রোহিঙ্গা
ড. আলা উদ্দিন
প্রকাশ : ১১ জুন ২০২৫ ১৫:৪৮ পিএম
ড. আলা উদ্দিন
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনা আমাদের শরণার্থী ব্যবস্থাপনায় শিক্ষার প্রকৃত অবস্থান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। একযোগে ১২৫০ জন স্থানীয় শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করার ঘটনা কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি প্রতিফলিত করে শরণার্থী সেবায় শিক্ষার অবস্থান কতটা নড়বড়ে। অর্থনৈতিক সংকটের নামে শিক্ষা কার্যক্রম সংকুচিত করার এই প্রবণতা আমাদের মানবিক দায়বদ্ধতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবকেই স্পষ্ট করে তোলে। এই ঘটনার গভীরে যদি আমরা তাকাই, তবে দেখতে পাই যে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি কতটা স্বল্পমেয়াদি এবং অপরিকল্পিত। শিক্ষা যেখানে যে কোনো মানবিক সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের মূল চাবিকাঠি, সেখানে এই খাতে বরাদ্দ কমানো এবং অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা কতটা যুক্তিসঙ্গত? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা শুধু নীতিনির্ধারকদের জন্যই নয়, আমাদের সবার জন্যই জরুরি।
৩১ মে উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কর্মরত ১২৫০ জন স্থানীয় শিক্ষককে একযোগে চাকরিচ্যুত করা হয় (প্রতিদিনের বাংলাদেশ, ৩১ মে ২০২৫)। ব্র্যাক, কোডেক, ফ্রেন্ডশিপ, মুক্তি, কোস্ট ফাউন্ডেশন ও জেসিএফসহ বিভিন্ন স্বনামধন্য এনজিও সংস্থা এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে। বিষয়টি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন দেখা যায় যে একই সময়ে রোহিঙ্গা শিক্ষকদের চাকরি বহাল রাখা হয়েছে। এই বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ শিক্ষকরা প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করেন। তাদের দাবি ছিল ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চাকরি পুনর্বহাল। অন্যথায় এনজিও ও আন্তর্জাতিক সংস্থার গাড়ি ক্যাম্পে প্রবেশে বাধা দেওয়ার হুমকি দেন তারা। ভুক্তভোগী শিক্ষকরা এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলেছেন, রোহিঙ্গা শিক্ষকরা যদি কাজ করতে পারে, তাহলে আমরা কেন পারব না? অথচ শুধু আমাদেরই চাকরিচ্যুত করা হলো। তাদের এই প্রশ্ন আসলে আরও গভীর একটি সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করে।
জানা যায়, ইউনিসেফের অর্থায়নে দীর্ঘদিন ধরে চলমান শিক্ষা প্রকল্পটি অর্থ সংকটের কারণে বন্ধ করার প্রক্রিয়া চলছে। ৩০ জুন পর্যন্ত প্রকল্প চালানোর অর্থ রয়েছে বলে ইউনিসেফ সরকারকে চিঠিতে জানিয়েছে। কিন্তু এই অর্থনৈতিক সংকটের যুক্তি কতটা গ্রহণযোগ্য? যদি সত্যিই তহবিল সংকট থাকে, তাহলে সব শিক্ষককে সমানভাবে প্রভাবিত করা উচিত ছিল। কেন শুধু স্থানীয় শিক্ষকদের টার্গেট করা হলো? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রায় আরও ৩ হাজার শিক্ষককে ছাঁটাইয়ের প্রস্তুতি চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর অর্থ হলো শিক্ষা কার্যক্রমে আরও বড় ধস নামতে চলেছে। এই ঘটনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি করে কি আসলেই দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা কার্যক্রম টেকসই করা সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর নেতিবাচক। সামাজিক সম্প্রীতি ও স্থিতিশীলতা ছাড়া কোনো উন্নয়ন কার্যক্রমই দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারে না।
এ কথা সত্য যে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট মোকাবিলায় ইউনিসেফ পরিচালিত কার্যক্রমের জন্য মানবিক সহায়তার তহবিল উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এর প্রভাব পড়েছে শরণার্থী শিবিরগুলোতে ইউনিসেফের সহায়তাপুষ্ট শিক্ষা কেন্দ্রগুলোতে ভর্তি হওয়া স্কুলগামী শিশুদের ৮৩ শতাংশের শিক্ষার ওপর। নতুন তহবিল গঠন এবং নতুন করে কার্যক্রম সাজানোর নিরলস প্রচেষ্টা চালানোর পরেও তহবিল সংকটের কারণে ইউনিসেফকে কিছু কষ্টদায়ক সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। এর মধ্যে কিন্ডারগার্টেন থেকে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ করা হোস্ট কমিউনিটির স্বেচ্ছাসেবক শিক্ষকদের সহায়তা স্থগিত করার মতো বিষয় রয়েছে। অবিলম্বে টেকসই অর্থনৈতিক সহযোগিতা ছাড়া শরণার্থীদের সব ধরনের সহায়তার সুযোগ ঝুঁকিতে পড়ছে, যার মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই শরণার্থী শিবিরে শিশুদের জন্য জরুরি মৌলিক শিক্ষার সুযোগ হারানোর মতো বিষয়ও রয়েছে।
জানা গেছে, তহবিল ঘাটতির কারণে শিক্ষা কেন্দ্রগুলো অন্তত ২০২৫ সালের জুনের শেষ নাগাদ বন্ধ থাকবে, এই বন্ধ হবে ঈদের বাড়তি ছুটির সঙ্গে একসঙ্গে। এরপর শিক্ষা কেন্দ্রগুলো খোলার বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করবে নতুন তহবিল পাওয়ার ওপরে। পরবর্তী শিক্ষাবর্ষে খুদে শিক্ষার্থীদের (কিন্ডারগার্টেন থেকে গ্রেড ২) আর ইংরেজি, বিজ্ঞান বা সামাজিক শিক্ষা শেখানো হবে না। শুধু মৌলিক বিষয়গুলোÑ সাক্ষরতা (রোহিঙ্গা), বার্মিজ, গণিত, জীবন দক্ষতা ও সামাজিক-মানসিক শিক্ষার ওপর অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য নতুন কোনো পাঠ্যপুস্তক বা শিক্ষক নির্দেশিকা কেনা হবে না। শিশুদের বিগত বছরগুলোর বইপত্র সংগ্রহ করে ব্যবহার করতে বলা হবে, তাতে বইগুলোর অবস্থা যা-ই হোক না কেন। বছর শেষের মূল্যায়ন এবং প্লেসমেন্ট টেস্ট (কোন শিশু কোন শ্রেণিতে ভর্তিযোগ্য তা বের করার পরীক্ষা) বাতিল করা হয়েছে। তবে শিশুদের জন্য সেবা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতিকে সর্বাত্মক গুরুত্ব দিয়ে ইউনিসেফ, সবচেয়ে প্রভাব রাখতে পারে এবং অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী এমন কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
যেকোনো মানবিক সংকটে শিক্ষার ভূমিকা অপরিহার্য। শরণার্থী শিশুদের জন্য শিক্ষা শুধু একটি মৌলিক অধিকার নয়, এটি তাদের ভবিষ্যৎ পুনর্বাসন ও সমাজে একীভূত হওয়ার জন্য অত্যাবশ্যক। রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘমেয়াদি হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এক প্রজন্মের রোহিঙ্গা শিশু ইতোমধ্যে ক্যাম্পেই বড় হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষা কার্যক্রমে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা মানে এই শিশুদের ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তোলা। যুগের পর যুগ ধরে অশিক্ষিত ও দক্ষতাহীন একটি জনগোষ্ঠী তৈরি করা, যা পরবর্তী সময়ে আরও বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার জন্ম দিতে পারে। শিক্ষা শুধু পাঠ্যবই পড়ানোর বিষয় নয়। এটি শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা, সামাজিক দক্ষতা বিকাশ এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ক্যাম্পের মতো কঠিন পরিবেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিশুদের জন্য নিরাপদ স্থান হিসেবে কাজ করে, যেখানে তারা স্বাভাবিক শৈশব কাটানোর সুযোগ পায়।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনের (ইউএনএইচসিআর) মতে, শরণার্থী শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে বাধ্যতামূলক। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) চতুর্থ লক্ষ্য ‘সবার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষা’-এর মধ্যে শরণার্থী শিশুরাও অন্তর্ভুক্ত। বিশ্বের অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা দেখলে আমরা দেখি যে, যেসব দেশ শরণার্থী শিক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করেছে, তারা অনেক ভালো ফলাফল পেয়েছে। জর্ডান, লেবানন, তুরস্ক প্রভৃতি দেশ সিরিয়ান শরণার্থীদের শিক্ষায় বিনিয়োগ করে ইতিবাচক ফলাফল পেয়েছে। এই দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত।
অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে নিজস্ব অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ১.২ মিলিয়ন রোহিঙ্গা শরণার্থীর বোঝা বহন করা সহজ কাজ নয়। বাংলাদেশের নিজস্ব শিক্ষাব্যবস্থায় যেখানে অনেক সমস্যা রয়েছে, সেখানে অতিরিক্ত চাপ নিশ্চয়ই কঠিন। তবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষাকে উপেক্ষা করা কোনোভাবেই সমাধান নয়। বরং এর সমাধান হতে পারে আরও কার্যকর আন্তর্জাতিক সহায়তা ও পরিকল্পিত বাস্তবায়ন। সরকারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও বৃহত্তর দায়বদ্ধতা রয়েছে এই ক্ষেত্রে।
উপরোক্ত ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছে স্থানীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্ন। স্থানীয় শিক্ষকদের চাকরিচ্যুত করে রোহিঙ্গা শিক্ষকদের চাকরি বহাল রাখার সিদ্ধান্ত স্থানীয় জনগণের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। এই ধরনের সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের সম্পর্ক খারাপ করতে পারে। আর এটি শুধু শিক্ষা কার্যক্রমের জন্যই নয়, সামগ্রিক শরণার্থী ব্যবস্থাপনার জন্যও ক্ষতিকর।
শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভাষা ও সাংস্কৃতিক পটভূমি। রোহিঙ্গা শিক্ষকরা নিশ্চয়ই তাদের মাতৃভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে ভালো জানেন। কিন্তু স্থানীয় শিক্ষকরাও বাংলা ভাষা ও স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে রোহিঙ্গা শিশুদের পরিচয় করাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। আদর্শ পরিস্থিতিতে উভয় ধরনের শিক্ষকের সমন্বয়ে একটি বহুভাষিক ও বহু সাংস্কৃতিক শিক্ষা পরিবেশ তৈরি করা উচিত ছিল।
এই সংকট থেকে উত্তরণে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপÑ অবিলম্বে ছাঁটাইকৃত শিক্ষকদের চাকরি পুনর্বহাল করা উচিত। অন্তত চলতি শিক্ষাবর্ষ শেষ পর্যন্ত তাদের কাজে রাখা প্রয়োজন। শিক্ষা বছরের মাঝখানে এমন আকস্মিক পরিবর্তন শিশুদের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাÑ একটি সুস্পষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। এতে স্থানীয় ও রোহিঙ্গা উভয় সম্প্রদায়ের চাহিদা বিবেচনা করা উচিত। রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘমেয়াদিÑ এই বাস্তবতা মেনে নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে। আর্থিক স্থিতিশীলতাÑ আন্তর্জাতিক দাতাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে আরও স্থিতিশীল তহবিল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষা এমন একটি খাত যেখানে হঠাৎ পরিবর্তন খুবই ক্ষতিকর। সমন্বয় উন্নতি- স্থানীয় সরকার ও সম্প্রদায়ের সঙ্গে আরও ভালো সমন্বয় প্রয়োজন। কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সব স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে শিক্ষক ছাঁটাইয়ের ঘটনা শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। এটি আমাদের শরণার্থী ব্যবস্থাপনায় শিক্ষার অবস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবকে প্রকাশ করে। মানবিক সংকটে শিক্ষা একটি জীবনরক্ষাকারী সেবা। এটি শুধু জ্ঞান বিতরণের মাধ্যম নয়, বরং আশা ও ভবিষ্যৎ গড়ার হাতিয়ার। রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য শিক্ষা তাদের মর্যাদাপূর্ণ জীবনের পথ দেখায়। এই সংকট অতিক্রম করতে হলে আমাদের শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এটি শুধু নৈতিক দায়বদ্ধতা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্যও অপরিহার্য।
আমরা যদি আজ শিক্ষায় বিনিয়োগ না করি, তাহলে আগামীর সমস্যা আরও জটিল হয়ে উঠবে। রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘমেয়াদি। এই বাস্তবতা মেনে নিয়ে আমাদের একটি টেকসই শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নইলে একটি পুরো প্রজন্ম হারিয়ে যাবে অন্ধকারে। শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে রাখাই হোক আমাদের অগ্রাধিকার।