পরিবেশ
ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র
প্রকাশ : ০৬ আগস্ট ২০২৫ ১০:০২ এএম
ইউক্যালিপটাস মূলত গাছের গণের নাম। এরা অস্ট্রেলিয়ার গাছ হিসেবেই পরিচিত। কাঠের জন্য এর বেশ চাহিদা রয়েছে। এর প্রজাতি রয়েছে ৭০০টি। অস্ট্রেলিয়ার গাছ নামে পরিচিত থাকলেও এটি এখন সব মহাদেশেই পাওয়া যায়। আর আকাশমণি বা অ্যাকাশিয়া। এটি ফ্যাবাসি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একটি গাছ। এরাও দ্রুত বর্ধনশীল। এরাও অস্ট্রেলিয়ার গাছ নামে পরিচিত। ইন্দোনেশিয়া ও পাপুয়া নিউগিনিতেও এরা স্থানীয় প্রজাতি হিসেবে পরিচিত। এই গাছ ৩০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে।
আমাদের দেশে ইউক্যালিপটাস জনপ্রিয় হওয়ার অন্যতম কারণ হলো এটি দ্রুত বাড়ে। খুব একটা যত্ন করতে হয় না। চারা রোপণ করলে গরু-ছাগল এসবের পাতা খায় না। চাষ করতে খুব একটা বেগ পেতে হয় না। এসব গাছ মাটি থেকে বেশি পরিমাণ পুষ্টি ও পানি শোষণ করে। ইউক্যালিপটাস গাছ আশপাশের প্রায় ১০ ফুট এলাকার ও ভূগর্ভের প্রায় ৫০ ফুট নিচের পানি শোষণ করতে পারে। এরা দিনরাত ২৪ ঘণ্টাই পানি শোষণ করতে পারে। ফলে মাটি শুষ্ক থাকে। শুষ্ক মাটিতে খনিজ উপাদান আয়ন অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসে। ফলে দেশীয় প্রজাতির গাছ বাঁচতে পারে না। কেননা খনিজ উপাদান উদ্ভিদ শোষণ করে আয়ন আকারে। ফলে এর আশপাশের স্থানীয় জাতের গাছ এদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে না। দেখা গেছে এই ধরনের গাছের নিচে ঘাস বা অন্য কোনো লতা জাতীয় গাছ থাকে না। মাটিও বেশ শুষ্ক থাকে। এই ধরনের বিদেশি গাছ দ্রুত বর্ধনশীল হওয়ায় জ্বালানিতে অবদান রাখে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশি গাছের সঙ্গে দেশি গাছ প্রতিযোগিতায় টিকতে পারে না। এমনিক এদের বংশবৃদ্ধিও বন্ধ হয়ে যায়। উপকারি কীটপতঙ্গ মারা পড়ে। তবে এর ফলে একটা পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর একটি দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হচ্ছে। ইউক্যালিপটাস, আকাশমণি গাছের ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় দেখা যায় যে এতে কোনো পাখি বাসা বাঁধে না। এমনকি এর নিচে যেমন বিশ্রাম নেওয়া যায় না, তেমনি এর কাণ্ড পাতায় কোনো অনুজীবও জন্মায় না।
ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণি উভয় প্রজাতিরই পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে। আকাশমণি মাটিতে থাকা পুষ্টির প্রবাহ পরিবর্তন করে দেয়। এতে করে অন্য উদ্ভিদ ও প্রাণীর ওপর এর প্রভাব পড়ে। এরা মাটির গুণাগুণ নষ্ট করে দেয়। এর ফলে মাটির আর্দ্রতার স্তর যেমন নিচে নেমে যায়, তেমনি পুষ্টির প্রাপ্যতাও কমে যায়। এতে করে ধীরে ধীরে স্থানীয় উদ্ভিদ প্রজাতি হারিয়ে যেতে থাকে। এসব উদ্ভিদ প্রজাতির ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য প্রাণীও হারিয়ে যেতে থাকে। এসব উদ্ভিদের কারণে বনে আগুন লাগার প্রবণতাও বেড়ে যায়। কেননা এ ধরনের উদ্ভিদ অত্যন্ত দাহ্য প্রকৃতির হয়।
একটি গবেষণা তথ্য অনুযায়ী, ইউক্যালিপটাস লাগানোর ফলে মাটির উর্বরতা ১৫ শতাংশ কমে যায়। এরা মাটির পানি দ্রুত শুষে নেয়। বাষ্পীভবনের হার বেশি হয়। আমাদের দেশের ৯২ ভাগ মানুষ এর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে অবগত নয়। একটি তথ্যমতে, ইথিওপিয়ায় ভুট্টা ক্ষেতের পাশে ইউক্যালিপটাস গাছ লাগানোর ফলে হেক্টরপ্রতি ফলন ৪.৯ থেকে ১৩.৫ টন হ্রাস পায়। পাকিস্তানের একটি গ্রামে ১৯৯৫ সালে ইউক্যালিপটাস গাছ লাগানো হয়। ২০০০ সালে সেই গ্রামের পানির স্তর ২ ইঞ্চি কমে যায়। ইউক্যালিপটাসের ক্ষতি বুঝতে পেরে কেনিয়াতে এর রোপণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
সম্প্রতি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় বন-১ অধিশাখা থেকে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ঘোষণা করা হয় যে, ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণি গাছের চারা রোপণ, উত্তোলন ও বিক্রয় নিষিদ্ধ। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, এই প্রজাতির গাছের চারার পরিবর্তে দেশীয় ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ করতে হবে। সরকারি নির্দেশ অনুসারে এখন থেকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার পূরণে সরকারি, বেসরকারি সংস্থা ও ব্যক্তি পর্যায়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে এ ধরনের আগ্রাসী গাছ না রোপণ করতে বলা হয়। কারণ হিসেবে বলা হয়, ইউক্যালিপটাসও আকাশমণি গাছ মাটি থেকে অধিক পানি শোষণ করে। এর ফলে মাটির আর্দ্রতা কমে যায়। এদের পাতায় এক ধরনের টক্সিন থাকে। এটি মাটিকে বিষাক্ত করে। অন্যান্য গাছ এদের গোড়ায় জন্মাতে পারে না। এজন্য স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকিস্বরূপ এসব আগ্রাসী গাছের চারা রোপণ, উত্তোলন ও বিক্রয় নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
একটি নিউজ পোর্টালের তথ্য অনুযায়ী ফেনীতে গত ১৫ জুলাই কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ অভিযান চালায়। তারা অভিযান চালিয়ে ফেনী সদর উপজেলার ৮টি নার্সারিতে ৩৪ হাজার ৭৩০টি ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণি গাছের চারা ধ্বংস করেন। অবশ্য নার্সারি কর্তৃপক্ষকে প্রতিটি চারার জন্য ৪টাকা হারে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে যেন এসব গাছের চারা উৎপাদন ও বিক্রি না করে তার জন্য সতর্ক করে দেওয়া হয়। একটি পত্রিকার তথ্যমতে, চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণির চারা ধ্বংস করে। নওগাঁর বদলগাছীতেও অভিযান চালানো হয়। এখানে অভিযান চালান উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ। অভিযানে পাহাড়পুর ইউনিয়নের বিউটি নার্সারি, সাদিয়া নার্সারি, শারমিন নার্সারি মিলি নার্সারিতে এই গাছ ধ্বংস করা হয়। দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার সেতাবগঞ্জেও নার্সারিতে অভিযান করে প্রশাসন। গাজীপুরের শ্রীপুরেও ১০ হাজার ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণির চারা নষ্ট করা হয়। এভাবে অভিযান চলতে থাকলে মানুষের মধ্যে সচেতনতা যেমন সৃষ্টি হবে, তেমনি একটি ভয় থাকবে। অভিযানে যেহেতু ক্ষতিপূরণও দেওয়া হচ্ছে। তাই এতে নার্সারি মালিকদের ক্ষতি কম হবে। এভাবে সারা দেশে অভিযান চালানো হলে মানুষের সচেতনতা বাড়বে। তাই এ ধরনের অভিযান আরও জোরালোভাবে হওয়া দরকার।