× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ব্যাংক

সুদের উচ্চ হার এবং আমাদের রপ্তানি খাত

মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বাদল

প্রকাশ : ০১ আগস্ট ২০২৫ ১৬:০৪ পিএম

সুদের উচ্চ হার এবং আমাদের রপ্তানি খাত

রপ্তানি খাত দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। বিগত কয়েক দশকে তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরশীলতা দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে। দেশ স্বাধীনের পর পাট শিল্পের ওপর নির্ভরশীল একটি দেশ আজ বিশ্বব্যাপী তৈরি পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় অবস্থানে। তবে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বৈদেশিক মুদ্রার অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের চাহিদা আমাদের রপ্তানি খাতে সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে দেশের রপ্তানি খাতের প্রধান বাজার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশুল্ক হার। দেশটির সঙ্গে উচ্চশুল্ক হার নিয়ে বেশ কিছুদিন যাবৎ বাণিজ্যিক দরকষাকষি করছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে ট্রাম্প প্রশাসনের ধার্য করা শুল্ক কমানোই এর মূল লক্ষ্য। বাংলাদেশের জন্য প্রথমে এ হার ছিল ৩৭ শতাংশ, সর্বশেষ ৩৫ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে। হার কমিয়ে আনার জন্য কয়েক দফা আলোচনা হলেও কার্যত এখনও কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। আবারও দেন-দরবারের প্রস্তুতি চলছে। শুল্ক কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কী কী শর্ত দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে প্রকাশ করা হয়নি। অবশ্য প্রকাশ না করার কারণও রয়েছে, এ বিষয়ে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (প্রকাশ না করার চুক্তি) রয়েছে। তবে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে একটি ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি করতে চাইছে, যেখানে তাদের নিরাপত্তা, কৌশলগত স্বার্থ, অন্য দেশের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে। 

রপ্তানি খাত বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ব্যাংকিং খাতে রপ্তানি একটি মৌলিক চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত। যা জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আর্থিক স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ব্যাংকগুলো রপ্তানি-সম্পর্কিত কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, বাণিজ্যিক সহায়তা এবং বৈদেশিক লেনদেন পরিচালনায় বিভিন্ন সেবা প্রদান করে। যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ জোরদারেও সহায়ক ভূমিকা রাখে। আসলে রপ্তানি খাত শুধু ব্যাংকের লাভজনক কার্যক্রম নয়, জাতীয় অর্থনীতির গতিপ্রবাহে প্রাণসঞ্চারকারী উপাদানও। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, উচ্চ ব্যাংক সুদের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে। এটি মূলত, ঋণ গ্রহণের খরচ বৃদ্ধি করে, যা ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং নতুন বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করে। যে কারণে বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম সংকুচিত করতে বাধ্য হচ্ছে। উচ্চ সুদের হার মানে ব্যবসাগুলোকে ঋণ নেওয়ার জন্য আরও বেশি অর্থ পরিশোধ করতে হবে, যা তাদের লভ্যাংশকে কমিয়ে দেয়। ফলে ব্যাংক থেকে বেশি সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করা কঠিন হয়ে পড়ে। 

দাবি করা হয় বহু ব্যাংক এসএমইর ব্যবসা সহজ ও কম সুদে ঋণ দেওয়াকে অগ্রাধিকার দেয়। কিন্তু বাস্তবে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে (এসএমই) ব্যাংক ঋণ পেতে বেশি সুদ দিতে হয়। এর সুদহার সাধারণত করপোরেট ঋণের তুলনায় দেড় থেকে আড়াই শতাংশ বেশি থাকে। ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পরিচালন খরচ বেড়ে যাওয়ায় এসএমই’র ওপর উচ্চ সুদহার আরোপ করা হয়েছে। এমনিতেই ব্যবসায়ীরা ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ বেশি সুদ দিয়ে আসছিল। নীতি সুদহার বাড়ানোর ফলে সেটা আরও বেড়ে গেছে। এখন নতুন বিনিয়োগ তো দূরের কথা, টিকে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত ব্যবসায়ীসমাজ। অনেক সময় দেখা যায়, মাঝপথে যখন ব্যাংকের সুদহার বেড়ে যায় তখন সব হিসাব ওলটপালট হয়ে যায়। কারণ কিস্তির পরিমাণ বেড়ে যায় এবং মুনাফার হার কমে আসে। এতে বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খরচ কমাতে বাধ্য হচ্ছে। উচ্চসুদের হার এবং মূল্যস্ফীতি দুটোই ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এসব কারণে, ব্যবসা-বাণিজ্য এক ধরনের স্থবিরতার মধ্যে পড়েছে, যা অর্থনীতিকে দুর্বল করে দিতে পারে।

এ কথা স্বীকার করতেই হবে, ব্যাংক ঋণে সুদের হার বৃদ্ধি পেলে রপ্তানিকারকদের খরচ বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি রপ্তানি প্রতিযোগিতার ধারাবাহিকতা ও পরিমাণ হ্রাস পায়। এমনকি উচ্চ সুদের হার রপ্তানিমুখী শিল্পে বিনিয়োগ কমিয়ে দেয়। মূলধন ব্যয় বেড়ে গেলে ব্যবসা সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হবেÑ এটাই তো স্বাভাবিক। উচ্চ সুদের হার বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করলে স্থানীয় মুদ্রার মূল্য বেড়ে যায় এবং রপ্তানি পণ্য আরও দামি হয়ে পড়ে। এই প্রভাব প্রশমিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ভর্তুকিযুক্ত রপ্তানি ঋণ, বিকল্প অর্থায়নের ব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধির জন্য একটি স্থিতিশীল সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করার মতো লক্ষ্যভিত্তিক হস্তক্ষেপ বিবেচনা করতে পারে।

আমরা মনে করি, দেশে রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ করতে হবে। ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, হারবাল পণ্য, কৃষি পণ্য, আইটি এবং পাটজাত পণ্যের মতো খাতে রপ্তানির সম্প্রসারণ ত্বরান্বিত করতে হবে। ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পে বিনিয়োগÑ তৈরি পোশাক খাতের কাঁচামাল ও উপকরণ দেশেই উৎপাদনের মাধ্যমে আমদানিনির্ভরতা কমাতে হবে। এ ছাড়া বাজার সম্প্রসারণসহ আরও নানা পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।

এমনিতেই উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে কমছে সাধারণ মানুষের আয় ও কর্মসংস্থান। এর অন্যতম কারণ ব্যাংকঋণের সুদের হার বৃদ্ধি এবং উৎপাদন হ্রাস। উচ্চ সুদের হারের কারণে আমানতকারীরা কিছুটা লাভবান হলেও ব্যাংক ও ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন করে সংকট তৈরি হয়েছে। একদিকে উচ্চ সুদ দিতে চেয়েও আমানত পাচ্ছে না ব্যাংক, অন্যদিকে ঋণসংকটে পড়ছে বেসরকারি খাত। বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণে ধীরগতি এবং কর্মসংস্থান ঘাটতি দেশের অর্থনৈতিক সংকট বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য ব্যাংকঋণের সুদের হার ক্রমাগতভাবে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু ব্যবসায়ীরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি কমানোর একমাত্র উপাদান সুদহার বৃদ্ধি নয়; আরও অনেক উপায় রয়েছে। তথ্য-উপাত্ত বলছে, বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে নীতি সুদহার বা রেপো রেট আরও ৫০ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করায় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে ব্যাংকঋণের সুদ। এমন পরিস্থিতিতে ঋণের সুদহার বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। সুদহার অত্যধিক বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসা সম্প্রসারণ ও নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা আপাতত তুলে রাখছেন অনেক উদ্যোক্তা।

দেশের কর্মে নিয়োজিত বা শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণকারী মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়ায় বেকারের সংখ্যা বেড়েছে। গেল বছরের শুরুতে দেশে বেকারের সংখ্যা কম থাকলেও বছর শেষে ধারাবাহিকভাবে এই সংখ্যা বেড়েছে। মূলত জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রভাবে বছরের শেষ সময়ে বেড়েছে বেকারের সংখ্যা। বর্তমানে দেশে মোট বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ৬০ হাজার। ২০২৩ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ২৪ লাখ ৯০ হাজার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে দেশে বেকারের সংখ্যা বেড়েছে এক লাখ ৭০ হাজার। যা রাষ্ট্রের জন্য বাড়তি চিন্তার বিষয়। 

ব্যাংক ঋণ এবং রপ্তানিখাত উভয়ই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে একে অপরের পরিপূরক। ব্যাংকগুলো এই খাতে অর্থায়ন করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সরাসরি অবদান রাখে। ব্যাংক ঋণ রপ্তানি বাড়াতে এবং নতুন বাজার অনুসন্ধানে সাহায্য করে। ব্যাংকগুলো রপ্তানিকারকদের বিভিন্ন ধরনের ঋণ দিয়ে থাকে, যেমন- প্রি-শিপমেন্ট এবং পোস্ট-শিপমেন্ট। এই ঋণগুলো কাঁচামাল কেনা, উৎপাদন এবং পণ্য জাহাজীকরণে সহায়তা করে। তবে ব্যাংক ঋণের সুদের হার রপ্তানি খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রপ্তানি খাত দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। তারপরও ব্যাংকগুলো ঋণ দেওয়ার সময় কিছু ঝুঁকি বিবেচনা করে, যেমন - খেলাপি ঋণ, রাজনৈতিক অস্থিরতা ইত্যাদি। এই ঝুঁকিগুলো ব্যবস্থাপনার জন্য ব্যাংকগুলোকে সতর্ক থাকতে হয়। 

আমরা মনে করি, বাংলাদেশ ব্যাংক রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য ভর্তুকিযুক্ত সুদের হার প্রণোদনা দিতে পারে, যা রপ্তানিকারকদের ঋণ খরচ কমিয়ে তাঁদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শক্ত করবে। যেমন-মার্কিন ডলারে ইডিএফ সুবিধা পূর্বের অবস্থায় নিয়ে যাওয়া। বিকল্প অর্থায়নের প্রচার- রপ্তানি ফ্যাক্টরিং, ফোরফাইটিংয়ের মতো বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থা উৎসাহিত করতে হবে, যা ঐতিহ্যবাহী ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমাবে। এ ছাড়া মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং পূর্বাভাসযোগ্য বিনিময় হার নিশ্চিত করে একটি স্থিতিশীল অর্থনৈতিক পরিবেশ বজায় রাখা জরুরি, যা রপ্তানিকারকদের পরিকল্পনা ও বিনিয়োগে সহায়ক হবে। সর্বোপরি রপ্তানি খাতে সুদের হার ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে মুদ্রানীতিতে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করা যেতে পারে। কারণ রপ্তানি বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হয়- যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে। এছাড়াও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন হয় এবং শিল্পের বিকাশ ঘটে। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে রপ্তানি খাতকে গুরুত্ব দিতে হবে। 

  • কলাম লেখক এবং শিল্প-উদ্যোক্তা
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা