অর্থনীতি
ড. মো. আইনুল ইসলাম
প্রকাশ : ১২ জুন ২০২৫ ১৫:৫৯ পিএম
ড. মো. আইনুল ইসলাম
মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা। এ উৎসব কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমাজ ও রাষ্ট্রজীবন, এমনকি জাতীয় ও বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গেও এর গভীর যোগসূত্র রয়েছে। প্রতিবছর এই ঈদ উপলক্ষে গরু, ছাগল, উট, দুম্বা প্রভৃতি গৃহপালিত পশু কোরবানি করা হয়। ধর্মীয় অনুশাসন অনুযায়ী, মানুষ এই কোরবানির মাধ্যমে ত্যাগের মহিমা প্রদর্শন করে এবং কোরবানিকৃত পশুর মাংস সমাজের দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া মানুষের মাঝে বণ্টন করে। এতে করে সমাজের একটি বৃহৎ অংশের পুষ্টি ঘাটতি সাময়িকভাবে হলেও কিছুটা পূরণ হয়। পাশাপাশি কোরবানিকৃত পশুর চামড়া বিক্রির মাধ্যমে দেশের শিল্প খাত ও বৈদেশিক বাণিজ্যে বিশেষ অবদান রাখে, যা আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচিত। ঈদুল আজহার পারিবারিক উল্লাস ও ধর্মীয় ত্যাগের মধ্য দিয়ে সমাজের দরিদ্র-দুস্থদের খাদ্য নিরাপত্তা কিছুটা হলেও নিশ্চিত হয়, আর এ সময়ে উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে ক্রমশ বাড়ে চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা। এ কারণে বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানিমুখী খাত হিসেবে চামড়া শিল্প দেশি ও বৈদেশিক বাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে।
তারপরও প্রতিবছর দুই ঈদের সময়ে যানবাহনে ভ্রমণরত মানুষের দুর্ঘটনায় মৃত্যু এবং কোরবানিকৃত পশুর চামড়ার বাজারে মূল্যধস ও কারসাজি এক অনিবার্য বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই ঈদপরবর্তী কয়েক দিনের গণমাধ্যমে আগের বছরের চেয়ে আরও কম মূল্যে চামড়া বিক্রির হতাশাজনক চিত্র ফুটে উঠছে। অথচ ত্যাগের মহিমা শিক্ষা দেওয়া কোরবানিকৃত পশুর চামড়ার মূল্য নিয়ে চলমান এই নৈরাজ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দারিদ্র্যসীমার অনেক নিচে বসবাসকারী এতিম, গরিব, মিসকিন, ইলমে দ্বীনের গরিব শিক্ষার্থী এবং চামড়া শিল্পের নিম্নস্তরের শ্রমজীবী মানুষ। সামগ্রিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও বৈদেশিক বাণিজ্য উভয়ই।
বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের সূচনা ঘটেছিল চল্লিশের দশকে নারায়ণগঞ্জে প্রথম ট্যানারি স্থাপনের মধ্য দিয়ে। এরপর ক্রমে ‘লেদার সিটি’ হিসেবে বিশ্ববাজারে পরিচিত হয় সাভারের শিল্প এলাকা। চামড়া দিয়ে বিভিন্ন পণ্য দ্রব্য তৈরি করা হয়, যা দেশের বাজারে যেমন বহুল প্রচলিত, তেমনি বিদেশেও চামড়াজাত এসব পণ্যের বেশ খ্যাতি আছে। ব্যাগ, জুতা ও বিভিন্ন পরিধেয় সামগ্রী তৈরিতে চামড়ার কোনো বিকল্প নেই। চামড়ার তৈরি জিনিসপত্র বেশ চড়া দামেই বিক্রয় হয় দেশ-বিদেশে। প্রতিবছর এই খাত থেকে রপ্তানির পরিমাণে ওঠানামা থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য সংকোচন দেখা গেছে। জুলাই-অক্টোবরের সময়ে ২০২১-২২ অর্থবছরে মাত্র চার মাসেই ৩৬.৫০ কোটি ডলার রপ্তানি আয় হলেও পরবর্তী কয়েক বছরে সামগ্রিক রপ্তানিতে উত্থান-পাতনের ধারা স্পষ্ট।
২০২৩-২৪ সালের প্রথম আট মাসে (জুলাই ২০২৩-মার্চ ২০২৪) চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি আয় দাঁড়ায় ৮৫২.০১ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৯.৯ শতাংশ বেড়েছে। এর মধ্যে চামড়ার তৈরি জুতা ব্যবসা প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি, মোট রপ্তানির প্রায় ৫৮ শতাংশ ভাগ দখল করেছে। কিন্তু চামড়া সিন্ডিকেটের কারণে কাঁচা চামড়ার সঠিক মূল্য না পেয়ে চরম সংকটের সম্মুখীন হন কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রির অর্থের প্রকৃত হকদাররা। সরকার কোরবানির পশু চামড়ার জন্য প্রতিকেজি মূল্য নির্ধারণ করলেও মাঠপর্যায়ে দাম মেনে ক্রয়-বিক্রয় হয় না। ২০২৪ সালের ঈদে সরকারি সুপারিশকৃত ছাগলের চামড়ার দাম ছিল ফুটপ্রতি ৫৫ টাকা, কিন্তু মাঠপর্যায়ে তা ৮-২০ টাকার মধ্যেই বিক্রি হয়েছে। এবারও গরুর চামড়া সরকারি মূল্য নির্ধারিত হলেও অনেকেই নামমাত্র টাকায় বিক্রি করেছেন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কোরবানিদাতা এবং চামড়ার মূল্যের প্রকৃত হকদাররা বিশেষ করে নিম্ন আয়ের গরিব পরিবার। অনেকেই প্রত্যাশিত মূল্য না পেয়ে চামড়া দান করেছেন মাদ্রাসা, এতিমখানা ও স্থানীয় গরিবদের মাঝে, আবার কেউ কেউ রাস্তার ধারে ফেলে দিয়েও প্রতিবাদ করেছেন। চট্টগ্রামে একপর্যায়ে প্রায় ১ লাখ পিস চামড়া সিটি করপোরেশনের ট্রাকে তুলে পুঁতে ফেলতে হয়েছে, সিলেটে ফেলে দেওয়া ২০ ট্রাক চামড়া পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সরিয়ে ফেলতে হয়েছে, ফতুল্লায়ও কয়েক হাজার পিস চামড়া রাস্তায় ডাম্পিং হয়েছে। এই দৃশ্য নিঃসন্দেহে নির্মম, কারণ পোড়া-নষ্ট চামড়া পরিবেশ দূষণ বাড়ানোর পাশাপাশি সম্পদ নষ্টের চরম নিদর্শন।
কোরবানির ঈদের সময়ে সংগৃহীত বিপুল পরিমাণ চামড়া জাতীয় অর্থনীতির জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। কিন্তু হতাশার বিষয় হচ্ছে প্রতিবছর পর্যাপ্ত পরিমাণ চামড়ার জোগান থাকলেও চামড়ার বিক্রয়কারী ও কোরবানির চামড়া বিক্রি থেকে অর্জিত অর্থের প্রকৃত হকদাররা ন্যায্যমূল্য পান না। সর্বোপরি বিকশিত হতেও পারছে না অত্যন্ত সম্ভাবনাময় চামড়া শিল্প। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির জন্য দায়ী মূলত দুই পক্ষের সিন্ডিকেট। একদিকে রয়েছে মাঠপর্যায়ের আড়তদার সিন্ডিকেট এবং অন্যদিকে ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেট। কোরবানি ঈদের পর আয় খরচের হিসাব মিলিয়ে পর্যাপ্ত মুনাফা না থাকায় ট্যানারি মালিকেরা লবণযুক্ত চামড়া ক্রয় করতে বিলম্ব করেন। আড়তদাররা সে সুযোগে মাঠপর্যায়ে চামড়া কেনা বন্ধ করে দেয়, যাতে সারা বছর চামড়ার দাম নির্ধারণ না করতে হয়। এর ফলে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা সংকটে পড়ে, কোরবানিদাতারা ন্যায্যমূল্য না পেয়ে হতাশ হয়, আর গরিব ও এতিমরা বঞ্চিত হয় চামড়া বিক্রির আয়ের অর্থ থেকে। আবার লবণের দামের শিল্পীদের সিন্ডিকেটও সিন্ডিকেটের মুকুটে নতুন পালক যোগ করেছে : ঈদের দিন ৬০ কেজি লবণের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,২৫০ টাকা, যেখানে এক সপ্তাহ আগেই তা ছিল প্রায় ৬০০-৭০০ টাকা।
লবণের বাজার মূল্যের অস্বাভাবিক এই বৃদ্ধিতে অনেক আড়তদারই চামড়া কেনাটা বর্জন করেন। অথচ জাতীয় মৌসুমি চাহিদার ৬০ শতাংশ কেবল ঈদের দিনই সংগৃহীত হয়। বাকি ৪০ শতাংশ প্রণোদিত মূল্য বলে বিক্রি করা হয় না; কেননা ট্যানারি মালিকেরা বছরের অন্যান্য সময় চামড়ার ক্রয়মূল্য স্থিতিশীল রাখতে রাজি হন না। এ পরিস্থিতি কোম্পানির লাভের হিসাবের বাইরে এখনও একটি সুনির্দিষ্ট নীতি প্রতিফলিত করে না। অভিযোগ আছে সিন্ডিকেটের কারসাজিতে ৩০০ কোটি টাকার বকেয়া আদায়ের পরও মাত্র ৩টি ট্যানারি শতভাগ বকেয়া পরিশোধ করেছে, বাকিরা দেনা শোধে পিছিয়ে। এ সুযোগে আড়তদাররা সিন্ডিকেট করে মাঠপর্যায়ে চামড়া কেনা বন্ধ করে দেয়। এ ছাড়া পরিবহন খরচও বেড়ে যাওয়ায় চামড়া আনা-নেওয়ায় অতিরিক্ত বোঝা তৈরি হচ্ছে।
ঐতিহ্যবাহী এই খাতের সমৃদ্ধি, উন্নয়ন ও বৈপ্লবিক সম্ভাবনা ধরে রাখতে হলে, শুধু উৎপাদন নয়, বাজার নিয়ন্ত্রণের অবৈধ সিন্ডিকেট ও পরিবেশগত সমস্যা মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। চামড়া শিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে শুধু গরিব চামড়া সংগ্রহকারীদের আর্থিক কল্যাণের ওপর নয়, বরং পরিবেশগত দায়িত্ব পালনের ওপরও। চামড়াজাত দ্রব্য তৈরি ও ট্যানারিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক ও বর্জ্য নিষ্কাশনজনিত সংকট টেকসই উন্নয়নের জন্য বড় বাধা। ধলেশ্বরী ও অন্যান্য নদী দূষণের মূল কারণ হিসেবে বর্জ্য বিশুদ্ধীকরণ কারখানাগুলোর অংশ-নিষ্ক্রিয় অবস্থা দেখা গেছে। কনসেন্ট্রেটেড ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (সিইটিপি) সম্পূর্ণ কার্যকর নয়, ফলে ত্বক প্রক্রিয়াজাতকরণের বর্জ্য নদীতে প্রবাহিত হচ্ছে। এটি মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিবেশে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। একদিকে বিশ্ববাজারে চামড়াজাত দ্রব্যের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৬ থেকে ২০২৪ সময়কালে বিশ্ববাজারে লেদার গুডসের মূল্য প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২৪২.৭০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা আগামী ১০ বছরে প্রায় ৫৫২.৯০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মুসলিমপ্রধান দেশ হয়েও বাংলাদেশ সেই গতিতে এগোতে পারছে না । অথচ বাংলাদেশ থেকে চোরাচালান হওয়া পশুর চামড়ার সুবাদে প্রতিবেশী দেশ ভারতের রপ্তানি ৫.২৮ বিলিয়ন, ভিয়েতনামের প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার। এর ফলে বাংলাদেশের চামড়া খাতটি দিন দিন ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হচ্ছে।
চলমান সংকট থেকে উত্তরণের জন্য রাষ্ট্রীয় অনেক উদ্যোগ দেখা গেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ‘লেদার ইন্ডাস্ট্রি অথরিটি বিল’ প্রস্তাব করছে, যা শিল্পের জন্য পৃথক কর্তৃপক্ষ গড়ে তুলবে, উন্নত অবকাঠামো নির্মাণ, বাজার তদারকি, অন্তর্ভুক্তিমূলক মূল্য নির্ধারণ এবং পরিবেশগত মান নিশ্চিতের জন্য নিয়ন্ত্রক ক্ষমতা দেবে। এ ছাড়া ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেট ইন ভার্স’ হিসেবে রাজশাহী, সাভার ও চট্টগ্রামে তিনটি সুনির্দিষ্ট চামড়া শিল্প এলাকা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রণোদনামূলক ঋণ, কর ও ভ্যাট সুবিধা, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য উৎসাহমূলক প্যাকেজ, দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ কর্মসূচিসহ আরও অনেক উদ্যোগ রয়েছে। কিন্তু মুসলমান ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত ১৭ কোটি মানুষের এই দেশে পবিত্র ঈদুল আজহার লাখ লাখ পশু কোরবানির চামড়া নিয়ে একশ্রেণির দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ, আমলা ও মুনাফাখোর ব্যবসায়ীর সম্মিলিত চক্র ঈদের সর্বজনীন আনন্দ ও সাধারণ মানুষের ধর্মীয় আবেগ কাজে লাগিয়ে মুফতে অবৈধ অর্থ উপার্জনের মানসিকতা সব ধরনের সৎ উদ্যোগই নষ্ট করছে। ঈদের সময়ে সিন্ডিকেটে কাজ করা ফড়িয়া অর্থ আয়কারী ও দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জমান চামড়া শিল্পের ব্যবসায়ীরা রাজনীতিবিদ ও আমলাদের উপঢৌকন দিয়েই এই শিল্পের নৈরাজ্য টিকিয়ে রেখেছে। তা না হলে বছরের পর বছর ধরে সিন্ডিকেট এভাবে চলতে পারত না। এদের সম্মিলিত পৃষ্ঠপোষকতায় চামড়া খাতে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণও দিন দিন বাড়ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চামড়া শিল্পে খেলাপি ঋণ ১ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা বেড়েছে। চামড়া খাতের রপ্তানি ও চামড়াজাত পণ্যে ঋণ দেওয়া হয় মূলত যথাক্রমে ২২০০ কোটি টাকা ও ৬০০ কোটি টাকা করে। ২০২২ সালে ৪৪৩ কোটি টাকা বিতরণের বিপরীতে ফেরত এসেছে মাত্র ১২৮ কোটি টাকা, যা ২০২১ সালে ৬১০ কোটি টাকার বিপরীতে ২১৮ কোটি টাকা ছিল। চামড়া শিল্পে ঋণের প্রায় ৪০ শতাংশই খেলাপি।
সত্যিকার অর্থে কোরবানির পশুর চামড়ার সিন্ডিকেট এবং আর সব খাতের বড় ব্যবসায়ীদের মতো এই শিল্পের ব্যবসায়ীদের সর্বাবস্থায় আরও বেশি মুনাফা লাভের পুঁজিবাদী কৌশলের চর্চার বিস্তার চামড়া শিল্পকে ক্রমশই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে, যার প্রমাণ পাওয়া যায় রপ্তানিতে ক্রমাগত ধস নামা এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাজার হারানো। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি ৮.২৪ শতাংশ কমেছে। কিছু প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি আয় ৩০-৩৮ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। অবিশ্বাস্য বিষয় হচ্ছে, ২০১২ সালে যেখানে এই খাতটি থেকে আয় হয়েছিল ১১৩ কোটি ডলার, সেখানে ২০২৪ সালে তা নেমে এসেছে ৯৭ কোটিতে।
চামড়া শিল্পের টেকসই ভবিষ্যৎ গড়তে হলে তিনটি পরিবর্তন অপরিহার্য। প্রথমত, সিন্ডিকেটের বেআইনি চালচলন বন্ধ করতে হবে; চামড়া মূল্যের ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ের ক্রয়-বিক্রয়ের স্বচ্ছ সিস্টেম এবং ‘ই-টেন্ডারিং’ মডেল আনা যেতে পারে, যেখানে প্রতি কেজি কাঁচা চামড়ার জন্য স্বয়ংক্রিয় দরপত্র গ্রহণের মাধ্যমে বাস্তব মূল্য নির্ধারণ হবে। দ্বিতীয়ত, পরিবেশগত মান নিশ্চিত করতে ট্যানারিতে বর্জ্য পরিশোধন প্লান্ট কার্যকরভাবে পরিচালনা, পশুর চামড়া প্রক্রিয়াকরণে রাসায়নিক ব্যবহারে প্রতিযোগিতামূলক ‘গ্রিন ট্যানিং’ প্রযুক্তি গ্রহণ এবং ‘সার্কুলার ইকোনমি’ মডেল অনুসরণের প্রয়োজন। তৃতীয়ত, স্থানীয় বাজারে চামড়াজাত দ্রব্য উৎপাদনে ভ্যালু অ্যাডিশন বাড়াতে চামড়া শিল্প প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের যৌথ গবেষণা, উন্নত প্রযুক্তি ও ডিজাইন থিংকিং পদ্ধতি চালু করতে হবে; এতে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব হবে। ইতালি, স্পেন, জাপানসহ অনেক দেশে নির্দিষ্ট অঞ্চলকেন্দ্রিক চামড়া পণ্য উৎপাদনের ক্লাস্টার মডেল রয়েছে। ঈদের উৎসবের রঙের সঙ্গে মিল রেখে, এ শিল্পকে হয়ে উঠতে হবে দেশের চামড়াজাত দ্রব্যের গৌরবময় প্রতিনিধিত্ব। সাধারণ ক্রেতা থেকে শুরু করে বিশ্বমানের গ্রাহকÑ সবাই যেন ন্যায্যমূল্যে উচ্চমানের পণ্য পাচ্ছে, এ নিশ্চয়তা দিতে পারলেই সংহতি গড়ে উঠবে। সরকার, ব্যবসায়ী সংগঠন, শ্রমিক ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে একটি ‘চামড়া উন্নয়ন কমিশন’ গঠন করা যেতে পারে, যার মূল কাজ হবে নিয়মিত মনিটরিং, মূল্য সমন্বয় এবং পরিবেশগত মাপকাঠিতে উন্নতির পথনিদের্শনা দেওয়া।
মনে রাখতে হবে যে এসডিজি অর্জন ও এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী ২০২৬-২৭ সময়কালে বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড পোশাক শিল্প, রেমিট্যান্স ও আইটি খাতের পাশাপাশি চামড়াজাত দ্রব্যের শিল্পকেও এ দেশের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি অগ্রদূত করতে হবে। দেশের মাটি থেকে শুরু করে বিশ্বমঞ্চ পর্যন্ত এই শিল্পের সম্ভাবনা বিশাল। যদি অন্য মানুষের শ্রমে উৎপাদিত মূল্য আত্মসাতে বিশ্বাসী গুটিকয় ব্যবসায়ী-রাজনীতিবিদ-আমলার পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া কোরবানিকৃত পশুর চামড়ার সিন্ডিকেটের কালো হাত বন্ধ, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন নিশ্চিত ও বাজারে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করা যায়, তাহলে খুব শিগগিরই বাংলাদেশের চামড়া শিল্প বিশ্বদরবারে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছাবে। প্রতিবছর ঈদের শুভ মুহূর্তগুলো যেন আর কখনও বাজারের সিন্ডিকেটের কারণে কলুষিত না হয়, সেই প্রত্যাশা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।