সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২০ মে ২০২৫ ১৭:১০ পিএম
দেশে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। পরিসংখ্যান বলছে, যারা কোনো কাজ করছেন না, কাজ খোঁজ করছেন এবং কাজ করতে প্রস্তুত- এমন বেকার তথা কর্মহীনের সংখ্যা গত এক বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ হিসাবে, ২০২৪ সাল শেষে দেশে বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখ। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ছিল সাড়ে ২৫ লাখ। গত বছর বেকারের হার ছিল ৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ। রবিবার শ্রমশক্তি জরিপের ত্রৈমাসিক (অক্টোবর-ডিসেম্বর, ২০২৪) প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিএস। নতুন হিসাবপদ্ধতি অনুসারে বেকার পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরা হয়। বেকারের এই নতুন হিসাবটি ১৯তম আইসিএলএস (পরিসংখ্যানবিদদের আন্তর্জাতিক সম্মেলন) অনুযায়ী প্রস্তুত করেছে সংস্থাটি। এই পদ্ধতি অনুসারে যারা উৎপাদনমূলক কাজে নিয়োজিত থাকেন, কিন্তু বাজারে পণ্য বা সেবা বিক্রি করেন না, তারা কর্মে নিয়োজিত নন হিসেবে ধরা হয়। আগের প্রান্তিক (জুলাই-অক্টোবর) থেকে প্রথমবারের মতো এভাবে হিসাব করা হয়েছে। ১৩তম আইসিএল অনুসারেও আরেকটি হিসাব দেওয়া হয়েছে। সেখানে ২০২৪ সাল শেষে বেকার জনগোষ্ঠী হলো ২৬ লাখ ২০ হাজার তরুণ-তরুণী। জরিপ অনুযায়ী, দেশে পুরুষ বেকারের সংখ্যা ১৮ লাখ অন্যদিকে নারী ৮ লাখ ২০ হাজার। বেকারের হার বেড়ে ৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ হয়েছে। গত বছর একই সময়ে, যা ছিল ৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ। দেশে পুরুষ বেকারের হার ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং নারী বেকারের হার ৩ দশমিক ৪৬ শতাংশ। পরিসংখ্যান দেখলে সহজেই অনুমেয়, গত এক বছরের ব্যবধানে বেকার পরিস্থিতি কতটা শঙ্কিত হওয়ার মতো। বেকারত্বের কারণে নানা সমস্যায় জর্জরিত হচ্ছে কর্মক্ষম তরুণরা। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও নিজেকে মেলে ধরার সুযোগ পাচ্ছে না তারা। দ্বারে দ্বারে ঘুরেও ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে পারছেন না কর্মক্ষম এই শ্রেণিটি। সরকার বিভিন্ন সময়ে নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বললেও বেকারত্ব কমাতে পারছেন না।
১৯ মে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘দেশে এক বছরে বেকার বেড়েছে দেড় লাখ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার নিয়ম অনুসারে, তারাই বেকার হিসেবে গণ্য হবেন, যারা গত সাত দিনের মধ্যে মজুরির বিনিময়ে এক ঘণ্টা কাজ করার সুযোগ পাননি অথবা গত এক মাস ধরে কাজ খুঁজেছেন কিন্তু মজুরির বিনিময়ে কোনো কাজ পাননি। জানা গেছে, বিবিএস এবার দুইভাবে শ্রমশক্তি জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। শ্রমশক্তির তৃতীয় প্রান্তিকের ফলাফলটি ১৩তম এবং ১৯তম আইসিএলএস অনুযায়ী তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। আইএলও প্রণীত ১৩তম এবং ১৯তম আইসিএলএসে কর্মে নিয়োজিত প্রাক্কলনে পার্থক্য রয়েছে। উল্লেখ্য, শ্রমশক্তি জরিপে ১৫ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সি পুরুষ-মহিলা এবং শহর-পল্লী অঞ্চল অনুযায়ী জাতীয় পর্যায়ে শ্রমবাজারের সূচকসমূহ ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে প্রাক্কলন করা হয়। দেশব্যাপী ১ হাজার ২৮৪টি নির্বাচিত নমুনা এলাকায় দৈবচয়নের ভিত্তিতে ২৪টি করে সর্বমোট ৩০ হাজার ৮১৬টি খানা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। দেশের ৬৪টি জেলায় ১০৭ জন (মহিলা ৫৭ জন এবং পুরুষ ৫০ জন) প্রশিক্ষিত তথ্য সংগ্রহকারীদের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
চাকরির বাজারে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের সমন্বয়হীনতা বরাবরেরই। চাহিদা অনুযায়ী কর্মসংস্থান ব্যবস্থা করা যাচ্ছে না। প্রতিবছর যেসব শিক্ষিত লোক চাকরির বাজারে যুক্ত হতে চাচ্ছেন, তাদের উপযোগী চাকরি নেই। আবার বেশিরভাগ শিক্ষিত চাকরিপ্রার্থী শহরভিত্তিক কাজ করতে পছন্দ করেন। দেশে বর্তমানে চাকরির সুযোগ বাড়ছে দুটি খাতেÑ কৃষি ও উৎপাদনশীল খাতে। এসব খাতে কারিগরিভাবে দক্ষ লোকের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। কিন্তু শিক্ষিত যুবকরা এসব কাজে নিজেকে যুক্ত করতে চান না।
যেহেতু দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত, তাই বাধ্য হয়ে বহু লোক প্রতিবছর বিদেশে পাড়ি জমায়। কাজের সন্ধানে বিদেশে যাওয়া এই মানুষেরা অনেকেই অদক্ষ। অনেকে তেমন লেখাপড়াও জানেন না। প্রতারক চক্র এই অদক্ষতা ও শিক্ষাগত দুর্বলতার সুযোগ নেয়। প্রতারণার শিকার হয়ে এদের অনেকেই দেশে ফিরে এসে আবারও কর্মহীন হয়ে পড়ে। ফলে বেকার সমস্যা দিন দিন প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে। দেশে এখনও আশানুরূপ বিনিয়োগের পথ প্রশস্ত নয়। বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়ে। সেই পথটি যেহেতু আশানুরূপ নয়, তাই ঋণসুবিধা বাড়িয়ে তরুণদের স্ব-কর্মসংস্থানের পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। তা সম্ভব হলে বেকারত্বের হারও কিছুটা কমবে। আমরা মনে করি, বেকার সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। কর্মসংস্থানের জন্য সরকারি-বেসরকারি প্রাইভেট সবখাতে নজর দিতে হবে। যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অতিরিক্ত জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তর করতে হবে। জনসংখ্যাকে দেশের বোঝা নয়, সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বেকারত্ব দূর না করে নতুন বাংলাদেশ গড়া সম্ভব নয়। তাই বেকারমুক্ত দেশ গড়তে হবে। বেকার সমস্যার সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।