× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ব্যাংক খাত

আধুনিক ব্যবস্থায় দেশেও এখন চেকবিহীন লেনদেন

নিরঞ্জন রায়

প্রকাশ : ২৫ জুলাই ২০২৫ ১৬:০২ পিএম

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২৫ ১৬:০৪ পিএম

নিরঞ্জন রায়

নিরঞ্জন রায়

ব্যাংকিং লেনদেনের ক্ষেত্রে চেক একটি অতি পরিচিত নাম। চেক এবং নগদ অর্থ অনেকাংশেই লেনদেন নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে সমানভাবে ব্যবহৃত হয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং প্রমাণের সুবিধার্থে নগদ অর্থের চেয়ে চেকের জনপ্রিয়তা অনেক বেশি। ব্যাংকে লেনদেন করেন অথচ চেকের সঙ্গে পরিচিত নন এমন ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া যাবে না। এই চেকও আবার আছে হরেক রকমের। যেমন, বেয়ারার বা বাহক চেক এবং অর্ডার চেক। অর্ডার চেক আবার একাধিক রকমের হতে পারে। যেমন, শুধু অর্ডার চেক এবং দাগ কাটা চেক। দাগ কাটা চেক আছে কয়েক ধরনের। যেমন, শুধু দাগ কাটা চেক, ‘ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে প্রদেয়’ বা ‘অ্যাকাউন্ট পেইয়ি’ লেখা দাগ কাটা চেক, ‘অ্যান্ড কো’ লেখা দাগ কাটা চেক, ‘নট নেগোসিয়েবল’ বা ‘হস্তান্তরযোগ্য নয়’ লেখা দাগ কাটা চেক প্রভৃতি। 

বিভিন্ন ধরনের চেকের মধ্যে আবার অনেকগুলোই কাগজে আছে, বাস্তবে না থাকার মতো। কেননা ‘অ্যান্ড কো’ লেখা এবং ‘নট নেগোসিয়েবল’ লেখা দাগ কাটা চেক কখনোই লেনদেন নিষ্পত্তি হতে দেখা যায় না। অন্তত ‘নট নেগোসিয়েবল’ লেখা দাগ কাটা চেক কখনোই ব্যবহার করা হয় না। আমি আমার দীর্ঘ ব্যাংকিং কর্মজীবনে এই চেক ব্যবহৃত হতে দেখিনি। এমনকি জ্যেষ্ঠ যতজন ব্যাংকারের সংস্পর্শে এসেছি, তাদের সবার কাছে আমি এই ধরনের চেক সম্পর্কে জানতে চেয়েছি। কিন্তু কেউই এই চেক তাদের জীবদ্দশায় ব্যাংকিং লেনদেনে ব্যবহৃত হতে দেখেননি। কারণ এই ধরনের চেকের যে বৈশিষ্ট্য তাতে কেউ জেনেশুনে এই চেক দিয়ে লেনদেন নিষ্পত্তিতে রাজি হবে না। 

ব্যাংকিং পেশার শুরুতে আমরা এক প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছিলাম, যেখানে বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত ব্যাংকার এই চেক সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। সেই ব্যাংকার এক সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নরের দায়িত্ব পালন করেছেন, ব্যাংকের অনেক বিধিবিধান প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং পাণ্ডিত্য ছিল নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্ট বা হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইনে। ফলে চেক এবং বিভিন্ন ধরনের চেক নিয়ে তিনি ব্যাংকারদের প্রশিক্ষণ দিতেন। বিভিন্ন ধরনের চেকের বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনার এক পর্যায়ে যখন ‘নট নেগোসিয়েবল’ লেখা দাগ কাটা চেক ব্যাখ্যা করছিলেন, তখন আমি এই চেকের ব্যাপারে তার কাছে জানতে চাই যে এই চেকের বিশেষত্ব কী। উত্তরে তিনি বলেছিলেন ‘বোঝেন না, চুরি বিদ্যা বড় বিদ্যা না পড়লে ধরা’। আমি সেই শ্রদ্ধেয় ব্যাংকারের এমন উত্তর থেকে এই চেক সম্পর্কে আসলে কিছুই বুঝতে পারিনি। অন্যরা কিছু বুঝতে পেরেছিলেনÑ এমন দাবি করা যাবে না। পরবর্তীতে নিজের জানার আগ্রহ থেকে এ-সংক্রান্ত বেশ কিছু বই এবং লেখা পড়ে এই চেক সম্পর্কে কিছুটা জানতে সক্ষম হয়েছি। যতটুকু জেনেছি তাতে এই ‘নট নেগোসিয়েবল’ লেখা দাগ কাটা চেক দিয়ে লেনদেন নিষ্পত্তি করার কোনো অবকাশ নেই। অথচ এই চেকটি আইনে এখনও বহাল তবিয়তে আছে। যাহোক এটি একটি ভিন্ন বিষয়, তাই এখানে এ নিয়ে আর আলোচনা না বাড়ানোই ভালো।

ব্যাংকিং লেনদেন নিষ্পত্তিতে যত রকমের চেকের উল্লেখ আছে, তার মধ্যে বেয়ারার বা বাহক চেক সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় এবং এই চেকই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। কেননা এই চেক দিয়ে ব্যাংক থেকে অর্থ উত্তোলন একেবারেই সহজ কাজ। এই চেকের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, যার কাছে এই চেক থাকবে বা যিনি এই চেক বহন করবেন, তিনিই এই চেকের মালিক। ফলে এই চেক লেনদেন নিষ্পত্তিতে একজনের কাছ থেকে আরেকজনের কাছে ধারাবাহিকভাবে হস্তান্তর হতে পারে। যে ব্যক্তি এই চেক নিয়ে ব্যাংকে হাজির হবেন, ব্যাংক তাকে সেই চেকের অর্থ প্রদান করতে বাধ্য থাকবে। যদিও অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যাংকারদের নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্ট বা হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইনের আরও একটি ধারা মেনে চলতে হয়, তা হচ্ছে ‘আইনসিদ্ধ অর্থ প্রদান বা পেমেন্ট ইনডিউ কোর্স’। এই পেমেন্ট ইন ডিউ কোর্সে স্পষ্ট করে বলা আছে যে একজন ব্যাংকার কখন এবং কোন অবস্থায় চেকের অর্থ প্রদান করবে। একজন ব্যাংকার চেক প্রদানের সকল নিয়ম যথাযথভাবে পালন করে যখন সন্দেহাতীতভাবে নিশ্চিত হবে যে চেকের বাহকই এই চেকের আপাতত প্রকৃত মালিক এবং এই চেকের অর্থ পাওয়ার আইনগত অধিকার রাখে, তখনই ব্যাংকার সেই চেকের অর্থ প্রদান করবে।

বেয়ারার চেকের এমন বৈশিষ্ট্য এবং অর্থ প্রাপ্তির মালিকানা নির্ধারণের কারণেই বেয়ারার চেক নিয়ে আছে নানান গল্প এবং অভিজ্ঞতা। এক দম্পতি সমুদ্রের পাড়ে বেড়াতে গিয়েছিল এবং সঙ্গে ছিল তাদের এক পোষা কুকুর। সমুদ্রের পাড়ে সেই দম্পতি যখন একান্তে বসে প্রকৃতি দর্শন করছিলেন, তখন তাদের কিছু অর্থের প্রয়োজন হয়। কিন্তু তাদের কাছে অর্থ ছিল না, ছিল ব্যাংকের চেক বই। তারা সেই অন্তরঙ্গ মুহূর্ত ছেড়ে অর্থ উত্তোলনের জন্য ব্যাংকে যেতে রাজি ছিল না। তাই তারা একটি চেক লিখে তাতে স্বাক্ষর করে চেকটি কুকুরের গলায় ঝুলিয়ে কুকুরকে ব্যাংকে পাঠিয়ে দেয়। কুকুর যথারীতি চেকটি গলায় নিয়ে ব্যাংকে গিয়ে হাজির। ব্যাংক সেই বেয়ারার চেক নিয়ে কি করেছিল, অর্থাৎ চেকের অর্থ কুকুরের গলায় বেঁধে পাঠিয়ে দিয়েছিল, নাকি চেকের অর্থ প্রদানে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, তা আর আমার জানা হয়নি। কেননা আমি যে বই থেকে বেয়ারার চেক নিয়ে লেখা এই গল্প পড়েছি, সেখানে এতটুকুই উল্লেখ ছিল। 

কোনো ব্যক্তি যদি হারিয়ে যাওয়া একটি বেয়ারার চেক হাতে পায় এবং ব্যাংকে যেয়ে সেই চেকের অর্থ উত্তোলনের চেষ্টা করে, তখন ব্যাংকার কি সেই ব্যক্তিকে অর্থ প্রদান করবে, নাকি অর্থ প্রদানে অস্বীকৃতি জানাবে। ব্যাংকে বেয়ারার চেক নিয়ে এ রকম অনেক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে চেকের বাহক হওয়া সত্ত্বেও ব্যাংক অর্থ প্রদান করতে পারেনি। আবার এমন অনেক দৃষ্টান্ত আছে যেখানে বেয়ারার চেকের বাহককে অর্থ প্রদান করে ব্যাংকার অনেক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে আইনগত জটিলতার মধ্যেও পড়েছে। সত্যি বলতে কি, বেয়ারার চেক আপাতদৃষ্টিতে খুবই সহজ লেনদেনের মাধ্যম হলেও, বাস্তবে এটি মোটেই সহজ নয়। বরং অন্যান্য চেকের তুলনায় বেয়ারার চেকের অর্থ প্রদান করতে ব্যাংকারদের সবচেয়ে বেশি সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। এই চেকের অর্থ প্রদানে ব্যাংকারদের সবচেয়ে বেশি সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়।

বর্তমানে আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা এমন অবস্থায় চলে এসেছে যেখানে শুধু বেয়ারার চেক কেন, সকল প্রকার চেকের ব্যবহারই কমে গেছে। এমন এক সময় ছিল যখন চেক ছিল ব্যাংকিং লেনদেনের একমাত্র মাধ্যম। এখন আর সেদিন নেই। কেননা এখন চেক ছাড়া আরও অনেক পদ্ধতিতে ব্যাংকিং লেনদেন সম্পন্ন হয়। ডিজিটাল বা অনলাইন ব্যাংকিংয়ের যুগে অনেক সহজ পদ্ধতিতে লেনদেন সম্পন্ন করা সম্ভব। চেকের ব্যবহার নেই বললেই চলে। ই-ট্রান্সফার, ডেবিট কার্ড, ডাইরেক্ট ডিপোজিট, আন্তঃব্যাংক ফান্ড ট্রান্সফারসহ আরও অনেক পদ্ধতিতে ব্যাংকিং লেনদেন সম্পন্ন করা সম্ভব। ফলে এখন কাউকে অর্থ প্রদানের জন্য চেকের ব্যবহার করতে হয় না। আর বেয়ারার চেকের ব্যবহার তো অনেক কারণেই প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেয়ারার চেকে জালিয়াতির সম্ভাবনা অনেক বেশি। এই চেকের অর্থ প্রদানে ব্যাংকারকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। 

বর্তমানে ব্যাংকিং লেনদেনে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন কঠোরভাবে মেনে চলতে হয়। এই মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের অন্যতম শর্ত হচ্ছে তোমার গ্রাহককে ভালোভাবে জান (নো ইউর কাস্টমার)। যে কেউ চেক নিয়ে ব্যাংকে চলে এলে, ব্যাংক তাকে ভালোভাবে জানবে কীভাবে। একজন ব্যাংকার কোনো গ্রাহককে তখনই ভালোভাবে জানার সুযোগ পাবে, যখন সেই গ্রাহকের ব্যাংকে হিসাব থাকবে। এ কারণেই এখন যে কেউ বেয়ারার চেক নিয়ে ব্যাংকে এলে ব্যাংক সেই চেকের অর্থ প্রদানে অস্বীকৃতি জানাতে পারে যদি না তার ব্যাংকে একটি হিসাব থাকে। ব্যাংক হিসাব  নেই এমন ব্যক্তিকে চেকের টাকা প্রদান করলে ব্যাংকার মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ভঙ্গের অভিযোগে অভিযুক্ত হতে পারে। একদিকে ডিজিটাল বা অনলাইন ব্যাংকিং, অন্যদিকে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের বাধ্যবাধকতা। ফলে বেয়ারার চেকের ব্যবহার এখন আর বাস্তবসম্মত নয়। 

উন্নত বিশ্বে এখন চেকের ব্যবহার নেই বললেই চলে। আমি নিজে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চেক ব্যবহার করি না। এক সময় এত কষ্ট করে চেক নিয়ে লেখাপড়া করে এখন হয়তো ভুলেই গেছি যে কীভাবে একটি চেক লিখতে হয়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে ব্যাংকিং লেনদেন সম্পন্ন করতে এখনও চেকের প্রচলন আছে, যদিও ব্যবহারের সংখ্যা অনেক কম। ডিজিটাল ব্যাংকিং বা কাগজবিহীন ব্যাংকিং এখন এক নতুন বাস্তবতা। সমগ্র বিশ্বের ব্যাংকিং কার্যক্রম সেদিকেই অগ্রসর হয়েছে এবং আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাতকেও সেদিকে যেতে হবে। বাস্তবতার প্রয়োজনে আরও কিছু দিন হয়তো চেকের ব্যবহার সীমিত পরিসরে থাকবে, কিন্তু তারপর বহুল প্রচলিত এই চেক ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিবে। তা ছাড়া আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে বেয়ারার চেক রাখার সুযোগ একেবারেই নেই। এক কথায় আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বেয়ারার চেকের প্রয়োজন শেষ হয়ে গেছে। 

  • সার্টিফাইড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা