এনজিও
রোকেয়া ইসলাম
প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০২৫ ১৬:১২ পিএম
রোকেয়া ইসলাম
এনজিওগুলো দেশের দারিদ্র্যবিমোচনে তথা আর্থ-সামাজিক উন্নয়নসহ সকল স্তরের উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। অর্থনৈতিকভাবে উন্নয়নের জন্য তারা ক্ষুদ্রঋণের ব্যবস্থা প্রচলন করেছে, শিক্ষাগতভাবে তারা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা পরিষেবা প্রদান করেছে, স্বাস্থ্য স্তরে তারা বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদান করেছে এবং সুস্বাস্থ্য সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করেছে। বিগত কয়েক দশকে দেশটির উল্লেখযোগ্য রূপান্তর ঘটেছে, যেখানে দারিদ্র্যবিমোচন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং নারীর ক্ষমতায়নের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারি প্রচেষ্টার ঘাটতি পূরণে এনজিওগুলো অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে।
মহান মুক্তিযুদ্ধের যুদ্ধের মাধ্যমে গৌরবোজ্জ্বল স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশের অবকাঠামোসহ আর্থিক ও সামাজিক খাতের নবযাত্রা স্বাভাবিক কারণে সুখকর ছিল না। পূর্ব পাকিস্তানের তথা বাংলাদেশের মানুষের মূলধন ও জনগণের গচ্ছিত আমানত পশ্চিম পাকিস্তানে পাচারসহ যুদ্ধকালীন পাকিস্তানি ব্যাংক ও বীমার মালিকদের দেশত্যাগের ফলে সদ্য জন্ম নেওয়া বাংলাদেশের আর্থিক অবস্থা ছিল অনেকটা মুমূর্ষ। তা ছাড়া ইতিহাস বলে, যেকোনো দেশকেই যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে মহামারি ও দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হতে হয়। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশেও এই দুর্ভিক্ষ ও মহামারি এসেছে, কেড়ে নিয়েছে লাখ লাখ মানুষের প্রাণ।
বাংলাদেশে এনজিওগুলোর ইতিহাস মূলত দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও তার পরবর্তী ’৭৪-পরবর্তী এই কঠিন সময়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ১৯৭৪’র ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের পরেই মানবিক সাহায্য, দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং সামাজিক কল্যাণে কাজ করার জন্য এনজিওগুলো এক গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সরকারি হিসেবে ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষে খাবারের অভাবে মারা যায় ২৭ হাজার মানুষ। বেসরকারি হিসাব বলছে, এই সংখ্যা ৩ থেকে সাড়ে ৪ লাখ। গবেষকদের মতে, এই দুর্ভিক্ষে ১৫ লাখের মতো মানুষের প্রাণ গেছে। আর তা কেবল খাবারের অভাবে! স্বাধীনতা-উত্তর এই সংকটকালীন সময়ে বিদেশি এনজিওগুলো বিশেষ করে অক্সফাম, কেয়ার, কনসার্ন, টেরি দাজ হোমস, সেভ দ্য চিলড্রেন, আরডিআরএস ইত্যাদি যুক্তরাজ্য ও ইউরোপভিত্তিক কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি সার্ভিসেস ওভারসিজসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশে মানবিক সাহায্য যেমনÑ ত্রাণ, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন। দেশীয় এনজিওগুলো মূলত এসব বিদেশি সংস্থাগুলোর আর্থিক সহায়তায় আশির দশকে বিস্তার লাভ করতে থাকে। এগুলোর মধ্যে গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাক, প্রশিকা, গণসাহায্য সংস্থা, গণস্বাস্থ্য, ভার্ক, বিভিএইচএসএস-এর মতো সংস্থাগুলো বাংলাদেশের দারিদ্র্যবিমোচনে ব্যাপক আকারে কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল এবং আজও করে যাচ্ছে।
গত শতাব্দীর আশি ও নব্বইয়ের দশকে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় এনজিওগুলোর দ্রুত বিকাশের কারণে বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি গ্রামে দুর্দশাগ্রস্ত ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্যবিমোচনের জন্য এনজিও কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। সরকারি বিনিয়োগ সংস্থাগুলোর ঋণ পাওয়া দরিদ্রদের জন্য সহজ ছিল না। ফলে এনজিওগুলোর সহজ শর্তে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম সাধারণদের মাঝে ব্যাপকভাবে বিকাশ ঘটায় অতি দরিদ্র জনগণ ক্রমান্বয়ে তাদের দারিদ্র্যের মাত্রা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়। বলাবাহুল্য, মূলত ক্ষুদ্রঋণের কারণে এনজিও কার্যক্রমের ব্যাপকতা লাভ করেছে এবং দেশের দারিদ্র্যবিমোচনসহ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সহায়ক হয়েছে। সেই সময় প্রতিটি এনজিওর সেবা প্রদানের জন্য অভীষ্ট লক্ষ্য ছিল হতদরিদ্র বা দরিদ্র জনগোষ্ঠী। আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেশের পিছিয়ে পড়া জনগণ অধ্যুষিত এলাকায় সাধারণত এনজিওগুলো কর্মসূচি গ্রহণ করত। এসব কর্মসূচির ভিত্তিতে কোনো কোনো এলাকাকে এনজিও পল্লী হিসেবেও আখ্যায়িত করা হতো।
একসময় উত্তরবঙ্গের বৃহত্তর রংপুর বিভাগের ১০টি জেলার মধ্যে ৫টিই অত্যন্ত দারিদ্র্যপীড়িত ছিল। জেলাগুলো হলোÑ কুড়িগ্রাম, রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা ও লালমনিরহাট। বিভিন্ন জরিপ প্রতিবেদনের মতে, অধিকাংশই কৃষি শ্রমিক হওয়ায় আশ্বিন-কার্তিক মাস এলেই হাজার হাজার পরিবার কাজের অভাবে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হতো। এই কারণেই মূলত উত্তরবঙ্গকে মঙ্গা এলাকা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। মঙ্গার সময় ১০০ জনের মধ্যে ৭১ জনই ছিল দারিদ্র্যপীড়িত। ২০১০ সালের পর থেকে উত্তরবঙ্গের এই মঙ্গার কথা আর ততটা শোনা যায়নি এবং ২০১৬ সালের পর থেকে এটি একেবারেই শোনা যায়নি। কারণ দেশি-বিদেশি এনজিওগুলোর সহজ ও কৌশলগত সহযোগিতা এবং এনজিওগুলোর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম ‘ক্ষুদ্রঋণ’ এই অঞ্চলের মঙ্গা দূরীকরণে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিল। রংপুরের আরডিআরএস, ব্র্যাক, গ্রামীণ ব্যাংক, প্রশিকা এবং আশা-এর মতো সংস্থাগুলো ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি, যা বিশেষত নারীদের অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতায়িত করেছে এবং ব্যক্তিগতভাবে মানুষকে দারিদ্র্যের চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করেছে।
আশির দশক থেকে এনজিওগুলো ত্রাণ, পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন থেকে বের হয়ে জনগণের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য বহুমুখী কর্মসূচি গ্রহণ করে যেমনÑ অনানুষ্ঠানিক সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ, অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা (শিশু ও বয়স্ক), প্রাথমিক স্বাস্থ্য ও পুষ্টি, গৃহায়ন, ক্ষুদ্রঋণ, হাঁস-মুরগি-গবাদিপশু পালন, মৎস্য চাষ, কৃষি উন্নয়ন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা গঠন, নারীর ক্ষমতায়ন, ক্ষুদ্র ব্যবসা, গৃহায়ন, পরিবেশ সুরক্ষা, অবকাঠামো উন্নয়ন, ইত্যাদি অনেক উদ্ভাবনী কর্মসূচি বাস্তবায়িত করতে শুরু করে। ফলে গ্রামীণ পর্যায়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে টাকার গতিশীলতা বৃদ্ধি, ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি, নারীর ক্ষমতায়ন, কর্মসংস্থানের বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার নানা পথ অনুসন্ধান করার সুযোগ ইত্যাদির সুযোগ সৃষ্টি হয়। তখন কোনো কোনো এলাকায় এনজিওকর্মীদের আনাগোনায় সারাদিনই মোটরসাইকেলের ঝনঝনানি, মানুষের কলতান ও উচ্ছ্বাস লক্ষ করা যেত।
শুরু থেকেই এনজিওগুলো কাজ করেছে এমন এক সমাজে যেখানে লিঙ্গবৈষম্য গভীরভাবে প্রোথিত ছিল এবং এজন্য তারা নারীর অধিকার প্রচার, সম্পদে তাদের প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য কাজ করেছে এবং করছে। ক্ষুদ্রঋণ, শিক্ষা এবং আইনি সহায়তা দেওয়ার মাধ্যমে এনজিওগুলো নারীদের তাদের জীবনে বেশি নিয়ন্ত্রণ অর্জন করতে এবং তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সহায়তা করেছে। নারীর ক্ষমতায়ন সামগ্রিক সামাজিক উন্নয়নে একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। কারণ ক্ষমতায়িত নারী তাদের দারিদ্র্যবিমোচন, সন্তানদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামগ্রিক কল্যাণে বেশি বিনিয়োগ করতে প্রস্তুত থাকে, যা উন্নয়নের একটি ইতিবাচক চক্র তৈরি করে।
দারিদ্র্য দূরীকরণের আরেকটি প্রধান বাধা বাংলাদেশের শিক্ষার ক্ষেত্র। সরকার এককভাবে পুরো জনগোষ্ঠীর শিক্ষার চাহিদা পূরণ করতে পারেনি, বিশেষ করে গ্রামীণ ও দূরবর্তী এলাকায়। এনজিওগুলো স্কুল প্রতিষ্ঠা, বৃত্তি প্রদান এবং নতুন শিক্ষামূলক কর্মসূচি চালু করে এই ঘাটতি পূরণ করেছে। স্বাস্থ্য খাতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলো মা ও শিশু স্বাস্থ্যের জন্য বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। হান্ড্রেড পার্সেন্ট স্যানিটেশন বা স্যানিটারি ল্যাট্রিন প্রতিস্থাপনের কনসেপ্টটি এনজিও থেকেই শুরু হয়েছিল। দরিদ্রতার একটি প্রধান সমস্যা ছিল বেকার সমস্যা। আর এটি সমাধানের জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যথেষ্ট ছিল না বা এখনও নেই। এনজিও সেক্টরের একটি বড় ভূমিকা ছিল শিক্ষিত বেকারদের কমসংস্থানের ব্যবস্থা করার।
সাধারণত সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিবন্ধনকৃত অরাজনৈতিক, অলাভজনক ও সামাজিক সেবামূলক প্রতিষ্ঠানকে বলা হয় নন-গভর্নমেন্ট অর্গানাইজেশন (এনজিও) বা বাংলায় বেসরকারি সংস্থা। এ ছাড়া স্টক একচেঞ্জের নিবন্ধনকৃত ফাউন্ডেশনও এনজিওর অন্তর্ভুক্ত। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের মানুষের দুঃখদুর্দশা লাঘব করার জন্য এনজিওগুলোর বিকাশ ও কার্যক্রম সারা দেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে যাওয়ার কারণে সরকারের সমান্তরাল একটি জনসেবার স্রোত তৈরি হয় এবং এই স্রোতেই বেশিরভাগ দারিদ্র্র্য ভেসে যায় বাংলাদেশের।
তবে এনজিওগুলো বর্তমানে নানাবিধ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। যার মধ্যে বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা, জবাবদিহিতার সমস্যা এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতি ও পরিবেশের সমস্যা অন্যতম। এনজিওগুলোকে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখতে এবং বাড়াতে, পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে, শক্তিশালী অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে হবে এবং বাংলাদেশের সবচেয়ে দুর্বল জনগোষ্ঠীর অধিকার ও কল্যাণের পক্ষে কাজ চালিয়ে নেওয়ার জন্য একটি অত্যন্ত শক্ত মনোবল সম্পন্ন ও দক্ষ নেতৃত্ব থাকতে হবে, যা দেশটিকে আরও উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নেবে এবং এই অগ্রগতি যাতে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই হয় তা নিশ্চিত করতে এনজিওগুলোর ভূমিকা অপরিহার্য থাকবে মর্মে সরকারকে একটি বিশেষ ভূমিকা রাখতে হবে।