হাবীব ইমন, সাংবাদিক
প্রকাশ : ২৪ আগস্ট ২০২৫ ১১:৩৫ এএম
বিভুরঞ্জন সরকার
আমি কার জন্য এই শোকগাথা লিখছি? এটা কি একজন প্রবীণ সাংবাদিকের নাকি সুনীতির অপমৃত্যুতে লেখা এলিজি? আমি জানি না। তবুও লিখছিÑ না-জেনেই।
এক.
ভোর পাঁচটা। মহানগর রাজধানী ঢাকার সিদ্ধেশ্বরীর আকাশে তখনও আলো ফোটেনি। বিভুরঞ্জন সরকার বসে লিখছিলেন তার জীবনের শেষ চিঠি। লিখছিলেন নাকি হৃদয়ের ক্ষরিত রক্ত ঝরাচ্ছিলেন? তার লেখার উপসংহার মাত্র দুই বাক্যের : ‘দুঃখই হোক আমার জীবনের শেষ সঙ্গী। আর পৃথিবীর সকল প্রাণী সুখী হোক।’
তারপর তিনি বেরিয়ে গেলেন। নদী ডাকছিল। মেঘনার জলে ডুবে মরার আগে তিনি রেখে গেলেন এক খোলা চিঠিÑ যেখানে ছিল জীবনের সব ব্যর্থতা, অপূর্ণতা, অভিমান এবং অদম্য সাংবাদিকতার দায়বোধের মর্মস্পর্শী দলিল।
কিন্তু সেই চিঠি বিডিনিউজ২৪ডটকম ছাপল কবে? মৃত্যুর পর। জীবিত বিভুরঞ্জন সরকারের কণ্ঠস্বর প্রকাশযোগ্য ছিল না। মৃত্যুই তার শেষ সাংবাদিকতার ‘পাসওয়ার্ড’ হয়ে দাঁড়াল।
দুই.
কার কাছে লিখেছিলেন বিভুরঞ্জন? রাষ্ট্রের কাছে? স্বজনদের কাছে? নাকি সেই অদৃশ্য বিধাতার কাছে, যাকে জীবনের পরাজিত মুহূর্তে মানুষ শেষ আশ্রয় হিসেবে খোঁজে? হয়তো সেই চিঠি কারও জন্যই ছিল না। হয়তো সেটি তিনি লিখেছিলেন নিজের কাছে স্বগতোক্তি বা সলোলোকির মতোÑ নিজের জীবন, নিজের ব্যর্থতা, নিজের যন্ত্রণা, নিজের অবরুদ্ধ শব্দের কাছে।
এই প্রথম তিনি জীবনের মাটি খুঁড়ে লিখলেন এক প্রতিবেদন, নিজের ওপর নিজেরই লেখা এক সংবাদ-বিশ্লেষণ। এটি কি শুধু ব্যক্তিগত কান্না ছিল, নাকি আজকের বাংলাদেশের ভেঙে পড়া সত্যের প্রতিধ্বনি? বিভুরঞ্জনের চিঠি কি কেবল তার ব্যক্তিগত বিলাপ, নাকি পুরো জাতির লুকোনো আর্তনাদ?
হয়তো তিনি কোনো খেলায় হেরে গিয়েছিলেন। কিন্তু খেলাটা কার সঙ্গে ছিলÑ রাষ্ট্রের সঙ্গে? সময়ের সঙ্গে? নাকি নিজের বিবেকের সঙ্গে? সারারাত অক্ষরের পর অক্ষর জোড়া দিয়ে তিনি যে ঘন মেঘ সাজিয়েছিলেন, তা জমা করেছেন নিজের হৃদয়ের গোপন সংবাদকক্ষে। এক নিঃশব্দ, একাকী সম্পাদকÑ নিজের জীবন-সংবাদ নিজেরই ডেস্কে জমা দিয়ে গেছেন।
তিনি অকপটে লিখেছেন : ‘আমার জীবনে কোনো সাফল্যের গল্প নেই। সাংবাদিক হিসেবেও এ-ডাল ও-ডাল করে কোনো শক্ত ডাল ধরতে পারিনি। আমার কোথাও না কোথাও বড় ঘাটতি আছে। এই ঘাটতি আর কাটিয়ে ওঠা হলো না।’
সত্য প্রকাশের জন্য তিনি সরকারের কিছু অসংগতি তুলে ধরেছিলেন, যার জন্য তাকে পত্রিকার সম্পাদক বাধা দিয়েছিলেন। তার ওপর চাপ ছিলÑ এখন সত্য প্রকাশ করা যাবে না। সম্পাদক তার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। যদি তার শেষ লেখা খোলা চিঠির বয়ান সত্যি হয়, তাহলে তার মৃত্যুর জন্য পরোক্ষভাবে কে দায়ী?
গত কয়েকদিন হলো তাকে অফিসে যেতে নিষেধ করা হয়েছিল। তিনি যাচ্ছিলেন না অফিসে।
তিন.
বিভুরঞ্জন সরকারের যাত্রা শুরু স্কুলের বেঞ্চ থেকে। দৈনিক আজাদ-এর মফস্বল সংবাদদাতা হয়ে শুরু করা সেই পথ পেরিয়েছে সংবাদ, রূপালী, একতা, যায়যায়দিন, জনকণ্ঠÑ দেশের প্রায় প্রতিটি বড় পত্রিকার পৃষ্ঠা তার কলমের ছোঁয়া পেয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন স্বাধীনতার পক্ষে। বাম রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। সত্য প্রকাশের জন্য ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন, তবু লেখার ধার কমাননি। কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তার হাতে কিছুই ছিল নাÑ নেই জমি, নেই প্লট, নেই পুরস্কার, নেই চিকিৎসার নিশ্চয়তা, নেই নিয়মিত বেতন।
লিভার সিরোসিস, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস, হৃদরোগ শরীর একে একে সব পরিত্যাগ করছিল। তার নিজের ভাষায় : ‘আমি তো হাত পেতে চলতে চাইনি। কিন্তু সারাজীবন হাত পেতে চলতে হবেÑ এটাও চাইনি।’
চার.
বিভুরঞ্জনের মৃত্যু আমাদের সামনে যে আয়না ধরেছে, তা শুধু একজন মানুষের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি দেখায় নাÑ ওতে ধরা পড়ে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার বাস্তব চিত্র। দেশে বর্তমানে প্রায় ২৮ হাজার সাংবাদিক পেশাগতভাবে কাজ করেন (জাতীয় প্রেস ক্লাবের তথ্য)। এর মধ্যে প্রায় ৬৩% সাংবাদিকের নেই কোনো স্থায়ী চুক্তি বা চাকরির নিশ্চয়তা। এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি সাংবাদিক মাসে ১৫ হাজার টাকার কম আয় করেন। চিকিৎসা বীমা, পেনশন বা নিরাপত্তা ভাতাÑ এসব অধিকাংশের কাছেই অনুপস্থিত।
সাংবাদিকতা এদেশে ঝুঁকির খেলা। হাসিনার আমলে বিরোধিতা করলে প্রাণ যেত। অনেক রক্তমূল্যে অর্জিত পরিবর্তনের পর এখনও ক্ষমতা নিয়ে লিখলে ক্ষমতাসীন মহল বা রাষ্ট্র-বহির্ভূত প্রেশার গ্রুপের চাপের মুখে চাকরি যায়। গোয়েন্দা সংস্থা, সশস্ত্র বাহিনী, নিরাপত্তা সংস্থা ও পুলিশের সমালোচনা করলে মামলা হয়। মাঠে গিয়ে খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলা, গুম, হত্যাÑ সবই ঘটে।
২০১৩ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত বাংলাদেশে ৩৮ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। ২০২৪ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ৪৪০টির বেশি মামলা হয়েছে।
এই বাস্তবতায় বিভুরঞ্জন সরকারের মৃত্যু আমাদের বলেÑ এই পেশায় সবচেয়ে সস্তা জিনিস হলো সাংবাদিকের জীবন, আর সবচেয়ে দামি হলো তার মৃত্যু। তার শেষ লেখার এই লাইনটাই মোদ্দা কথাÑ সত্য লিখে বাঁচা সহজ নয়।
পাঁচ.
বিভুরঞ্জনের জীবনের সবচেয়ে নির্মম ব্যঙ্গÑ তিনি বেঁচে থাকতে যত লেখা পাঠিয়েছেন, অনেকেই ছাপেনি। বলা হয়েছে : ‘আপনার লেখা পাঠক খায় না।’ কিন্তু তিনি মারা যাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই একই লেখা হয়ে গেল ট্রেন্ডিং কনটেন্ট। এটাই আমাদের গণমাধ্যম। জীবিত সাংবাদিক অপ্রকাশযোগ্য, মৃত সাংবাদিক ‘বিক্রিযোগ্য’।
ছয়.
শুধু গণমাধ্যম নয়Ñ আমরাও এই ব্যর্থতার অংশ। স্বাধীন মতপ্রকাশের পরিসর দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে।
• মতামত-সন্ত্রাস : ভিন্নমত প্রকাশ করলেই ‘রাষ্ট্রবিরোধী’, ‘ধর্মবিরোধী’, ‘ষড়যন্ত্রী’ ইত্যাদি ট্যাগ।
• ট্যাগ-সন্ত্রাস : অনলাইন প্লাটফর্মে সমন্বিতভাবে অপমান, চরিত্রহনন এবং ভিন্নমত দমনের চেষ্টা।
• সেল্ফসেন্সরশিপ : সাংবাদিকরা নিজেরাই মুখ বন্ধ করছেন, জীবন, মর্যাদা বা চাকরি বাঁচানোর জন্য।
বিভুরঞ্জন সরকারের শেষ লেখাটা পড়লে আমরা এক তীব্র বাস্তবতার মুখোমুখি হই। তিনি দেখিয়ে গেছেন, বিপুল আশা-সঞ্চারী ড. ইউনূসের আমলেও মতামত-সন্ত্রাসী আর ট্যাগ-সন্ত্রাসীরা সাংবাদিকদের জীবনে কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। এমনকি ‘আজকের পত্রিকা’-তে প্রকাশিত একটি লেখার কারণেই তার অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। সেই হতাশা আর আঘাত স্পষ্টভাবে ফুটে আছে বিডিনিউজে প্রকাশিত তার ঘোষণাসহ শেষ লেখাটিতে।
বিষয়টি ভয়ংকর। শেখ হাসিনার আমলে যেসব সুবিধাবাদী দেশ লুটপাট করে বিদেশে নিরাপদে বসবাস করছে, তারা এখন নীরব। অথচ যারা দেশে থেকে সততার সঙ্গে বাঁচতে চায়, স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে চায়, তাদের ওপর হামলে পড়ছে ইউনূস জামানায় নতুন মতামত-সন্ত্রাসীরা। এরাই গত ১৬ বছর ধরে ‘বাকস্বাধীনতার হরণ’ নিয়ে স্লোগান তুলেছিল। অথচ আজ নিজেরাই একই কৌশল অবলম্বন করছে।
এরা গোলামি সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী। শেখ হাসিনার আমলে যেমন একদল অন্ধ অনুসারী তৈরি হয়েছিল, এখন ইউনূসের আমলেও তারা সেই একই চেহারা দেখতে চায়। স্বাধীন মানুষ, স্বাধীন মতÑ এদের সহ্য হয় না।
এই অন্ধকার কোথায় শেষ হবে, কেউ জানে না। বিভুরঞ্জন সরকারের মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেÑ বাংলাদেশে স্বাধীন মতপ্রকাশের জায়গা এখনও সংকুচিতই রয়ে গেছে। সাংবাদিকরা কেবল শব্দ নিয়ে বেঁচে থাকে; অথচ সেই শব্দকেই বাংলাদেশে শত্রুতে পরিণত করা হয়।
সাত.
বিভুরঞ্জন সরকারের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আমরা দেখিÑ রাষ্ট্র, সমাজ ও গণমাধ্যম মিলে কীভাবে একজন মানুষকে একা করে ফেলতে পারে। একজন মানুষ জীবনের শেষ অব্দি সত্যের পাশে দাঁড়ান, অথচ রাষ্ট্র তাকে ‘প্লট’ দেয় না, পত্রিকা তাকে ‘স্থান’ দেয় না, সমাজ তাকে ‘সহায়তা’ দেয় না। তিনি নিজে এগুলো চাননি তা নয়। বাস্তবতা হলো অন্যদের পেতে দেখে তিনি যেটুকু তার ন্যায্য প্রাপ্য ভেবে চেয়েছেন, তার কিছুই পাননি। তবু তার মৃত্যুতে আমরা হঠাৎ জেগে উঠি। কিন্তু সেই জেগে ওঠা ক্ষণস্থায়ী। আমরা শিরোনামে নাম লিখি, ট্রেন্ডিং হ্যাশট্যাগ বানাই, তারপর ভুলে যাই।
প্রশ্নগুলো আমাদের সামনে :
• কেন একজন সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকের শেষ ভরসা নদী হয়ে ওঠে?
• কেন জীবিত অবস্থায় তার লেখা অপ্রকাশযোগ্য, অথচ মৃত্যু তাকে ‘বাজারযোগ্য’ করে তোলে?
• কেন রাষ্ট্র, গণমাধ্যম ও সমাজÑ সবাই মিলে একজন মানুষকে এত নিঃসঙ্গ করে তোলে?
• মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কি সত্যিই এই দেশে বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে?
আট.
বিভুরঞ্জন সরকারের মৃত্যু কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতার গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার এক নির্মম আয়না। তিনি মেঘনার জলে ডুবে গেছেন, কিন্তু তার শেষ চিঠি ঢেউ তুলছে আমাদের নীরবতার ওপর।
যদি আমরা এখনও না জাগি, তবে সাংবাদিকতার পরবর্তী শবযাত্রার দিন খুব দূরে নয়। বিভুরঞ্জনের চিঠি শেষ হয়নি। আমরা যারা বেঁচে আছি, তাদের কণ্ঠে, তাদের কলমে, সেই চিঠি আজও লিখিত হচ্ছে। বাকস্বাধীনতার এই দমবন্ধ করা সুপ্রাচীন অন্ধকারে, আমরা জানি না আলো কোথায়!