সংসদ নির্বাচন
মো. ইলিয়াস হোসেন
প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০২৫ ১১:৪১ এএম
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন আজ এক নতুন সংকটের দ্বারপ্রান্তে। একদিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কারমুখী ঘোষণা, অন্যদিকে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে গভীর সন্দেহ; এই দুই বিপরীত স্রোতের মধ্যে দেশ এগোচ্ছে সরকার কর্তৃক ঘোষিত ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের জাতীয় নির্বাচনের দিকে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে রমজানের আগেই ভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা জানানো হলেও প্রশ্ন জেগেছে- এই নির্বাচন কি সত্যিই সবার অংশগ্রহণে, গ্রহণযোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক হবেÑ নাকি এটি আরেকটি বিতর্কিত অধ্যায় হয়ে থাকবে?
আমরা সবাই জানি, এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান কাজ ছিল রাষ্ট্র সংস্কার, বিগত সরকারের আমলে সংঘটিত সব গুম, হত্যা এবং নির্যাতনের বিচার এবং সবশেষে সবর অংশগ্রহণে প্রতিযোগিতামূলক, গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ একটি নির্বাচনের আয়োজন করা। সরকার সেই লক্ষ্যে কয়েকটি সংস্কার কমিটিও গঠন করেছে এবং বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক কিছু বিষয়ে সংশোধনে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের জন্য জাতীয় ঐকমত্য কমিশনও গঠন করা হয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়ায় সব রাজনৈতিক দলের মতামত গ্রহণে দ্বিধাবিভক্ত হওয়া, বিশেষ করে সংখ্যানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতির অন্তর্ভুক্তি নিয়ে বড় দলের সঙ্গে ঐকমত্যে পৌঁছতে না পারায় সার্বিক সংস্কার প্রক্রিয়ায় স্থবিরতা পরিলক্ষিত হয়েছে। এতে নবগঠিত ‘ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি’সহ (এনসিপি) বেশ কয়েকটি দলের সংখ্যানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতিতে নির্বাচনে আগ্রহের ফলে আগামী ফেব্রুয়ারিতে ঘোষিত নির্বাচন আয়োজন নিয়েও সাধারণ জনমনে সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার ‘জুলাই সনদ’-এর মাধ্যমে ৩০টিরও বেশি রাজনৈতিক দলকে নিয়ে একটি জাতীয় ঐকমত্যের রূপরেখা ঘোষণা করেছে। এতে সংস্কার কর্মসূচির অংশ হিসেবে নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, পুলিশ প্রশাসন ও গণমাধ্যমের জন্য পৃথক পৃথক সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছে। এগুলোর সুপারিশ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই নির্বাচন হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
এরই মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ-সংগঠনের ওপরে সব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ফলে রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে আওয়ামী লীগ নির্বাসিত হয়, তাদের নিবন্ধনও স্থগিত করা হয়। এতে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি আংশিক স্বস্তি পেলেও, নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিয়ে তাদের বেশ সংশয় রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত নতুন দল এনসিপি সামনে এগিয়ে আসার সুযোগ পেয়েছে। এ ছাড়াও বর্তমান সরকারের ভেতরে থাকা কিছু অদৃশ্য প্রক্রিয়া মূলধারার রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, যে দলটি দীর্ঘদিন নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে সরাসরি বিচ্ছিন্ন ছিল, তারা বর্তমানে প্রশাসনিক ও সাংগঠনিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার দৌড়ে এক নতুন সুযোগ পেয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শিথিল রাজনৈতিক পরিবেশ, প্রশাসনের কিছু কৌশলগত পদে তাদের সহানুভূতিশীল কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে তাদের পদচারণা রাজনৈতিক মাঠে বিশেষ সুবিধা দিচ্ছে। এই বাস্তবতায় তারা আগামী ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণে পিআর পদ্ধতি অন্তর্ভুক্তির জন্য প্রয়োজনে নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছে বলে জানা যায়। অনেকেই মনে করছেন, এই সব দল অন্তর্বর্তী সরকারের নীরব প্রশ্রয়ে বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে, যা নির্বাচনী প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। তবে এনসিপি, জামায়াত ও কিছু আঞ্চলিক দল মাঠে বেশ সক্রিয় হলেও ভোটের প্রকৃত প্রতিযোগিতায় তারা কতটা প্রভাব ফেলতে পারবে তা নির্ভর করছে বড় দুই দলের অবস্থানের ওপর, বিশেষ করে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের ওপর। কারণ আওয়ামী লীগের মতো একটি রাজনৈতিক দল নির্বাচনের সম্পূর্ণ বাইরে থাকলে ভোটের মাঠে তাদের ছায়াশক্তি নির্বাচনের ফলাফলকে পাল্টে দিতে পারে। তা ছাড়া এক বা একাধিক বড় দল অনুপস্থিত থাকলে প্রতিযোগিতা কমে যায়, ভোটার আগ্রহও হ্রাস পায়। এখানে মনে রাখা জরুরি, বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রধান দুই ধারার একটির অনুপস্থিতি শুধু ভোটের প্রতিযোগিতা নয়, নির্বাচনের বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতাকেও সরাসরি আঘাত করে। আর গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত না হলে আন্তর্জাতিক অংশীদাররাও দ্বিধান্বিত হতে পারে। তারা মনে করেন, একটি অংশগ্রহণমূলক ও স্বচ্ছ নির্বাচন আয়োজন না হলে নির্বাচনের ফলাফল যেকোনো সময় রাজনৈতিক অস্থিরতা ডেকে আনতে পারে। এখানে উল্লেখ্য, নির্বাচনের বৈধতা শুধু ভোটের দিনের নিরাপত্তা বা উপস্থিতি দিয়ে নির্ধারিত হয় না, বরং প্রতিযোগিতার মান, প্রার্থীদের বহুমাত্রিকতা ও ভোটারের আস্থা দিয়ে মাপা হয়। দেশের একটি বড় দলের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচন হলে সেই মানদণ্ড পূরণ হবে কি না, তা নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন উঠতে পারে। এতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হতে পারে, যা দেশের অর্থনীতিকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করবে। বর্তমানে বিনিয়োগকারীরা অপেক্ষারত অবস্থায় আছেন, তারা দেখতে চাইছেন, নির্বাচনের পর সরকার কতটা শক্তিশালীভাবে গঠিত হয় এবং বিভিন্ন সিদ্ধান্ত/ নীতির ক্ষেত্রে কতটা ধারাবাহিকতা থাকে। মনে রাখতে হবে, নির্বাচন-পূর্ব অনিশ্চয়তা গ্রামীণ অর্থনীতির বাজারকেও স্থবির করতে পারে। বিশেষ করে কৃষিপণ্য ও নির্মাণ খাতে অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ অবস্থায় বিএনপি ব্যতীত এনসিপি, জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য ইসলামী দলগুলো দেশের সংস্কার প্রশ্নে জাতীয় নির্বাচনে পিআর পদ্ধতির অন্তর্ভুক্তি নিয়ে যে ব্যাপক আগ্রহ দেখাচ্ছে, তাতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি হচ্ছে। এতে একপক্ষ নির্বাচনের তারিখ পেছানোর এবং অন্যপক্ষ আগামী ফেব্রুয়ারিতেই জাতীয় নির্বাচন চাইছে। ফলে ঘোষিত তারিখে নির্বাচন আয়োজন অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে বলে আমি মনে করি। কারণ বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি দল চাইছে যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন হয়ে যাক। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর এই দ্বিমুখী অবস্থানের প্রেক্ষিতে দেশে আগামীতে নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সহিংসতার ঝুঁকি বাড়বে। অপরদিকে দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে সব দলের অংশগ্রহণে যদি একটি নির্বাচন আয়োজন করা যায় এবং এতে বিএনপি ও অন্যান্য বড় দল অংশ নেয়, তাহলে নির্বাচনী প্রতিযোগিতা তীব্র হবে, নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে এবং অন্তর্বর্তী সরকার সফলতার দাবিদার হবে। আর যদি বিরোধী পক্ষ বড় আকারে অনুপস্থিত থাকে, তবে নির্বাচনের ফলাফল দ্রুত ঘোষিত হলেও তা অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক সমালোচনা ডেকে আনবে বলে অনেকেই মনে করে।
এসব বাস্তবতা মাথায় নিয়েই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আগামী ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন আয়োজনে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে এবং এই বছর ডিসেম্বরের প্রথমার্ধেই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এমনকি নির্বাচনের দিনে, নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও সংঘাতমুক্ত রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় ৮ লাখ পুলিশ, আনসার ও সেনা সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। উল্লেখ্য, এবারের ভোটে প্রবাসী ভোটার ও প্রথমবারের ভোটারদের অন্তর্ভুক্ত করতে প্রযুক্তি ও প্রক্রিয়াগত সংস্কার আনার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে নারী ভোটারদের উপস্থিতি বাড়াতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে।
গত ১৭ বছরে একটি স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের অধীনে সবার অংশগ্রহণে একটি স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের জন্য কত মানুষকে গুম, হত্যা এবং নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে তা আমরা সবাই জানি। ওই সব নিগৃহীত মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে গড়ে ওঠা জুলাই ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন দেশের আপামর জনগণের কাছে একটি স্পর্শকাতর বিষয়। তাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ঘোষিত আগামী ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় এক নির্ণায়ক মোড়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ঘোষিত রোডম্যাপ কাগজে-কলমে প্রশংসনীয় হলেও তার সফলতা নির্ভর করছে দুটি বিষয়ের ওপর : ১. সত্যিকারের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, ২. প্রতিশ্রুত সংস্কারের বাস্তবায়ন।
যদি এসব শর্ত পূরণ হয়, তবে এই নির্বাচন হতে পারে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য এক নতুন সূচনা। অন্যথায় এটি হয়তো আরেকটি বিতর্কিত নির্বাচন হয়ে রাজনৈতিক বিভাজন আরও গভীর করবে, যার খেসারত দিতে হবে পুরো জাতিকে।