× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বুদ্ধ পূর্ণিমা

আসুন মৈত্রীর চর্চা করি

স্বরূপানন্দ ভিক্ষু

প্রকাশ : ১১ মে ২০২৫ ১৬:০৪ পিএম

স্বরূপানন্দ ভিক্ষু

স্বরূপানন্দ ভিক্ষু

বুদ্ধ পূর্ণিমা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র উৎসব। এই উৎসব বৈশাখ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে উদযাপিত হয় বলে এই উৎসবকে ‘ভেসাক’ও বলে। ‘বৈশাখ’ পালি ভাষায় ‘ভেসাক’ নামে পরিচিত। বিভিন্ন দেশে ‘বুদ্ধজয়ন্তী’ নামেও এ উৎসব বেশ পরিচিত।

বুদ্ধ ধর্মমতে, খ্রিস্টপূর্ব ৬২৩ অব্দে তৎকালীন ভারতবর্ষে বর্তমান নেপালের কপিলাবস্তু রাজা শুদ্ধোধন ও রানি মহামায়ার কোল আলোকিত করে জন্ম নেয় এক রাজশিশু। নাম রাখা হয় সিদ্ধার্থ। রাজপুত্র সিদ্ধার্থ গৌতমের জন্ম, বুদ্ধত্ব লাভ এবং বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণ প্রাপ্তিÑ এই তিনটি অনন্য ঘটনা শুভ বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে ঘটেছিল বলেই বৈশাখী পূর্ণিমার অপর নাম বুদ্ধপূর্ণিমা। বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণ লাভের পর থেকে বুদ্ধবর্ষ গণনা করা হয়। 

ভারতের বিহার রাজ্যের গয়ার কাছে বোধিবৃক্ষের তলে এক শুভ মুহূর্তে বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে তার মন সত্যের আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। রাজপুত্র সিদ্ধার্থ হলেন বুদ্ধ বা সম্যক জ্ঞানী বা সর্বজ্ঞতাপ্রাপ্ত।

বুদ্ধ শুধু নিজের মুক্তি নয়, পৃথিবীর সব মানুষকে দুঃখ-কষ্ট থেকে চিরমুক্ত করার জন্য তিনি তার ধর্মবাণী প্রচার করতে লাগলেন। বুদ্ধত্ব বা সর্বজ্ঞতা লাভের মাধ্যমে বুদ্ধ যে চারটি সত্যের জ্ঞান লাভ করেছিলেন তাকে চতুরার্য সত্য বলে। এই চতুরার্য সত্য হলো : ১. জীবন দুঃখময়। ২. দুঃখময় জীবনের কারণ আছে। ৩. জীবন দুঃখের উৎপত্তিনিরোধ ও দুঃখের বিনাশসাধনই দুঃখ নিরোধ এবং ৪. জীবনে দুঃখের অবসান করার উপায় তা চতুর্থ আর্যসত্য। জীবন দুঃখের অবসান করতে চাইলে আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ বা আটটি সঠিক পথ অনুসরণ, অনুকরণ ও পালন করতে হবে। এ আটটি সম্যক পথ হলোÑ

(১) সম্যক দৃষ্টি, (২) সম্যক সংকল্প, (৩) সম্যক বাক্য, (৪) সম্যক কর্ম, (৫) সম্যক জীবিকা, (৬) সম্যক স্মৃতি, (৭) সম্যক ব্যায়াম, (৮) সম্যক সমাধি।

বুদ্ধের ধর্মে ‘মৈত্রী’ শব্দটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। মহাকারুণিক বুদ্ধের বলা ‘জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক’ বেশ সমাদৃত ও প্রশংসিত। সমগ্র সত্তা বা জীবের হিত-সুখ কামনা হলো মৈত্রী। দ্বেষহীন অবস্থাই হলো মৈত্রী। সকল প্রাণী শত্রুহীন হোক, নীরোগী হোক এবং সুখে বাস করুক- এটাই মৈত্রী ভাবনার মূলমন্ত্র। বিশ্ব মৈত্রী সূত্রে বুদ্ধ বলেছেন, ‘যেসব প্রাণী দৃশ্য বা অদৃশ্য, যারা দূরে বাস করে বা কাছে বাস করে, যারা জন্মেছে বা জন্মিবে অর্থাৎ যারা মাতৃগর্ভে অথবা ডিম্বের ভেতরে আছে, যেখান থেকে পরে জন্মগ্রহণ করবে সবাই সুখী হোক।’ বুদ্ধ সব জীবের সুখ কামনা করার মাধ্যমে এ শিক্ষাই দিয়েছেন যে, জীবের সুখ বিনষ্ট হয় এমন কর্ম করা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং জীবের সুখ আনয়ন ও বৃদ্ধি হয় এমন কর্মই আমাদের সব সময় করতে হবে। ‘জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক’ কেবল মুখে আওড়ালে ফল পাওয়া যাবে না। তাই বুদ্ধের পঞ্চনীতি অনুশীলনের বিকল্প নেই। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক সর্বোপরি বিশ্বের সবাইকে সুখী হতে বা করতে হলে পঞ্চনীতি আঁকড়ে ধরে বাঁচতে হবে। সমাজ, রাষ্ট্রে কিংবা বিশ্বময় যত অশান্তি সৃষ্টি হচ্ছে এর সবকিছুর মূলে রয়েছে পঞ্চনীতির লঙ্ঘন। হত্যা, অদত্ত বস্তুগ্রহণ, মিথ্যা কামাচার, মিথ্যা ভাষণ, মাদক সেবন ও বাণিজ্য- এসব নৈতিকতাবিরোধী কাজের কারণেই যত অশান্তির জন্ম হচ্ছে।

বুদ্ধ বলেছেন- ‘তোমরা একজন আরেকজনকে বঞ্চনা করিও না। অপরকে কিছুতেই বায়-বাক্য দ্বারা ঘৃণা ও অবজ্ঞা করিও না এবং ক্রোধ ও হিংসার বশবর্তী হয়ে অন্যের দুঃখ-দুর্দশা কামনা করিও না।’ যে ব্যক্তি অপরকে নিজের মতো অন্যের সর্বদা সুখ-শান্তি কামনা করেন তার মনে ক্রোধের উদয় হয় না। কারণ ভালোবাসার মানুষের প্রতি ক্রোধ না হওয়া স্বাভাবিক। সুতরাং তিনি ক্রোধকে জয় করে ক্ষমাশীল হন। ক্রোধ মানুষের পরম শত্রু। ক্রোধের বশবর্তী হয়ে মানুষ নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাপ ও অকুশল কর্ম সম্পাদন করে। ক্রোধী চিত্ত নিজের এবং অপরের জন্য ক্ষতিকর ও অমঙ্গলজনক। এটি মানুষের ইহকালের ও পরকালের শত্রু। ইহকালে এটি মানুষের অশেষ দুঃখ-যন্ত্রণা প্রদান করে বহু অনিষ্ট ও অনর্থ ঘটায় এবং পরকালে নিরয়গামী করে। তাই বুদ্ধ বলেছেন- ‘যে ক্রুদ্ধ ব্যক্তির প্রতি উল্টো ক্রোধ প্রকাশ করে, তাতে তারই পাপ সৃষ্টি হয়, ক্রুদ্ধ ব্যক্তির প্রতি যে প্রতিক্রুদ্ধ হয় না, সেই ব্যক্তি দুর্জয় সংগ্রাম জয় করে।’ এরূপ বিষম শত্রুকে একমাত্র মৈত্রী ভাবনা দ্বারা জয় করা সম্ভব। যারা সব প্রাণীর প্রতি মৈত্রীভাব পোষণ করেন তাদের চিত্ত সবসময় প্রফুল্ল থাকে। বুদ্ধ বলছেন, মাতা যেমন তার জীবন দিয়ে নিজ সন্তানকে রক্ষা করেন, সেরূপ সর্বজীবের প্রতি অপ্রমেয় দয়া পোষণ করা হলো মৈত্রীভাব। হিংসায় আঘাত বা হত্যা চিন্তা এখানে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। এ মৈত্রী হলো জাতি-ধর্ম-বর্ণ তথা মানুষ-প্রাণী নির্বিশেষে সমগ্র জীব-জগতের প্রতি ভালোবাসা পোষণ। এ মৈত্রী চর্চার মাধ্যমে মানুষে-মানুষে, জাতিতে-জাতিতে আর কোনো হিংসাভাব থাকতে পারে না। এ ধরাধাম হয়ে উঠবে একটি পরিবার, মানুষেরা হবে একটি পরিবারের সদস্য। তখন জগতে নেমে আসবে শান্তি, মহাশান্তি। তাই বুদ্ধ বলেছেনÑ ‘জগতে শত্রুতার দ্বারা শত্রুতা নিরসন করা যায় না, একমাত্র মিত্রতা বা মৈত্রীর দ্বারা শত্রুতার নিরসন করা যায়, আর এটাই চিরন্তন সত্য ধর্ম।’

একমাত্র মৈত্রীর দ্বারা মানুষ জগতজুড়ে শান্তির পরশ নামাতে পারে। তাই সব জীব তথা প্রাণীর প্রতি মৈত্রী কামনা করা উত্তম মঙ্গল। জগতে রাগ, দ্বেষ, মোহ প্রভৃতি ত্যাগ করে প্রকৃত সুখ লাভ করার জন্য সবার প্রতি মৈত্রীভাব পোষণ করা উচিত। 

সর্বশেষ আজ মহান বুদ্ধ পূর্ণিমার দিনে বুদ্ধের নির্দেশিত ভাষায় আমরা বলি- ‘মৈত্রীর দ্বারা ক্রোধকে জয় করিব, সাধুতা দ্বারা অসাধুতাকে জয় করিব, ত্যাগের দ্বারা কৃপণকে জয় করিব, সত্যের দ্বারা মিথ্যাবাদীকে জয় করিব। এভাবে জগতের সকল প্রাণী সুখী হব।’

  • আবাসিক ভিক্ষু, ঢাকা আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহার, এমফিল গবেষক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা