষম।’ এ বক্তব্য শুনে মানুষ কি রাজনীতিবিমুখ হয়েছে! কখনওই না। এর প্রমাণ মেলে ব্রিটিশ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড লয়েড জর্জের কথায়। তিনি পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, ‘যার রক্তে রাজনীতি মিশে আছে তার কাছে এ জায়গাটি একজন মদ্যপায়ীর সরাইখানার মতো।’

রাজনীতিবিদের রসবোধসম্পন্ন বক্তৃতা-বিবৃতির নজির কম নেই। প্রতিপক্ষকে ঘায়েলে শব্দই ছিল অস্ত্র। বেনজামিন ডিজরেইলির কাছে ‘দুর্ভাগ্য’ ও ‘দুর্যোগ’ শব্দ দুটির মধ্যে পার্থক্য সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছিল। জবাবে তিনি মৃদু হেসে তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী লিবারেল পার্টির বর্ষীয়ান নেতা উইলিয়াম ইওয়ার্ট গ্ল্যাডস্টোনের নাম উল্লেখ করে বলেন, ‘তিনি যদি হঠাৎ টেমস নদীর পানিতে পড়ে যান, তবে সেটা হবে দুর্ভাগ্য। আর কেউ যদি তাকে পানি থেকে জীবন্ত টেনে তোলে, সেটা হবে দুর্যোগ।’

শত্রুর শত্রু বন্ধু। যেমনটি ঘটেছিল ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের বেলায়। ঘটনাটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের। তিনি সুযোগ বুঝে মত পাল্টিয়ে রাশিয়াকে সাহায্যের প্রস্তাব দেন। তার সেই ভাষণ প্রচার হওয়ার পর সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন, ‘আপনি একজন ঘোরতর কমিউনিস্টবিরোধী হয়েও জার্মানির বিপক্ষে অবস্থান নিলেন। এটা কি আপনার জন্য মাথা নিচু করার মতো ব্যাপার হয়ে গেল না?’ চার্চিল জবাবে বলেন, ‘মোটেই না। আমার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে হিটলারের বিরুদ্ধে যাওয়া। হিটলার যদি নরকেও গিয়ে আক্রমণ চালাত, তাহলে আমি হাউস অব কমন্সে দাঁড়িয়ে শয়তানের পক্ষ নিয়ে সাফাই গাইতাম।’

বিলেতি রাষ্ট্রনায়কদের মতো আমেরিকানদেরও ‘উইট’ প্রশংসার যোগ্য। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা জর্জ ওয়াশিংটনকে দিয়ে শুরু করা যাক। ওয়াশিংটন মার্কিন আইনসভা কংগ্রেসকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট করার প্রস্তাব দেন। এতে কনভেনশনাল ডেলিগেটরা সম্মত হন এবং সিনেট গঠন করেন। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অব স্টেট থমাস জেফারসন রাষ্ট্রীয় কাজে ছিলেন ফ্রান্সে। তিনি সেখান থেকে ফিরে ওয়াশিংটনের কাছে ছুটে গিয়ে সিনেট গঠনের ব্যাখ্যা জানতে চাইলেন। তখন ওয়াশিংটন তাকে বলেন, ‘এইমাত্র তুমি পান করার আগে কফি কাপ থেকে পিরিচে ঢাললে কেন?’ জেফারসন জবাব দেন, ‘ঠান্ডা করার জন্য।’ ওয়াশিংটন তখন জেফারসনকে বলেন, ‘এখানেও ঠিক একই উদ্দেশ্য। আমরা নিম্নকক্ষের সদস্যদের রচিত আইন আরও ঠান্ডা করার জন্য সিনেটে ঢালব।’

আব্রাহাম লিংকনের বাকপটুতা কিংবদন্তিতে পৌঁছেছিল। মজার মজার গল্প বলে তিনি প্রতিকূল পরিবেশকে অনুকূলে নিতেন। লিংকন তখন ওকালতি পেশায় যুক্ত। আদালতে মামলার শুনানি চলছে। এমন সময় লিংকন আদালতে প্রবেশ করে পেশকারের দিকে ঝুঁকে পড়ে তাকে একটি গল্প শোনালেন। গল্পটি এতই মজার ছিল যে স্থান-কাল ভুলে পেশকার হো হো করে হেসে ওঠেন। বিচারক রেগে গিয়ে লিংকনকে বললেন, মিস্টার লিংকন, আপনি সব সময় গল্প বলে কাজের বিঘ্ন ঘটান; আর সঙ্গে সঙ্গে পেশকারকে বললেন, গল্প শুনে হাসার জন্য তোমাকে ৫ ডলার জরিমানা করা হলো। পেশকার কোনো আক্ষেপ না করে বিচারককে উদ্দেশ করে বললেন, ‘গল্পটার দাম কিন্তু ৫ ডলারের চাইতেও বেশি।’ তখন বিচারক তাকে কাছে ডেকে নিয়ে গল্পটি শুনতে চাইলেন। গল্পটি শোনার পর বিচারকও হা হা করে হেসে উঠে আদেশ দিলেন, ‘তোমার জরিমানা মওকুফ করা হলো।’

শুধু বিদেশি রাজনীতিবিদদের বাকপটুতা নিয়ে আলাপ পাড়লে হবে! আমাদের দেশের রাজনীতিকদের বাক্যবান, রসিকতাও কি কম! চুয়ান্নর প্রাদেশিক নির্বাচন সামনে। ক্ষমতাসীন দল মুসলিম লীগের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে শেরে বাংলা একে ফজলুল হক এবং মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে যুক্তফ্রন্ট। মুসলিম লীগের প্রাদেশিক নেতৃত্বে ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমীন। হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে বাকযুদ্ধে মুসলিম লীগের নেতারা কুলিয়ে উঠছেন না। ক্ষমতাসীন দলের কুশাসন নিয়ে রচিত হয়েছিল গান। রাজনীতির সঙ্গে সংস্কৃতির মিশ্রণ ঘটিয়েছিল যুক্তফ্রন্টের নেতা কর্মীরা, যা সহজেই সাধারণ মানুষের চিত্তকে নাড়া দিয়েছিল।

তখন মুসলিম লীগ চালাতে লাগলেন ব্যক্তিগত আক্রমণ। বলা শুরু করলেন, ‘যুক্তফ্রন্টের তিন নেতাÑ ভাসানী, ডুবানী আর কান্দানী। আসাম থেকে বানের জলে ভেসে এসেছেন ভাসানী, কলকাতায় মুসলমানদের ডুবিয়ে এসেছেন ডুবানী (সোহরাওয়ার্দী) আর মিটিংয়ে বক্তৃতা দিয়ে শ্রোতাদের কাঁদাতে ওস্তাদ হলেন কান্দানী (শেরে বাংলা)।’ অবশ্য মুসলিম লীগের এই প্রচার কৌশল শেষ পর্যন্ত যে কাজে লাগেনি, তার প্রমাণ নির্বাচনের ফলাফল। ভরাডুবি ঘটে মুসলিম লীগের। সে ইতিহাস আপাতত থাকুক।

শেরে বাংলা জনসভায় বৈঠকি ঢংয়ে বক্তৃতা করতেন। প্রতিপক্ষকে গল্প দিয়ে ধরাশায়ী করতেন। তার গল্প শোনার জন্য দলমত নির্বিশেষে সবাই অপেক্ষা করতেন। জনসভায় শেরে বাংলার বলা গল্পগুলোই সে সময়কার মানুষের মুখে মুখে ফিরত। পল্টনের এক জনসভায় তার বলা একটা গল্পই তুলে ধরছি। কিছু একটা ঘটলেই সে সময় মুসলিম লীগ নেতারা ‘ইসলাম গেল’ বলে শোরগোল তুলতেন। শেরে বাংলা শুরু করলেনÑ ‘পড়ন্ত বিকেলে কেউবা ঘরে বসে গুড়-মুড়ি চিবোচ্ছে। কেউ বা দহলিজে আলাপচারিতায় রত। হঠাৎ চেনাকণ্ঠের চিৎকার কানে এলো, ইসলাম ডুবল রে, ইসলাম ডুবে গেল সবাই জলদি আসো।’ গ্রামের এত পাক্কা সাচ্চা মুসলমান থাকতে ইসলাম ডুবে যাবেÑ এ তো হতে পারে না। সবাই ঘর থেকে দৌড়ে বেরুল। দেখা গেল খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে বৃদ্ধ নুরু মুন্সী চিৎকার করে ডাকছে। সবাই গিয়ে জড়ো হলো নুরু মুন্সীর কাছে। শঙ্কিত, উত্তেজিত নেত্রে সবাই তাকাচ্ছে নুরু মুন্সীর পানে। সবার মধ্যেই একটি জিহাদি মনোভাব। নুরু মুন্সী হুকুম দিলেই সবাই ঝাঁপিয়ে পড়বে ইসলাম রক্ষার জন্য। মরলে শহীদ, বাঁচলে গাজী। বৃদ্ধ নুরু মুন্সী দন্তহীন শুষ্কচর্ম বৃদ্ধ। ধীরে ধীরে স্বল্প আওয়াজে বলতে লাগল, ‘মিঞা পাড়ার ছক্কু মিঞার যুবকপুত্র ইসলাম মিঞা খালে পড়ে স্রোতের তোড়ে হাবুডুবু খাচ্ছেÑ নেশা করার কারণে হাত-পা চালিয়ে সাঁতার কাটতে পারছে না। ডুবে মরে যাবে। তোমরা ওকে টেনে তোলো।’ ইসলাম মিঞার পুরো নাম নুরুল ইসলাম। বখাটে ছেলে। চুরি করা আর নেশা করা তার প্রধান কাজ। বহুবার মার খেয়েছে লোকজনের হাতে ধরা পড়ে। শোধরায়নি। যাহোক, ইসলামকে ডুবতে দেখে সবাই চলে যেতে লাগল। কেউ কেউ যেতে যেতে বলতে লাগল, ‘নুরুল ইসলাম মরলে মরুকÑ দশ গ্রামের লোক হাঁপ ছেড়ে বাঁচবে...।’ শেরে বাংলার এই গল্প শোনার পর উপস্থিতিদের মনমেজাজে আসে সরস পরিবর্তন। নেতা ও জনতার হৃদস্পন্দন যেন এক অভিন্ন সুরে দুলতে লাগল। ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দীরও এ রকম অসংখ্য ঘটনা রয়েছে।

বরেণ্যদের পর এখন একজন সাধারণ মানুষের ঘটনা বলা যাক। গ্রামের পশ্চিমপাড়া মহল্লার প্রধানকে দাওয়াত দিয়েছিলেন মধ্যপাড়ার মহল্লার এক রায়ত। কিন্তু নিমন্ত্রণদাতা বিয়ের আগের রাতে গিয়ে দাওয়াত তুলে নেন। বিষয়টিকে অপমানজনক হিসেবে নিয়ে গ্রাম্য সে সালিশ বসে। কয়েকশ মানুষের উপস্থিতি। নিমন্ত্রণকারী দুই ভাই ভরা মজলিসে জানালেন, তাদের মহল্লার প্রভাবশালী জ্ঞাতিগোষ্ঠীর খপ্পরে এ কাজ করেছেন। এজন্য তারা অনুতপ্ত। তখন পশ্চিম পাড়ার মহল্লার দুলাল মিয়া বলে ওঠেন, ‘তোমরা দুই ভাই আমাদের মহল্লায় যোগ দাও।’ এ কথা শুনে গলা খাকারি দিয়ে ওঠেন পশ্চিম পাড়া সমাজের মুরুব্বি সাত্তার প্রামাণিক। তিনি সাদামাটা স্বভাবের নিরক্ষর এক কৃষক। তিনি কখনোই সালিশে কথা বলেন নাই। সেদিন তার কণ্ঠ যেন গম গম করে বেজে উঠল। শুরু করলেনÑ ‘ ক্যা দুলাল। আমরা কি এতই দুব্বল অইচি রে বাপু! বাইর সমাজ থেকে লোক লিয়া সমাজ চালান লাগবি। খবরদার!’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা