রেলপথ
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০২৫ ১৫:৫৮ পিএম
ক্রমেই আরও বেশি অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে রেলপথ। এক সময় আরামদায়ক ও নিরাপদ যাত্রার জন্য রেলের সুখ্যাতি থাকলেও এখন তা অনেকটাই অপসারিত। অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং, বন্ধ স্টেশন, পুরাতন ও ঝুঁকিপূর্ণ লাইন, লোকবল সংকট এবং যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে অব্যবস্থাপনার বিষয়টি বরাবরই দৃশ্যমান। এই ক্ষেত্রে রেলের প্রতি সরকারের এক ধরনের ‘অবহেলা’র বিষয়টি বারবারই সামনে আসছে। এতে রেলের যাত্রী ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নীতিনির্ধারকরা মুখে রেলবান্ধব দাবি করলেও তাদের কাজকর্ম চলছে ঠিক উল্টোদিকে। এতে যাত্রীসেবার মান কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে লোকসানের পরিমাণ বাড়ছে। এভাবে রাষ্ট্রীয় কোনো প্রতিষ্ঠান চলতে পারে না, চলা উচিত নয়।
ইতিহাসের পাঠ থেকে জানা যায়, এক সময় এই উপমহাদেশে যোগাযোগ ব্যবস্থায় নদীপথের গুরুত্ব থাকলেও কালক্রমে রেলপথের আবির্ভাব সমগ্র ভারতবর্ষে ঘটিয়েছে অভাবিত উন্নয়ন। রেলসেবাকে বলা হয়, আধুনিকতার পথে প্রথম পদক্ষেপ। শিল্পায়ন, নগরায়ণ, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও দেশের আর্থ-সামাজিক অচলায়তনের ধারা ভেঙে পুঁজি ও শিল্পনির্ভর সমাজব্যবস্থা বিনির্মাণে রেলপথ পালন করেছে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন রেল কোম্পানি তদানীন্তন ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশে ছোট ছোট রেলপথ সেকশন চালু করতে থাকে। তখন রেলওয়ের শুরু কিংবা সমাপ্তি রেখা নির্ধারণ করা হয় নদীবন্দর কেন্দ্রিক। বাংলাদেশ অঞ্চলে রেলপথের কার্যক্রম শুরু ১৮৬২ সালে। ইস্ট বেঙ্গল রেলওয়ে নামের কোম্পানি ১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থেকে কুষ্টিয়ার জগতি পর্যন্ত প্রথম রেলপথ স্থাপন করে। সেই হিসেবে বাংলাদেশ রেলওয়ের ইতিহাস ১৬৩ বছরের। রেলওয়ের আগে নাম ছিল ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে ও আসাম রেলওয়ে। ভারত ভাগের পর নাম হয় পাকিস্তান ইস্টার্ন রেলওয়ে। বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর রেলওয়ের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় বাংলাদেশ রেলওয়ে। ফলে আমাদের সমাজজীবনেও আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে রেলসেবার সুবাদেই। সময়ের হাত ধরে বাংলাদেশ রেলওয়ে আজ পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল নামে দুটি বিভাগে বিভক্ত। ২০১১ সালের ৪ ডিসেম্বর যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে পৃথক করে নতুন রেলপথ মন্ত্রণালয় গঠন করা হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে ৪৯টি জেলায় রেলপথ নেটওয়ার্ক রয়েছে।
এ কথা সত্য যে, নৌপথ ও রেলপথ যাতায়াতের জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী বলা হলেও বিগত সরকারগুলোর সময়ে এসব খাতে তেমন গুরুত্ব লক্ষ করা যায়নি। বরং তার চেয়ে বেশি আগ্রহ ছিল সড়কপথের দিকে। তারা রেলকে অবহেলা করে বাসকে উৎসাহিত করতো। এতে সারা দেশে কাঁচা-পাকা সড়কের বিস্তৃতি ঘটে। ফলে নৌপথ ও রেলপথের গতিপথগুলো বাধাগ্রস্ত করা হয়। নদীগুলো তার নাব্যতা হারাতে থাকে। এখন দেশের নৌপথ নিদিষ্ট অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ। রেলপথ ক্ষতির শিকার। আর সড়কপথের উন্নয়নের নামে পরিবহন সেক্টরে দুর্নীতি-অনিয়মের ‘স্বর্গরাজ্যে’ পরিণত হয়। এতে জ্বালানি খরচ, সড়ক পরিবহনের আমদানি খরচ, পরিবেশ দূষণ, সড়কে মৃত্যু সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বিগত সরকারের আমলে রেল খাতের উন্নয়নে অপরিকল্পিতভাবে বিপুল অর্থ খরচ করে একের পর এক রেললাইন তৈরি করা হয়েছে। সেভাবে রেলের সমস্যাগুলোর সমাধান করা হয়নি। ফলে রেললাইন নির্মাণের সুফল সেই অর্থে মানুষ পায়নি। এর জ্বলন্ত প্রমাণÑ বগুড়া জেলার সান্তাহার থেকে সোনাতলা পর্যন্ত ৭০ কিলোমিটার মিটারগেজ রেলপথের চিত্র।
১৭ জুলাই প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘৭০ কিমি রেলপথে ৬১ মারণফাঁদ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উল্লিখিত তথ্য। জানা গেছে, এলজিইডি নির্মিত কাঁচা-পাকা সড়কের কারণে গড়ে উঠেছে আরও ৩৬টি অনুমোদনবিহীন লেভেল ক্রসিং। এর বাইরে রেলওয়ের স্বীকৃত ৫১টি বৈধ ক্রসিংয়ের মধ্যে ২৩টিতেও নেই কোনো গেট কিংবা গেটম্যান। এর মধ্যে ৩০টি রেলওয়ের প্রকৌশল শাখার অধীনে। বাকি ২১টি রেলওয়ে ট্রাফিক বিভাগের নিয়ন্ত্রণে। ওইসব লেভেল ক্রসিংয়ের মধ্যে ‘স্পেশাল’ ক্যাটাগরির ৫টিসহ ‘এ’ ও ‘বি’ ক্যাটাগরির মোট ১৮টিতে গেটম্যান রয়েছে। বাকি ৩৩টির মধ্যে ১০টিতে গেটম্যান নেই। এর পাশাপাশি শহর ও গ্রাম এলাকায় পাকা সড়ক সম্প্রসারণের কারণে আরও অন্তত ২১টি স্থানে অনুমোদন ছাড়াই লেভেল ক্রসিং গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে ১৩টির অবস্থান এলজিইডির মালিকানাধীন কাঁচা-পাকা সড়কে। এমন মারণফাঁদের ওপর দিয়েই চলাচল করছে এই অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ।
বগুড়ার সান্তাহার থেকে সোনাতলা রেলপথের স্টেশনগুলো সেখানকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। এসব এলাকার দরিদ্র মানুষেরা ব্যবসা, দিনমজুরিসহ নানা কাজে শহরে যাতায়াতের ক্ষেত্রে স্বল্প খরচের রেলই প্রধান অবলম্বন। প্রতিবেদন মতে, রেলওয়ে ও এলজিইডির রশি টানাটানিতে থমকে আছে এই অনুমোদনহীন লেভেল ক্রসিংগুলো। বগুড়া রেলওয়ের বক্তব্য, যারা অবৈধ লেভেল ক্রসিং তৈরি করেছে, আইন অনুযায়ী তারা টাকা দিলে আমরা সেখানে স্থায়ীভাবে গেট নির্মাণ করে দেব। অন্যদিকে এলজিইডি বলছে, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। ভবিষ্যতে সংস্কার খাত থেকে অর্থ বরাদ্দ সাপেক্ষে বিষয়টি দেখা হবে। ফলে সমস্যা যেই তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই থাকছে। দুই পক্ষের বাহাসের মধ্যে বাধ্য হয়ে ঝুঁকির মুখে যাতায়াত করছে হাজার হাজার মানুষ।
তবে আশার কথা, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর সময় মেনে ট্রেন চলাচলসহ সেবার সার্বিক মান বাড়াতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে রেলের সূচি বিপর্যয় কমিয়ে আনা, টিকিট কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণ, রেলের ব্যয় সংকোচন করে সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়সহ রেলকে লাভজনক পর্যায়ে নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। এখন নির্দেশনাগুলো কতটা বাস্তবায়ন হয়, সেটিই দেখার অপেক্ষা। আমরা আশা করব, একটা সময় রেলযাত্রার প্রতি মানুষের যে আস্থা ছিল, সেটি ফিরে আসবে। সেই পথ ধরে সরকার সান্তাহার-সোনাতলা রেলপথের উল্লিখিত সমস্যাটির দ্রুত সমাধানে ব্যবস্থা নিবেন।