বাজেট ভাবনা
ড. মিহির কুমার রায়
প্রকাশ : ১৫ জুন ২০২৫ ১৬:১২ পিএম
ড. মিহির কুমার রায়
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপে বলা হয়েছে, দেশে এক বছরের ব্যবধানে বেকারের সংখ্যা বেড়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার। একই সঙ্গে কমেছে কর্মক্ষম ও কর্মে নিয়োজিত জনগোষ্ঠী। বর্তমানে দেশে বেকার ২৭ লাখ ৩০ হাজার। চলতি অর্থবছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে বেকারত্বের হার বেড়ে ৪ দশমিক ৬৩ শতাংশে পৌঁছেছে। গত বছরের একই সময়ে এ হার ছিল ৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ। ১৩তম আইসিএলএসে ডিসেম্বর শেষে দেশে বেকারত্বের হার ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ। আগের বছরের একই সময়ে এ হার ছিল ৩ দশমিক ২০ শতাংশ। প্রকাশিত জরিপ অনুযায়ী, ২৬ লাখের মধ্যে দেশে পুরুষ বেকারের সংখ্যা ১৮ লাখ আর নারী ৮ লাখ ২০ হাজার জন। বর্তমানে দেশে বেকারত্বের হার ৩.৬৫ শতাংশ। পুরুষ বেকারের হার দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং নারী বেকারের হার ৩ দশমিক ৪৬ শতাংশ। কৃষি, সেবা ও শিল্পÑ সব খাতেই কমেছে কর্মে নিয়োজিত জনগোষ্ঠী। নারীর চেয়ে উল্লেখযোগ্য হারে পুরুষ বেকারের সংখ্যা বেড়েছে বেশি। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩ সালের তুলনায় দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী কমেছে ১৭ লাখ ২০ হাজার। ২০২৩ সালে যেখানে এই সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার, ২০২৪ সালে তা নেমে এসেছে ৭ কোটি ১৭ লাখ ৩০ হাজারে। কমেছে যুব শ্রমশক্তিও। ২০২৩ সালে দেশে যুব শ্রমশক্তি ছিল ২ কোটি ৬৭ লাখ জন, ২০২৪ সালে তা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ২৬ লাখে। বর্তমানে কর্মে নিয়োজিত গোষ্ঠীর সংখ্যা ৬ কোটি ৯১ লাখ ১০ হাজার জন, যা ২০২৩ সালে ছিল ৭ কোটি ৯ লাখ ৮০ হাজার জন। অর্থাৎ এক বছরে কাজ হারিয়েছে অন্তত ১৮ লাখ ৭০ হাজার মানুষ। অন্যদিকে, শ্রমশক্তির বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ২০২৩ সালে ছিল ৪ কোটি ৭১ লাখ ৭০ হাজার, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ৫০ হাজারে। বিষয়টা উদ্বেগজনক এই কারণে, বেকারত্বের রাজনৈতিক ও সামাজিক অভিঘাত কারও জন্য সুখকর নয়। বৈধ আয়ের পন্থা না পেলে অনেকে জীবিকা নির্বাহে ক্ষেত্রবিশেষে নীতি-নৈতিকতাও বিসর্জন দিতে দ্বিধা করেন না।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সংজ্ঞা অনুযায়ী, যারা গত সাত দিনে এক ঘণ্টাও মজুরির বিনিময়ে কাজ পায়নি এবং এক মাস ধরে সক্রিয়ভাবে কাজ খুঁজেছে, কিন্তু পায়নিÑ তাদেরই বেকার হিসেবে গণনা করা হয়। চলতি বছর বিবিএস প্রথমবারের মতো আইএলওর ১৩তম ও ১৯তম আইসিএলএস (পরিসংখ্যানবিদদের আন্তর্জাতিক সম্মেলন) অনুযায়ী পৃথকভাবে ফলাফল প্রকাশ করেছে। এই প্রেক্ষাপটে বাজেটে আগামী অর্থবছরে (২০২৫-২৬) ‘তারুণ্যের উৎসব’ উদযাপনের জন্য ১০০ কোটি টাকা বাজেটবরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে । বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশই তরুণ, যারা দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। উন্নত বিশ্বে বাজেট পরিকল্পনায় তরুণদের সবচেয়ে বড় চাহিদা হিসেবে বিবেচিত হয় শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন। উদাহরণস্বরূপ, জার্মানি ও ফিনল্যান্ড বাজেটে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ অর্থ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করে। উন্নত বিশ্বে সরকারগুলো বাজেটের মাধ্যমে চাকরির সুযোগ সৃষ্টি এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচি হাতে নেয়। বাংলাদেশ সরকার এই প্রথমবারের মতো এ ধরনের একটি প্রশংসিত উদ্যোগ হাতে নিয়েছে।
সম্প্রতি জাতীয় বাজেট ও পরিকল্পনা বিষয়ক সামাজিক প্লাটফর্ম ডেমোক্রেটিক বাজেট মুভমেন্ট (ডিবিএম) পরিচালিত একটি অংশগ্রহণমূলক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ৬০ শতাংশ প্রকল্পে সরাসরি তরুণদের সংশ্লিষ্টতা নেই। ৯টি জেলার তরুণদের ওপর পারসেপশন স্টাডিতে দেখা যায়, প্রান্তিক তরুণসহ তরুণ নারী, ক্ষুদ্র জাতিসত্তার তরুণ, তরুণ প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের তরুণরা জাতীয় পরিকল্পনা, বাজেট প্রক্রিয়া ও প্রণোদনায় প্রায় অনুপস্থিত। গবেষণার অংশ হিসেবে জেলা পর্যায়ের গণশুনানিতে তরুণরা অভিযোগ করে, জাতীয় বাজেট পরিকল্পনায় তারুণ্যের নেতৃত্ব, তাদের জন্য কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন, মানসিক স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি ও পরিবেশ বিষয়গুলোকে কোনো অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি। গবেষণায় উঠে আসে, তারুণ্যের বাজেটের সফল বাস্তবায়নে নানামুখী কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে, যা শুধু বাজেট বরাদ্দের পরিমাণ নয়, বরং এর গুণগত কার্যকারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তরুণদের সম্ভাবনা ও প্রয়োজন বিবেচনায় এনে এই বাধাগুলো চিহ্নিত করা জরুরি। বাংলাদেশে এখনও ইয়ুথ ডিস-অ্যাগ্রিগেটেড ডেটা বা তরুণদের বয়স, লিঙ্গ, এলাকা, প্রতিবন্ধিতা বা শিক্ষা অনুসারে পৃথক উপাত্ত সংরক্ষণের ব্যবস্থা যথাযথভাবে গড়ে ওঠেনি। এর ফলে প্রকৃত প্রয়োজনের ভিত্তিতে বরাদ্দ নির্ধারণ অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং অনেক সময়ই প্রকল্পগুলো প্রাসঙ্গিকতা হারায়। যেমনÑ ডিজিটাল প্রশিক্ষণের বাজেট শহুরে তরুণদের জন্য প্রণীত হলেও তা গ্রামীণ তরুণদের বাস্তবতায় সাড়া দেয় না। স্থানীয় প্রশাসন ও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের অনেক কর্মকর্তা ইয়ুথ সেনসেটিভ বাজেটিং সম্পর্কে প্রশিক্ষিত নন। এতে তারুণ্যের বাজেটের প্রণয়ন ও কার্যকর বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা দেখা দেয়, বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে। তরুণ প্রজন্ম সাধারণত পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। তাই উন্নত বিশ্ব তরুণদের আগ্রহকে গুরুত্ব দিয়ে বাজেটে সবুজ অর্থনীতি, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং টেকসই উন্নয়ন খাতে বড় আকারে বিনিয়োগ করে।
সম্প্রতি জাতীয় বাজেট ও পরিকল্পনা বিষয়ক সামাজিক প্লাটফর্ম ডেমোক্রেটিক বাজেট মুভমেন্ট (ডিবিএম) পরিচালিত একটি অংশগ্রহণমূলক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ৬০ শতাংশ প্রকল্পে সরাসরি তরুণদের সংশ্লিষ্টতা নেই। ৯টি জেলার তরুণদের ওপর পারসেপশন স্টাডিতে দেখা যায়, প্রান্তিক তরুণসহ তরুণ নারী, ক্ষুদ্র জাতিসত্তার তরুণ, তরুণ প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের তরুণরা জাতীয় পরিকল্পনা, বাজেট প্রক্রিয়া ও প্রণোদনায় প্রায় অনুপস্থিত। গবেষণার অংশ হিসেবে জেলা পর্যায়ের গণশুনানিতে তরুণরা অভিযোগ করে, জাতীয় বাজেট পরিকল্পনায় তারুণ্যের নেতৃত্ব, তাদের জন্য কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন, মানসিক স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি ও পরিবেশ বিষয়গুলোকে কোনো অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি। গবেষণায় উঠে আসে, তারুণ্যের বাজেটের সফল বাস্তবায়নে নানামুখী কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে, যা শুধু বাজেট বরাদ্দের পরিমাণ নয়, বরং এর গুণগত কার্যকারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তরুণদের সম্ভাবনা ও প্রয়োজন বিবেচনায় এনে এই বাধাগুলো চিহ্নিত করা জরুরি। বাংলাদেশে এখনও ইয়ুথ ডিস-অ্যাগ্রিগেটেড ডেটা বা তরুণদের বয়স, লিঙ্গ, এলাকা, প্রতিবন্ধিতা বা শিক্ষা অনুসারে পৃথক উপাত্ত সংরক্ষণের ব্যবস্থা যথাযথভাবে গড়ে ওঠেনি। এর ফলে প্রকৃত প্রয়োজনের ভিত্তিতে বরাদ্দ নির্ধারণ অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং অনেক সময়ই প্রকল্পগুলো প্রাসঙ্গিকতা হারায়। যেমনÑ ডিজিটাল প্রশিক্ষণের বাজেট শহুরে তরুণদের জন্য প্রণীত হলেও তা গ্রামীণ তরুণদের বাস্তবতায় সাড়া দেয় না। স্থানীয় প্রশাসন ও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের অনেক কর্মকর্তা ইয়ুথ সেনসেটিভ বাজেটিং সম্পর্কে প্রশিক্ষিত নন। এতে তারুণ্যের বাজেটের প্রণয়ন ও কার্যকর বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা দেখা দেয়, বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে।
বাংলাদেশে ৯০ দশক থেকে প্রবৃদ্ধির হার বাড়তে শুরু করলেও তরুণদের কর্মসংস্থানের দিকে কোনো সরকারই নজর দেয়নি। শুরুতে শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি ঘটেছে মূলত শ্রমঘন তৈরি পোশাক খাতের ওপর ভর করে। তবে কালক্রমে তুলনামূলক কম শ্রমঘন নিট পোশাকের হিস্যা বেড়েছে, তাতে তরুণদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার কমতে শুরু করে। সঙ্গে এসেছে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন। প্রায় এক দশক ধরে পোশাক খাতের তরুণদের মোট কর্মসংস্থান তেমন বাড়েনি। এমনকি বিজিএমইএর ওয়েবসাইটে কর্মসংস্থানের উপাত্তও আর পাওয়া যায় না। দেশের অর্থনীতি বিশেষ করে, রপ্তানি একটি মাত্র শিল্পের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হওয়ায় গবেষক-বিশ্লেষকরা বহুবার শিল্পের বৈচিত্র্যকরণের কথা বললেও নীতিকৌশল পর্যায়ে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফল যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। এখন রপ্তানি বাড়লেও শিল্প খাতের কর্মসংস্থান প্রায় স্থবির। তার ওপর দুই বছর ধরে অর্থনীতি ভুগছে উচ্চ মূল্যস্ফীতির অভিঘাতে। সেই জন্য বর্তমান সরকারের নীতিনির্ধারকরা প্রয়োগ করছেন সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির মতো গতানুগতিক অর্থনীতিতে দেখা দেয় নিম্নগতি।
প্রবৃদ্ধির খুব ক্ষতি না করে কীভাবে মূল্যস্ফীতির লাগাম টানা যায়, সে ব্যবস্থাপনা সহজ নয়। সেখানেই চ্যালেঞ্জ নীতিনির্ধারকদের। এ চ্যালেঞ্জ সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা না করতে পারলে কী হয়, তা বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থায় বেশ পরিষ্কার। এখন জরুরি হলো, অর্থনীতির চাকা সচল করে প্রবৃদ্ধির পথে হাঁটা। প্রবৃদ্ধি হলেও তা যেন কর্মসংস্থানহীন না হয়, সেদিকে দৃষ্টি দেওয়া। তার জন্য প্রয়োজন হবে কৃষি, রেমিট্যান্স আর পোশাক রপ্তানিভিত্তিক কাজের রূপান্তর ঘটানো। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি এ ধরনের আরও কয়েকটি শ্রমঘন শিল্প গড়ে তুলতে পারলে শ্রমবাজারের চাকা সচল হবে। তার সঙ্গে দৃষ্টি দিতে হবে হতাশ মানুষকে শ্রমবাজারে ফিরিয়ে শ্রমশক্তি বাড়ানো এবং নারী ও যুবকদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর মতো চ্যালেঞ্জগুলোর দিকে।