জলবায়ু পরিবর্তন
শেলী সেনগুপ্তা
প্রকাশ : ০২ জুন ২০২৫ ১৬:০৮ পিএম
শেলী সেনগুপ্তা
আজারবাইজানে গত বছর অনুষ্ঠিত জলবায়ু-সংক্রান্ত ‘সম্মেলন কপ ২৯’ সম্মেলনেই নয়, জলবায়ু সংক্রান্ত প্রতিটি সম্মেলনেই আলোচিত জলবায়ু বিপন্নতায় ক্ষতিকর অবস্থার কথা। এ বিষয়ে সোচ্চার সারা বিশ্ব। উন্নয়নশীল দেশ কার্বন নিঃসরণে ভূমিকা না রাখলেও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নেতিবাচক প্রভাবের ভার তাদেরও বহন করতে হচ্ছে। গত শতাব্দীর ক্রান্তিলগ্ন থেকে বিষয়টি বিশ্বকে প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর মাত্রা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। অথচ এই নেতিবাচক বিষয়টি চিহ্নিত করতে আমাদের অনেক বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করতে হয়েছে।
বাংলাদেশ ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ। ঝড়, বন্যা ও জলোচ্ছ্বাস বছরজুড়েই চলছে। বাংলাদেশের দুর্যোগের মাত্রা এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। তা ছাড়া বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ বাস করে উপকূলে, যাদের জীবন ও জীবিকার প্রধান উপায় কৃষিকাজ এবং মাছ শিকার। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ ধারা অব্যহত রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে দেখা দিয়েছে কর্মসংকট ও খাদ্যসংকট। ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যার আধিক্য ও দরিদ্রতার কারণে বাংলাদেশ সবসময়ই জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিতে। এর ফলে লোনাপানিতে জমি লবণাক্ত হয়ে একদিকে খাদ্যসংকট তৈরি হচ্ছে এবং অন্যদিকে নানাভাবে মানুষকে স্থানান্তরিত হতে হচ্ছে। আয়ের সক্ষমতা, শিক্ষার সুযোগ ও স্বাস্থ্যসেবার অধিকার সংকুচিত হচ্ছে এবং এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে নারী ও মেয়েশিশুর ওপর। একই সঙ্গে বাল্যবিবাহের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এর সঙ্গে কমে আসছে জন্মনিয়ন্ত্রণ সেবা পাওয়ার সুযোগ। অন্তঃসত্ত্বা নারীর গর্ভকালীন ও প্রসবসেবা পাওয়ার সুযোগও কমে যাচ্ছে। আর এ কারণে নারী ও শিশুরাই যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
আমরা জানি, সবসময়ই সকল প্রকার সমস্যার শিকার প্রথম হয় নারী ও শিশু। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত সব অবস্থায় এবং সামাজিক অপসংস্কারেও নারীই চরম সংকটে ভোগে। একইভাবে প্রকৃতি ও পরিবেশের রুক্ষতা এবং যাতনা সবার আগে পড়ে পিছিয়ে থাকা নারীদের ওপর। বিভিন্ন সময় অনুষ্ঠিত জলবায়ু সম্মেলনের মাধ্যমে নারী ও শিশুর ওপর এর কুপ্রভাব সম্পর্কে জানা গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পানি, খাবার ও জ্বালানির অভাবে সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়ে নারী ও শিশুরা। তাদের স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে।
গ্রামীণ নারীরা পরিবারের সবার জন্য পুষ্টি সরবরাহ করলেও নিজেরা ভোগেন পুষ্টিহীনতায়, কারণ তারা নিজেদের প্রতি সবসময়ই উদাসীন। তা ছাড়া পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাদ্যেরও অভাব রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক নারী পুষ্টিহীনতার শিকার হয়। যদিও আমরা জানি একমাত্র পুষ্টিই পারে মানুষের মনের শক্তি জোগাতে এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে। দুঃখজনক হলেও সত্যি, অপুষ্ট জাতি কখনও উন্নয়নের অংশীজন হতে পারে না।
