রোহিঙ্গা শরণার্থী
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২২ জুন ২০২৫ ১৬:৪৩ পিএম
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তনিও গুতেরেস বলেছেন, ‘উন্নয়নশীল দেশগুলোই সাধারণত শরণার্থীদের সবচেয়ে বেশি বোঝা বহন করে। এটি উদ্বেগজনক পরিস্থিতি, যা মানবিক সহায়তা এবং টেকসই সমাধানের অভাব নির্দেশ করে।’ শুক্রবার বিশ্ব শরণার্থী দিবস উপলক্ষে তিনি এ মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেছেন, ‘প্রত্যেক শরণার্থীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একেকটি গভীর বেদনার গল্প। উচ্ছেদ হওয়া পরিবার ও ভেঙে যাওয়া ভবিষ্যতের গল্প। সুযোগ পেলে তারাও অর্থনীতিকে শক্তিশালী, সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি ও সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।’ বক্তব্যে তিনি যুদ্ধ, নিপীড়ন ও দুর্যোগের কারণে শরণার্থী হওয়া লাখো মানুষের প্রতি সম্মান জানান। জাতিসংঘের মহাসচিবের এই সাহসী উচ্চারণের জন্য সাধুবাদ জানাই। পরিসংখ্যান বলছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রায় ৭৩% শরণার্থী আশ্রিত, যেখানে উন্নত দেশগুলোতে এই হার অনেক কম। এই পরিস্থিতিতে শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া দেশগুলোতে চাপ বাড়ছে, অর্থনৈতিক সংকট বাড়ছে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ, আমাদের অসংখ্য সমস্যার মধ্যে ‘রোহিঙ্গা শরণার্থী’ আজ আমাদের বড় ধরনের সমস্যা। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে মানবিক বিবেচনায় আশ্রয় দিয়ে আসছে। বিশ্ববাসী বাংলাদেশের এই মানবিক মূল্যবোধের পক্ষে সায় দিলেও রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে যথাযথ উদ্যোগ কেউ নেয়নি। মিয়ানমারের প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে। পাশাপাশি তারা বিভিন্ন অপরাধ ও অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ছে। কারও কারও বিরুদ্ধে বাংলাদেশি পাসপোর্ট জোগাড় করে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ রয়েছে। বলা চলে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা আমাদের নিরাপত্তার জন্যও হুমকি। যে সমস্যাটি মিয়ানমার তৈরি করেছিল, এর সমাধান অবশ্যই মিয়ানমারকেই করা উচিত। বিষয়টি বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ‘আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার ওপর দারিদ্র্য, উন্নয়ন ঘাটতি ও সংঘাতের প্রভাব’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় তুলে ধরেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান না হলে দ্রুতই এই সংকট আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকির কারণ হতে পারে। ২১ জুন প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ আলাদা দুটি প্রতিবেদনে এই বিষয়টি উঠে এসেছে।
উল্লেখ করা প্রয়োজন, বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বসবাস দীর্ঘদিনের। তবে ১৯৮২ সালে মিয়ানমারের নাগরিক আইন প্রণীত হওয়ার পর থেকে রোহিঙ্গারা নাগরিকত্ব সংকটে পড়েছে। সেই থেকে ধাপে ধাপে এদেশে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ ঘটে। তবে ২০১৭ সালে অমানবিক সহিংসতায় কয়েক লাখ রোহিঙ্গা একসঙ্গে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এদের ‘শরণার্থী’ হিসেবে বিবেচনা করেনি। যদিও সরকার তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বিষয়টির কোনো অগ্রগতি এখনও মেলেনি। ফলে তাদের দুর্দশা ক্রমেই বেড়ে চলছে। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিবছর শরণার্থীশিবিরে জন্ম নিচ্ছে ৩০ হাজার শিশু। শিশুরা বড় হচ্ছে জাতিগতভাবে পরিচিতির সংকট নিয়ে। এমন লাখ লাখ শিশু কোনো ধরনের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই বড় হচ্ছে। না পাচ্ছে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা, না দেখছে আগামীর কোনো সুন্দর স্বপ্ন। রোহিঙ্গা সংকটকে আরও জটিল করে তোলার পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে রাখাইনে আরাকান আর্মির দখল ও মিয়ানমারের মিলিটারি জান্তার সঙ্গে যুদ্ধাবস্থা। ফলে রাখাইনে বসবাস করছেন এমন রোহিঙ্গারাও জীবন বাঁচাতে নিজ দেশ ছেড়ে বাংলাদেশে আসতে বাধ্য হচ্ছে। যা কার্যত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সমস্যা সমাধানকে আরও জটিল ও দীর্ঘায়িত করে তুলছে।
অতীতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে নানা উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। এমনকি ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ছয় ধাপে রোহিঙ্গাদের তালিকাও মিয়ানমারের কাছ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবারই প্রতিশ্রুতি আদায় ছাড়া কোনো ফল আসেনি। এ ছাড়া দ্বিপক্ষীয়, বহুপক্ষীয় আলোচনা ও সমঝোতার চেষ্টা হয়েছে একাধিবার। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের উদ্যোগে সম্প্রতি জাতিসংঘের মহাসচিব বাংলাদেশে এসে রোহিঙ্গাদের দুরবস্থা প্রত্যক্ষ করেছেন। তিনি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে আশাব্যঞ্জক বাণী দিয়ে গেছেন। অতি সম্প্রতি ব্যাংককে বিমসটেকের সম্মেলনে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে প্রত্যাবর্তনের প্রসঙ্গটি এসেছিল। কিন্তু তার পরও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে কোনো বাস্তব অগ্রগতি লক্ষ করা যায়নি। এদিকে প্রত্যাবাসন দেরি হওয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে সন্ত্রাস ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বেড়েই চলছে। তাদের দ্রুত প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। এমনিতেই দাতা সংস্থা ও দেশগুলোর রোহিঙ্গাদের সাহায্যের পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছে, আগামীতে আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আগেই প্রত্যাবাসনে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হোক। জাতিসংঘ মহাসচিব বলেছেন, কেউই শরণার্থী হতে চায় না। আসুন আমরা সংহতির পক্ষে দাঁড়াই। সাহসের পক্ষে দাঁড়াই। মানবতার পক্ষে দাঁড়াই। আমরাও তার সঙ্গে একমত হয়ে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে পূর্ণ নিরাপত্তা ও অধিকারের সঙ্গে প্রত্যাবাসনের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাই।