বাণিজ্য
নিরঞ্জন রায়
প্রকাশ : ২৩ মে ২০২৫ ১৬:০৭ পিএম
নিরঞ্জন রায়
দেশের অর্থনীতি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে দেউলিয়া শব্দটি বেশ পরিচিত। অর্থনৈতিক এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম থাকলে সেখানে দেউলিয়া হওয়ার মতো ঘটনা ঘটবেই। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যখন ঋণের দায়ে জর্জরিত হয়ে যায় এবং ঋণ পরিশোধ করার সক্ষমতা থাকে না, তখনই সেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করে। এই ব্যবস্থাকে আইনত স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য আছে দেউলিয়া আইন বা ব্যাংকারাপ্টসি অ্যাক্ট। এই দেউলিয়া আইন বিশ্বের সব দেশেই আছে, এমনকি আমাদের দেশেও আছে। আমাদের দেশে ১৯৯৭ সালে এই দেউলিয়া আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, যা মূলত ১৯৯৪ সালের কোম্পানি সমন্বয়ে প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে দেউলিয়া আইন থাকলেও এর প্রয়োগ সেভাবে নেই। পক্ষান্তরে উন্নত বিশ্বে দেউলিয়া আইন যেমন আছে, তেমনি আছে এই আইনের ব্যাপক প্রয়োগ। এই দেউলিয়া আইনের কারণেই উন্নত বিশ্বের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান প্রায়ই দেউলিয়া ঘোষণা করে বন্ধ হয়ে যায়।
আমেরিকা, কানাডাসহ পশ্চিমা বিশ্বের ধনতান্ত্রিক দেশে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দেউলিয়া বা বন্ধ হয়ে যাওয়া নিয়মিত ঘটনা। এখানে সকাল-বিকাল কোম্পানি নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করে এবং এক পর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায়। এখানে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সরাসরি বন্ধ ঘোষণা করে না। যখন কোনো কোম্পানি লাভজনকভাবে পরিচালিত হতে পারে না, তখন প্রথমে নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করে, যা মূলত বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রাথমিক পদক্ষেপ। যখন একটি কোম্পানি পরিচালনা করে ঋণ পরিশোধ করার মতো অবস্থায় থাকে না, তখন সেই কোম্পানি দেউলিয়া আইনের আওতায় ঋণদাতাদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আবেদন করে, যা আইনের ভাষায় ক্রেডিটর প্রটেকশন বলা হয়। এই আবেদন গৃহীত হওয়ার পর আর কোনো ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান তাদের কাছ থেকে পাওনা টাকা আদায়ের জন্য চাপ দিতে পারবে না। আবেদন গৃহীত হওয়ার পর একটি নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া হয়, যাতে করে কোম্পানিটি পুনর্গঠন বা রিস্ট্রাকচার করে ঘুরে দাঁড়াতে পারে এবং ব্যবসায় টিকে থাকতে পারে।
এই পুনর্গঠন সময়ে যাতে ঋণদাতারা পাওনা আদায়ে অহেতুক চাপ সৃষ্টি করে ব্যবসায় বিঘ্ন ঘটাতে না পারে সে কারণেই এই ক্রেডিটর প্রটেকশনের ব্যবস্থা। আবেদন করা কোম্পানিটি যদি পুনর্গঠন করে ব্যবসায় টিকে যেতে পারে, তাহলে তো কথাই নেই। তখন সাধারণ নিয়মে ব্যবসা পরিচালনা করবে এবং স্বাভাবিকভাবেই ঋণের টাকা পরিশোধ করবে। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে কোম্পানি যদি ব্যবসায় টিকতে না পারে, তাহলে সম্পূর্ণরূপে দেউলিয়া ঘোষণা করে কোম্পানির সমস্ত সম্পত্তি বিক্রি করে পাওনাদারদের অগ্রাধিকার অনুযায়ী পরিশোধ করা হয়। এসবই হচ্ছে নিয়মের কথা। বাস্তবে একবার কোনো কোম্পানি ক্রেডিটর প্রটেকশন চেয়ে আবেদন করে পুনর্গঠনের মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে এমন নজির বিরল। এই ব্যবস্থা মূলত না ফেরার অবস্থানে চলে যাওয়া। একবার ক্রেডিটর প্রটেকশন চেয়ে আবেদন করলে সেখান থেকে আর ফেরার কোনো উপায় থাকে না। সেখানে এক পর্যায়ে দেউলিয়া ঘোষণা করা এবং চূড়ান্তভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া।
এভাবেই গত মাসে কানাডার অন্যতম একটি বৃহৎ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, হাডসন বে আকস্মিক দেউলিয়া ঘোষণা করে এবং তাদের ব্যবসা এখন বন্ধ হতে চলেছে। সংবাদটি কানাডাবাসীর জন্য বেশ কষ্টের এবং তারা এ-রকম একটি সংবাদ শোনার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না। এত বড় দেশের এত বিশাল এক প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটল, অথচ কেউ ঘুণাক্ষরেও জানতে পারল না। আমেরিকার-কানাডার মতো দেশ একদিকে যেমন স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং মতপ্রকাশের স্বর্গরাজ্য, অন্যদিকে তেমনি কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করার উত্তম স্থান। এসব দেশে কিছু কার্যক্রম আছে, যা অত্যন্ত গোপনীয়তার মাধ্যেম সম্পন্ন করা হয়। এখানে কোম্পানি পরিচালনার স্পর্শকাতর সিদ্ধান্তগুলো যথেষ্ট গোপনীয়তার মাধ্যমে গৃহীত হয়। একটি কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো সিদ্ধান্ত রাতারাতি গৃহীত হয় না। অনেক আগে থেকেই এ-রকম সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, কিন্তু সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে জনসাধারণকে না জানানো পর্যন্ত কেউ জানতে পারবে না। একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবে, অথচ কেউ তা জানতে পারে না। এটাই এখানকার করপোরেট সংস্কৃতি।
হাডসন বে ৩৫৫ বছরের পুরোনো একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। কানাডার শুরু থেকেই এই হাডসন বে বেশ সফলতার সঙ্গেই ব্যবসা পরিচালনা করেছে। হাডসন বে মূলত কানাডার বিখ্যাত একটি রিটেইল স্টোর, যেখানে হেন কোনো জিনিস নেই, যা বিক্রি হয়নি। আসবাবপত্র থেকে শুরু করে স্বর্ণালংকার, কাপড়চোপড়, প্রসাধনী সামগ্রী, মোটকথা মানুষের জীবনধারণের জন্য যা কিছু প্রয়োজন, তার সবকিছুই বিক্রি হতো এই হাডসন বের স্টোরে। সাশ্রয়ী মূল্যে গুণগত মানের দিক থেকে উন্নত মানের দ্রব্যসামগ্রী পাওয়া যেত এই হাডসন বের স্টোরে। গুণগতমানের কারণেই হাডসন বে কানাডার নিজস্ব ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছিল। কানাডার একটি নিজস্ব অহংকার ছিল এই হাডসন বে কোম্পানি। অথচ কানাডিয়ান হিসেবে গর্ব করার মতো এ-রকম একটি কোম্পানি দেউলিয়া হয়ে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিল।
এসব দেশে বেসরকারি খাতের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সকাল-বিকাল দেউলিয়া ঘোষণা করে বন্ধ হয়ে যাওয়ার নজির থাকলেও, হাডসন বের মতো এত পুরোনো এবং বিশাল কোম্পানি এভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। হাডসন বে মূলত এক বিলিয়ন ডলার পরিমাণ ঋণের দায়ে আটকে গিয়েছিল, যা তারা স্বাভাবিক নিয়মে ব্যবসা পরিচালনা করে পরিশোধ করতে পারছিল না। এই এক বিলিয়ন ডলারের ঋণ পরিশোধের একটা ব্যবস্থা করা গেলে, এই কোম্পানিটিকে টিকিয়ে রাখা মোটেই কঠিন কোনো ব্যাপার ছিল না। কেননা এই কোম্পানির আছে ঐতিহ্য, সুখ্যাতি, বিশাল অবকাঠামো, অর্থাৎ ব্যবসায়িক স্থাপনা এবং বিশ্বব্যাপী ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক। অথচ কানাডার অহংকার, ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করার জন্য সরকারও এগিয়ে আসেনি।
যা-হোক হাডসন বে বন্ধ হওয়ার কারণে কানাডাবাসী কতটা ক্ষতিগ্রস্ত বা অসন্তুষ্ট হয়েছে, তা তারাই ভালো বুঝবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এভাবে হাডসন বের মতো বৃহৎ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান আকস্মিক দেউলিয়া ঘোষণা করে বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের ক্ষতির সম্ভাবনা আছে কি না। অবশ্যই আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনা আছে, তবে তা নির্ভর করবে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোন ধরনের লেনদেন সংঘটিত হয়েছে তার ওপর।
উল্লেখ্য, এ-রকম দেউলিয়া হওয়ার ঘটনা যে শুধু হাডসন বের ক্ষেত্রে ঘটেছে তেমন নয়। আগেই উল্লেখ করেছি যে এসব উন্নত দেশে প্রায়ই বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া ঘোষণা করে বন্ধ হয়ে যায়। কয়েক বছর আগে সিয়ারস নামের আমেরিকার এক বৃহৎ রিটেইল স্টোর একইভাবে দেউলিয়া ঘোষণা করে বন্ধ হয়ে যায়। এসব প্রতিষ্ঠানে যারা এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) বা অন্য কোনো ব্যাংকিং নিশ্চয়তা ব্যতিরেকে শুধুমাত্র বিক্রয় চুক্তি বা ওপেন অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে পণ্য রপ্তানি করে, তাদের সমূহ ক্ষতির সম্ভাবনা আছে। কেননা রপ্তানিকারক তাদের পণ্যের মূল্যে পাবে না।
উন্নত বিশ্বের বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের একটা সুবিধা হচ্ছে, তারা পণ্য সরবরাহকারী, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশের রপ্তানিকারকদের ওপর যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করতে পারে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান কোনোরকম এলসি বা ব্যাংকিং নিশ্চয়তা প্রদান না করে শুধুমাত্র মুখের কথা, অর্থাৎ বিক্রয় চুক্তি বা ওপেন অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে পণ্য আমদানি করতে সক্ষম হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের বেশ সুনাম ও সুখ্যাতি থাকায় আমাদের দেশের রপ্তানিকারক বিক্রয় চুক্তি বা ওপেন অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে পণ্য রপ্তানি করতে যথেষ্ট স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। যতদিন এসব বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা ভালো চলে, ততদিন রপ্তানি মূল্যও নিয়মিত পাওয়া যায়। সমস্যা হয় তখনই, যখন এই বৃহৎ প্রতিষ্ঠান হাডসন বের মতো আকস্মিক দেউলিয়া ঘোষণা করে বসে। এ কারণেই যত বড় প্রতিষ্ঠানই হোক না কেন, কোনোরকম ব্যাংকিং নিশ্চয়তা ব্যতিরেকে শুধুমাত্র বিক্রয় চুক্তি বা ওপেন অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে পণ্য রপ্তানি করা মোটেই নিরাপদ নয়।
এ কথাও ঠিক যে এসব বৃহৎ প্রতিষ্ঠান আর এলসি দিয়ে পণ্য আমদানি করবে না। এসব প্রতিষ্ঠানে পণ্য রপ্তানি করতে হলে বিক্রয় চুক্তি বা ওপেন অ্যাকাউন্টের মাধ্যমেই করতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে একটি স্ট্যান্ডবাই এলসি নিয়ে রাখতে পারলে দেউলিয়াজনিত রপ্তানিমূল্য পরিশোধ না হওয়ার যে ঝুঁকি, তা খুব সহজেই লাঘব করা সম্ভব। বিক্রয় চুক্তি বা ওপেন অ্যাকাউন্টের সঙ্গে স্ট্যান্ডবাই এলসি সংযুক্ত করে রপ্তানি করতে পারলে, মূল্য পাওয়ার যে অনিশ্চয়তা তা খুব অনায়াসেই দূর করা সম্ভব। এ কারণেই এখন স্ট্যান্ডবাই এলসিসহ বিক্রয় চুক্তি বা ওপেন অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য খুবই জনপ্রিয়, যা বিশ্বের অনেক দেশ, এমনকি লাতিন আমেরিকার দেশগুলো সফলতার সঙ্গে অনুসরণ করছে। কিন্তু আমাদের দেশে স্ট্যান্ডবাই এলসিসহ বিক্রয় চুক্তি বা ওপেন অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি তো অনেক পরের কথা, এ ব্যাপারে অনেকের স্পষ্ট ধারণাই নেই। এই পদ্ধতি কীভাবে কাজ করে, তা বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে ইতঃপূর্বে অনেক কলাম লিখেছি, তাই এখানে আর নতুন করে কিছু লেখার নেই। মোটকথা, আধুনিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে স্ট্যান্ডবাই এলসিসহ বিক্রয় চুক্তি বা ওপেন অ্যাকাউন্ট পদ্ধতি চালু করার কোনো বিকল্প নেই। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করা।