জলবায়ু পরিবর্তনের অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত প্রভাবের শিকার হয়ে কিশোরীদের বাল্যবিবাহের শিকার হতে হচ্ছে। এর ফলে কিশোরী মাতার অনাহারে ও অর্ধাকারে জীবন কাটানো একপ্রকার নিয়মে দাঁড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে গর্ভবতী নারীরা পদে পদে বিপদে পড়ে, সঠিক চিকিৎসাও পায় না।
বন্যা এবং প্লাবনে পরিবারের পুরুষ সদস্যরা নিজেদের নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু নারীর পক্ষে তা পাহাড়সমান কঠিন। একই ঘটনা ঘটে পরিবারের শিশুদের জন্যও। তারা চাইলেই নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারে না। এর মধ্যেই নারীকে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকতে হয় এবং বাঁচিয়ে রাখতে হয় পরিবারের বয়ঃবৃদ্ধ ও শিশুদের।
অতিবৃষ্টি আর বন্যায় কাঠের অপর্যাপ্ততা কিংবা ভেজা কাঠ দিয়ে আগুন জ্বালানোর সীমাহীন দুর্ভোগের মধ্যেই গৃহিনীরা রান্না করে। এত কিছুর মধ্যে গৃহিণীরা নিজের আহারের কথা না ভেবে অন্যদের পাতে খাবার তুলে দেন। উপকূলীয় অঞ্চল আর নিভৃত পল্লীর হতদরিদ্র নারীদের অবস্থা আরও শোচনীয়। দূরদূরান্ত থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করে আনতে হয়। এর মধ্যে পথে পথে নানা বিপদের মোকাবিলা করতেও হয়। অন্যদিকে ঝড়, বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে নদী ভাঙন বেড়েছে। নদীপাড়ের মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে শহরাঞ্চলে আসছে। নানান প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে। তবে পরিসংখ্যানের তথ্য বলে বাস্তুচ্যুত হয়ে তারা আর্থিকভাবে কিছুটা স্বস্তিতে থাকলেও মানসিকভাবে ভালো থাকেন না। চাকরি এবং সন্তান লালনপালন একই সঙ্গে সম্ভব হচ্ছে না বলে পরিবারের কাছ থেকে দূরে থাকতে হয়। পরিবার থেকে দূরে থাকার ফলে একদিকে নিজে কষ্ট পান অন্যদিকে পরিবারকেও মানসিক কষ্টের মধ্যে রাখেন। কখনও কখনও পারস্পরিক সম্পর্কের হানি ঘটে।
অনেক গ্রামীণ নারী অভিবাসী শ্রমিক হয়ে দূরদেশে চলে যাচ্ছেন। কেউ কেউ নিজের অজান্তে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এর সবগুলোই জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এটি বলা যেতে পারে অভিযোজনের বহুমাত্রিক উপায়। এখান থেকে পরিত্রাণ পেতে সচেতন দায়বদ্ধতা ছাড়া নারীদেরই নিজের প্রতি যথেষ্ট খেয়াল ও নজর রাখা অতি আবশ্যক, যদিও সবসময় তা হয়ে ওঠে না।
বয়সভেদে নারী ও কন্যাশিশুর ওপর এর ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব পড়ে। কোথাও কোথাও মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা থেকে কন্যাশিশুর ঝরে পড়া এবং বাল্যবিবাহও বাদ পড়েনি। কখনও কখনও আনন্দময় শৈশব হারিয়ে তাদের শহরাঞ্চলে বাসাবাড়িতে কাজ করতে হয়। কেউ কেউ বিপথেও চলে যায় কিংবা যেতে বাধ্য হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বন্ধ করা কিংবা কমিয়ে আনা কারও হাতের মধ্যে নেই। তাই বলে এর মোকাবিলা করা যাবে না, এমন তো নয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে খেয়াল রাখতে হবে মানবসৃষ্ট দুর্যোগ বা ভোগান্তির মাত্রা যেন অন্যের কষ্টের মাত্রা বাড়িয়ে না তোলে।
জলবায়ু সহিষ্ণু ফসলের যে সব নতুন জাত উদ্ভাবিত হয়েছে তার মাধ্যমে যেন কৃষিসেবা পাওয়া যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এই সুযোগ নারী কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে হবে সবার আগে। উৎপাদিত ফসল যেন উঁচু গোলাঘরে নিরাপদে সংরক্ষণ করা যায় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। সমবায়ের মাধ্যমে এই ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সারা দেশের সকল কৃষককে শস্যবীমার আওতায় আনতে হবে। এক্ষেত্রে অবশ্যই নারী কৃষককে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে সহায়তা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। সামাজিক সুরক্ষা বা সামাজিক নিরাপত্তা পরিধি বৃদ্ধি করে ভূমিহীন, আদিবাসী, প্রতিবন্ধীসহ সব বয়স, শ্রেণি ও পেশার মানুষকে বিশেষত নারী ও শিশুদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য শক্তিশালী খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঘাতসহনশীল, পরিবেশবান্ধব, নিরাপদ, টেকসই ও পুষ্টিসমৃদ্ধ লাভজনক ফসল উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে। এর ফলে নারী ও শিশুরা অনেক বেশি সুরক্ষা পাবে।
আমরা জানি, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা আমাদের সবার ওপর প্রভাব বিস্তার করছে। এই সমস্যা মোকাবিলা করার জন্য শুধু সরকারের ওপর নির্ভর করলে হবে না, বেসরকারি সংগঠনগুলোকেও সরকারের পাশাপাশি এগিয়ে আসতে হবে। পৃথিবীকে মানুষের বাসযোগ্য রাখতে প্রচুর বৃক্ষ রোপণ করতে হবে। গাছকে ভালোবাসতে হবে, তার যত্ন নিতে হবে। মনে রাখতে হবে বৃক্ষ রোপণের কোনো বিকল্প নেই। সন্তান পরীক্ষায় ভালো ফল করলেও তাকে সম্মানিত করে তার নামে বৃক্ষরোপণ করা যেতে পারে। তাতে দেশীয় সম্পদ বৃদ্ধি পাবে এবং শিশুটিও আনন্দিত হবে। বৃক্ষগুলো দেখাশোনার ভারও তার ওপর দেওয়া যেতে পারে। নিজেদের সঙ্গে সঙ্গে শিশুর মধ্যে জাগিয়ে তুলতে হবে বসুন্ধরা-প্রীতি।
তা ছাড়া বিশেষ বিশেষ স্থান যেমন পার্ক, স্কুল প্রাঙ্গণ, সরকারি ভবনের আশপাশে এবং সরকারি জমির গাছ কাটার সময় সরকারি অনুমোদনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। বিশেষ কারণ প্রদর্শন ছাড়া কোনো গাছই কাটা যাবে না। জলবায়ু পরিবর্তন এখন পৃথিবীজুড়ে বিশাল আলোচনার বিষয়। এই আলোচনাকে সুখময় ও মানবকল্যাণমুখী করতে পৃথিবীর সন্তানদের এগিয়ে আসতে হবে। এজন্য প্লাস্টিক ব্যবহার, পলিথিন ব্যবহার এবং যেখানে সেখানে এগুলো ফেলা থেকে বিরত থাকতে হবে। তা ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের জন্য দায়ী দেশগুলোকে ভুক্তভোগী দেশগুলোর পাশে দাঁড়াতে হবে। সবাইকে একসঙ্গে কাজ করে সংকট মোকাবিলা করতে হবে। আগামীর বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম যেন সুস্থ ও সবলভাবে গড়ে উঠতে পারে তা-ও বিবেচনায় রেখে কাজ করে যেতে হবে। আমাদের প্রচেষ্টা নিশ্চয় ফলপ্রসু হবে এবং একটি নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারব।