× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

কর্মসংস্থান

বেকারত্ব নিরসনে প্রয়োজন কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ

শেলী সেনগুপ্তা

প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০২৫ ১৬:২০ পিএম

শেলী সেনগুপ্তা

শেলী সেনগুপ্তা

সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ। আর সে মানুষের মৌলিক চাহিদা হলো অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসা। এই  বস্তুগুলো একটির সঙ্গে অন্যটি পরিপূরক। প্রতিনিয়ত এই সব চাহিদা পূরণ করতে হয় এবং এজন্য প্রয়োজন টাকা এবং এই টাকা আয় করার জন্য চাকরি করতে হবে, করতে হবে ব্যবসা অথবা অন্যকিছু। 

আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ তরুণ, এই তরুণদের সবাই কর্মজীবী নয়, অধিকাংশ কর্মক্ষম তরুণ কর্মহীন জীবনযাপন করছে। অথচ এদের মধ্যে অনেকেই উচ্চশিক্ষিত এবং এসব উচ্চশিক্ষিত তরুণের মধ্যে ১২ শতাংশের বেশি তরুণই বেকার। অথচ পরিবারের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করার জন্য একজন সক্ষম ব্যক্তিকে অর্থ উপার্জন করতে হয়, কিন্তু সুযোগ নেই। কোনো পরিবারের শিক্ষিত যুবক যদি বেকার জীবনযাপন করে তাহলে সমগ্র পরিবারের ওপর হতাশার ঝড় নেমে আসে। পরিবারের বেশ কয়েক জন উপার্জনক্ষম মানুষের মধ্যে একজনও যদি বেকার থাকে তাহলেও সবার মৌলিক চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয় না। কারণ চাহিদা পূরণের জন্য দরকার টাকা। অথচ তা হয়ে উঠছে না।

শুধু বাংলাদেশেই নয়, এই সময়ে এসে বিশ্বজুড়ে বেকারত্বের হার বাড়ছে এবং তার মন্দ প্রভাব এসে পড়ছে আমাদের দেশে। তবে আমাদের বেকারত্বের হার অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের চেয়ে দুঃখজনকভাবে অনেক বেশি। আমাদের দেশে প্রায়ই গণমাধ্যমে দেখা যায় উচ্চ শিক্ষিত তরুণের আত্মহত্যার মতো কষ্টকর ঘটনা। এর পেছনের কারণ হলো শিক্ষিত হয়েও প্রতিষ্ঠিত হতে না পারা বা স্বপ্নভঙ্গের যাতনা বহন করতে না পারা। দুঃখজনক হলেও সত্যি, আমাদের দেশের কর্মসংস্থানের অভাব শুধু এখন নয়, আরও আগে থেকেই বেশি। এর মধ্যে নারী বেকার সংখ্যার চেয়ে পুরুষ বেকার সংখ্যা অনেক বেশি। গোদের ওপর বিষফোড়ার মতো নারী কর্মজীবী বা নারী শ্রমিকের মজুরি পুরুষ শ্রমিকের চেয়ে অনেক কম। তাতেও ঠিকভাবে একটি পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ হয় না। 

আমাদের দেশে প্রতিবছর বেকার সংখ্যা বেড়েই চলছে। এ মুহূর্তে বাংলাদেশের প্রথম এবং প্রধান অভিশাপ বেকারত্ব এবং দ্বিতীয়টি দুর্নীতি। এর কারণ হলো আমাদের দেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর অর্ধেকের বেশি বেকার। ফলে শিক্ষিত কিন্তু বেকার নারী ও পুরুষের মধ্যে রয়েছে হতাশা, তারা বিষণ্নতায় নিমজ্জিত হচ্ছে এবং জীবনকে ভালোবাসতে পারছে না। এ সময় কেউ কেউ জীবন ত্যাগ করতেও কুণ্ঠিত হচ্ছে না। এই অবিবেচক কাজের জন্য কত পরিবার যে কত পরিবার ভেঙে যাচ্ছে, কত সন্তান বাবা-মা হারাচ্ছে, কত পিতামাতা হারাচ্ছে সন্তান তার হিসাব নেই। 

পৃথিবীর অন্যান্য দেশে যেখানে শিক্ষিত বেকারের হার কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে, সেখানে আমাদের দেশে হচ্ছে তার উল্টোটাই, আমাদের দেশে ক্রমেই শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। সারা বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ২ কোটি কর্মক্ষম মানুষ দিনে এক ঘণ্টার জন্যও কোনো কাজ খুঁজে পাচ্ছে না এবং তাদের অধিকাংশের নেই শিক্ষার মানদণ্ডের কোনো সনদপত্র। কিন্তু আমাদের দেশের বেকার যুবকদের বেশিরভাগের রয়েছে উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা জনশক্তিতে জনসম্পদে পরিণত করতে পারছে না। কারণ দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ থেকে পড়াশোনা করেও প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাবে বেকার থাকতে হচ্ছে অনেক শিক্ষিত তরুণ এবং তরুণীর। তাই এই সময়ে এসে বলতে পারি প্রযুক্তি ও কারগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ একান্ত জরুরি। বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তির জন্য এটি আবশ্যিক।

চাকরি না পেয়ে কেউ কেউ ব্যবসা করার কথাও ভাবে। কিন্তু সেখানেও রয়েছে নানা সমস্যা। ব্যাংকের উচ্চ হারের সুদ, বৈশ্বিক মন্দা এবং ডলারের দামের অস্থিরতা ব্যবসার ক্ষেত্রে সহায়ক হচ্ছে না। এ কারণেই শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশই বেকার জীবন কাটাচ্ছে। শিক্ষিতদের একটি বড় অংশ বেকার থাকলে দেশের অর্থনীতিকে প্রত্যাশিত উপায়ে উন্নত করা সম্ভব নয়। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয় সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। তা সত্ত্বেও মানসম্মত উচ্চশিক্ষার অভাব, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ কম থাকার কারণে শিক্ষার্থীরা কাজের জন্য দেশের বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করছে। আমাদের দেশ থেকে মেধা বাইরে পাচার হয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বিদেশের মাটিতেও তারা উপযুক্ত কাজ না পেয়ে হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছে। তাই দেশের মেধা দেশে রাখতে এবং বেকারত্ব কমাতে নতুন নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন করতে হবে। তাতে বেকার যুবকরা কাজ করার সুযোগ পাবে। 

শুধু চাকরির বিষয়কে গুরুত্ব দিলে চলবে না। একই সঙ্গে ব্যবসার কথাও ভাবতে হবে। এজন্য ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে সহজ পদ্ধতিতে এবং স্বল্প সুদে। তাতে তরুণ উদ্যোক্তা সৃষ্টির সুযোগ সম্প্রসারিত হবে। শিক্ষিত তরুণ ও তরুণীরা জীবনে কাজ করার জন্য নতুন উদ্যম খুঁজে পাবে। 

তা ছাড়া যারা স্বল্প সময়ের জন্য বেকার তাদের জন্য বেকার ভাতা চালু করার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে।

আমাদের দেশে বেকারদের মধ্যে অধিকাংশই উচ্চ শিক্ষিত। উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী অনেকেই বেকার আছে। এভাবে একটি দেশে শিক্ষিত বেকার বৃদ্ধি পাওয়া মোটেই আশার কথা নয়। তা ছাড়া প্রতিবছর আরও অনেক ডিগ্রিধারী কর্মক্ষম যুবক শিক্ষা সম্পন্ন করে চাকরির বাজারে উপস্থিত হচ্ছে। এত শিক্ষিত মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা সম্ভব নয় ফলে তাদের চাপ দিন দিন বেড়েই যাবে। অথচ এই তরুণ শক্তির জন্য নতুন কিছু করা সম্ভব হলে তারা হয়ে উঠবে দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি এবং তারা তাদের কর্মের মাধ্যমে দেশকে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে। 

দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, আমাদের দেশে যেখানে শিক্ষিত তরুণ সমাজ কাজ পাচ্ছে না, সেখানে দেশের জব মার্কেটে বিদেশিদের প্রাধান্য বৃদ্ধি পাচ্ছে, এটি আমাদের অর্থনীতি কিংবা তরুণ প্রজন্মের জন্য মোটেও ভালো কোনো খবর নয়। 

আমাদের দেশে বিদেশি বিনিয়োগও হচ্ছে প্রচুর। এক্ষেত্রে শর্ত রাখা যায় যে, সেসব প্রতিষ্ঠানে আমাদের শিক্ষিত ও প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন জনগোষ্ঠীকে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা দিয়ে যেন ব্যাপক হারে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাতে বেকারত্ব নিরসন হবে।

বেকারত্ব যেকোনো দেশের জন্য অভিশাপ, শিক্ষিতদের একটি বড় অংশ কর্মহীন থাকলে দেশ এগিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে ক্রমাগত পিছিয়ে যাবে। অর্থনীতির চাকা পর্যায়ক্রমে উল্টো দিকে ঘোরা শুরু করবে, দেশে দারিদ্র্যের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে, জাতির অগ্রগতির পথ কালো মেঘের আড়ালে ঢেকে যাবে। তাই এখনই সময় শিক্ষিত ও বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের দিকে দৃষ্টি দেওয়া। একই সঙ্গে নতুন নতুন সেক্টরের মাধ্যমে শিক্ষিত যুবকদের কাজের সুযোগ করে দিতে হবে, তাদের মেধার পরিচর্যা করতে হবে। তা না হলে শিক্ষিত তরুণরা বিপথগামী হয়ে যেতে পারি। তা ছাড়া আমাদের তরুণদের মেধাকে মূল্যায়ন করতে হবে, যত্ন করতে হবে এবং সঠিক অবস্থানে বিনিয়োগ করতে হবে।

উপযুক্ত পদক্ষেপের মাধ্যমে বর্তমানের শিক্ষিত বেকারত্বের বোঝা অচিরেই হয়ে উঠবে দেশের সম্পদ ও আশীর্বাদ। এজন্য দরকার সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সুদৃষ্টি ও সদিচ্ছা।

  • কলাম লেখক
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা