মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৩ জুলাই ২০২৫ ১৬:০৭ পিএম
ভয়াবহ! মর্মান্তিক! বিভীষিকাময় এক নির্মম দৃশ্য। গোটা জাতি স্তব্ধ, স্তম্ভিত। সড়কের দুই পাশে দাঁড়িয়ে হাজারও মানুষ হাতে হাত ধরে তৈরি করেছে বেষ্টনী। এর মধ্য দিয়েই অ্যাম্বুলেন্স আসছে এবং যাচ্ছে। এখানে-সেখানে ছুটছেন অভিভাবকরা। কেউ খুঁজছেন সন্তানকে, কেউ খুঁজছেন নিকটজনদের। তাদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠছে রাজধানীর জনবসতিপূর্ণ এলাকা উত্তরার আকাশ। শুধু উত্তরাই নয়, পুরো দেশ যেন নিস্তব্ধ, কান্নার প্রতিধ্বনিতে ভরা এক নির্বাক মুহূর্ত। সোমবার দুপুর ১টার কিছু পর আচমকা বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি এফ-৭ বিজিআই প্রশিক্ষণ বিমান ভেঙে আছড়ে পড়ল উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভবনে। যেখানে ভবিষ্যতের স্বপ্নরা গড়ে ওঠে, সেই স্থানটি আজ পরিণত হয়েছে বেদনার স্তম্ভে। জ্বলন্ত লেলিহান শিখায় মুহূর্তেই সেখানে ছারখার হয়ে যায় ক্লাসরুম, ভয় আর বিষাদের মধ্যে হারিয়ে যায় সব স্বপ্ন। এক নিমেষে ঝরে যায় অনেক কচি প্রাণ, নিভে যায় আগামীর অগণিত স্বপ্ন। খালি করে দিয়ে যায় বাবা-মায়ের বুক।
সঙ্গে পেছনে রেখে গেছে বাবার কান্না, মায়ের আহাজারি আর বন্ধু-স্বজনদের আর্তনাদ। এমন শোকার্ত মুহূর্ত প্রিয়জনদের যন্ত্রণায় দগ্ধ করে। অথচ যন্ত্রণাময় এ বাস্তবতার মুখে পুরো বাংলাদেশ। এমন মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না। যদিও এমন দুর্ঘটনার ওপর মানুষের হাত নেই। কিন্তু শিক্ষার্থীরা পাঠ নিতে গিয়ে নিজ প্রতিষ্ঠান থেকে লাশ হয়ে ফিরবে ভাবা যায় না। গণমাধ্যমের তথ্যমতে, এই সম্পাদকীয় লেখা পর্যন্ত দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩১ জন। নিহতের তালিকায় একজন শিক্ষিকাও রয়েছেন। জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন হাসপাতালে এখনও দেড় শতাধিক আহত শিশু চিকিৎসাধীন। নিকট অতীতে একটি দুর্ঘটনায় এত বেশি শিশু মৃত্যুর ঘটনা বিরল। এ ঘটনায় শুধু আপনজন হারা পরিবার নয়, পুরো বাংলাদেশ শোকাহত।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সোমবার বিমানটি উড্ডয়ন করার কয়েক মিনিট পরই বিধ্বস্ত হয়। দুর্ঘটনার পরপরই উদ্ধারকাজে অংশ নেয় ফায়ার সার্ভিসের ৮টি ইউনিট। যুক্ত হয় ৫ প্লাটুন বিজিবি, সেনা, বিমান ও পুলিশবাহিনীর সদস্যরা। এগিয়ে আসেন স্থানীয়রাও। এ ঘটনায় বিমানবাহিনীর পক্ষ থেকে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এদিকে মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনায় মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হয়েছে। ঘটনায় বিমানের পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলামও মারা গেছেন। ২২ জুলাই প্রতিদিনের বাংলাদেশসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে জানা যায়, বিমানবাহিনীর এফ-৭ বিজেআই ফাইটার এয়ারক্রাফট মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের উত্তরা শাখার দোতলা স্কুল ভবনে ক্রাশ ল্যান্ডিং করে। ভবনের প্রথম তলায় ছিল তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির শিশুদের ক্লাস। দ্বিতীয় তলায় ছিল দ্বিতীয় ও পঞ্চম শ্রেণির ক্লাস। টিচার্স রুমের কাছে যেখানটায় বিমানটি বিধ্বস্ত হয়, যেটি ছিল শিশু ও অভিভাবকদের দাঁড়ানোর স্থান।
দুর্ঘটনার পর আগুনে পোড়া শিশুদের উদ্ধারের দৃশ্য এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। বিভিন্ন সম্প্রচার মাধ্যমে দেখা যায়, আগুনে পোড়া অনেক শিশুকে স্ট্রেচারে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আবার স্ট্রেচারের অভাবে কাউকে কোলে করে, কাউকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দূরদূরান্ত থেকে শত শত মানুষ ছুটে এসে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তারা উদ্ধারকাজে সহায়তা করেছেন। অনেকে আহত ব্যক্তিদের স্বেচ্ছায় রক্ত দিতে হাসপাতালে ছুটে গেছেন। মানবিক দুর্যোগে বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানো এটা আমাদের বরাবরেরই দৃষ্টান্ত। তবে নির্মম সত্য হলো, এই বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা আমাদের দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতার ঘাটতির বিষয়টিও আবারও সামনে উঠে এলো। গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, একজন প্রশিক্ষণার্থী পাইলট বিমানটি চালাচ্ছিলেন। এ ক্ষেত্রে বিমানের কোনো ত্রুটি বা চালকের কোনো বিচ্যুতি ছিল কি না, সেটাও খতিয়ে দেখা দরকার। প্রশিক্ষণ হওয়া উচিত বিস্তীর্ণ প্রান্তরে কোনোভাবেই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় নয়। এই বিষয়টি কেন কর্তৃপক্ষের ভাবনায় এলো না তা সত্যি বিস্ময়কর। জনবহুল এলাকায় প্রশিক্ষণ বিমান চালানো বিচক্ষণতার পরিচয় নয় বলে উল্লেখ করেছেন দেশের বিভিন্ন নিরাপত্তা বিশ্লেষকগণ। তারা বলেন, সতর্ক হলে হয়তো এমন দুর্ঘটনা এড়ানো যেত। এর আগে বাংলাদেশে একাধিকবার প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা ঘটলেও এতগুলো প্রাণহানি ঘটেনি। অন্যান্য দেশে এ ধরনের প্রশিক্ষণ বিমান উড্ডয়নের ক্ষেত্রে অতি সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। আমাদের ঘাটতির বিষয়গুলো নিয়ে এখনই মূল্যায়ন জরুরি। ভবিষ্যতে এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা এড়াতে এর বিকল্প নেই।
বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হয়েছে। মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, উপদেষ্টা পরিষদের আরও অনেক সদস্য ও বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও নাগরিক সংগঠন শোক প্রকাশ করেছেন। অনেকে হাসপাতালেও গেছেন।
বিমান বিধ্বস্তের কারণ অনুসন্ধানে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করছে সরকার। আমাদের দুর্ভাগ্য, যেকোনো দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি হয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হলেও তা বাস্তবায়নের দৃষ্টান্ত খুবই কম। আশা করি, এবারের প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশের পর তার কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আমরা বিশ্বাস করি, যে শিক্ষার্থীরা আহত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে আছে, তাদের সর্বোচ্চ চিকিৎসার যে আশ্বাস সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে, তা নিশ্চিত করা হবে। এই মর্মান্তিক ঘটনায় দেশবাসীর সঙ্গে ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ পরিবারও শোকাহত। স্বজনহারা শোকার্ত পরিবারের প্রতি আমাদের গভীর শোক ও সমবেদনা।