× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

কার্ল মার্কস : বিস্ময়কর প্রতিভা

হোসেন আবদুল মান্নান

প্রকাশ : ০৫ মে ২০২৫ ১৪:৫৪ পিএম

হোসেন আবদুল মান্নান

হোসেন আবদুল মান্নান

উনবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে আলোচিত এবং বিস্ময়কর প্রতিভার নাম কার্ল হেইনরিখ মার্কস। যিনি কার্ল মার্কস নামেই সর্বাধিক পরিচিত। জন্ম জার্মানির রাইন প্রদেশের মজেল নদীর তীরের এক ছোট্ট শহর ট্রিয়ারে ১৮১৮ সালের ৫ মে। দার্শনিক, রাজনীতিক, সমাজবিজ্ঞানী, অধ্যাপক, সম্পাদক এসব নামে তার পরিচিতি ছিল। আমৃত্যু এক দুর্বিষহ সংগ্রামমুখর জীবন বেছে নিয়েছিলেন। বলা হয়, ‘সর্বহারাদের জন্য লড়াই করতে করতে মার্কস নিজেই হয়েছিলেন সর্বহারা’।

শৈশব-কৈশোরেই ভালো ছাত্রের সুনাম কুড়িয়েছিলেন কার্ল মার্কস। তবে শিল্পসাহিত্য রচনার দিকে প্রবল ঝোঁক ছিল। ১৮ বছর বয়সেই কবিতার একাধিক বই প্রকাশ পায়। ১৮৩৫ সালে আইন পড়তে ভর্তি হন জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে বছরখানেক পর ১৮৩৬ ভর্তি হন বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখানে এসেই বিশ্ববিখ্যাত জার্মান ভাববাদী দার্শনিক হেগেলের তত্ত্বের সঙ্গে জড়িয়ে যান। আইনের ছাত্র হলেও পরে দর্শন নিয়ে পড়েন। দর্শনজগতে হেগেলই তার শিক্ষাগুরু ছিলেন। তবে তার অ্যাবসুলেট আইডিয়া মার্কসকে ভাবিয়ে তোলে। তিনি তখন অস্থিরচিত্ত হয়ে ওঠেন। 

ধীরে ধীরে কার্ল মার্কস তার বস্তুবাদী চিন্তাভাবনায় ডুবে থাকেন এবং হেগেলপন্থিদের বিরুদ্ধে চলে যান। কারণ পৃথিবীর ইতিহাস সম্পর্কে ভাববাদী ব্যাখ্যায় তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন না। ১৮৪১ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে তিনি বার্লিনের ডক্টরস ক্লাবের সদস্য মনোনীত হন। বার্লিনেই তিনি প্রকাশ্যে হেগেলের অলীক ভাবনার বিপক্ষে তাত্ত্বিক যুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং হেগেলীয় পরম ভাবচৈতন্য এবং সত্তার বস্তুবাদী ব্যাখ্যা থেকেই পরবর্তীতে তার ‘দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ’ বা ঐতিহাসিক বস্তুবাদের দিকে ধাবিত হন। আইন এবং দর্শনের ডিগ্রি নেওয়ার পর কার্ল মার্কস জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু হতে পারেননি হেগেলপন্থিদের সরাসরি বিরোধিতায়। কিছুদিন পর জার্মানিতে ‘রাইনল্যান্ড গেজেট’ নামক একটি পত্রিকায় কাজ শুরু করেন। শিক্ষক না হয়ে হলেন সাংবাদিক। সরকারের বিরুদ্ধে আর শ্রমজীবী মজদুর শ্রেণির মানুষের পক্ষে একের পর এক ধারালো ও মানবিক কলাম লিখে সর্বহারা শ্রেণির জীবনসংগ্রামের বাস্তব চিত্র তুলে ধরা শুরু করেন। সরকার বিব্রত হয়ে ১৮৪৩ সালে সেই রাইনল্যান্ড গেজেট কাগজটি চিরতরে বন্ধ করে দেয়। ফলে কার্ল মার্কস হারালেন এর সম্পাদনার চাকরি।

কার্ল মার্ক্স  ৫ মে, ১৮১৮ – ১৪ মার্চ, ১৮৮৩

জার্মানিতে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিকূল অবস্থা সৃষ্টি হলে কার্ল মার্কস ১৮৪৩ সালের নভেম্বরে সস্ত্রীক প্যারিসে চলে যান। সেখানে ফরাসি দার্শনিক, চিন্তাবিদদের রচনা পাঠ করতে শুরু করেন। তিনি দেখলেন, পৃথিবীর ইতিহাস সম্পর্কে এদের চিন্তাভাবনাও অলীক এবং কল্পনাপ্রসূত।

তিনি এদের বক্তব্যের সমালোচনা করার জন্য ফরাসি ভাষার প্রচুর তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করলেন। সে সময়ই পরিচয় হলো দুই বছরের ছোট প্রিয়তম বন্ধু ফ্রেডরিখ এঙ্গেলসের সঙ্গে। যিনি ছিলেন আমৃত্যু দুঃখের দিনের সখা ও এক বিশ্বস্ত সঙ্গী। তার দারিদ্র্যে যাপিত দিনে দুই হাত বাড়ানোর অকৃত্রিম সহচর। তাদের সম্পর্ককে পৃথিবীর সেরা বুদ্ধিবৃত্তিক বন্ধুত্ব বলে অবহিত করা হয়। সেখানে মাত্র ১৫ মাস থেকে ১৮৪৫ সালে চলে যান বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে। সেখানে বসেই ইউরোপের শ্রমিক সংগঠনসমূহের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা শুরু। ব্রাসেলসেই কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস গঠন করেন ‘আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট লীগ’ এবং রচনা করেন দুনিয়া কাঁপানো পরিকল্পনা ‘কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো’র মূল খসড়া।

এ ইশতেহারেই তারা প্রথম সমাজতন্ত্রের পরে ‘কমিউনিজম’ শব্দটি ব্যবহার করেন। প্রকাশ ও প্রচারের পর মার্কসকে একজন বিপজ্জনক মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করে বেলজিয়াম সরকার। তাকে দ্রুত দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেন। বিতাড়িত হয়ে পুনরায় জার্মানি ফিরে যান। তবে ১৮৪৯ সালেই আবার চলে আসেন বেলজিয়ামে। তাড়িত হয়ে কোথাও টিকতে পারেননি মার্কস-এঙ্গেলস। সেখান থেকে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে পড়ার উদ্দেশ্যে সপরিবার ইংল্যান্ডে পাড়ি দেন। লন্ডন তাকে গ্রহণ করেছিল মূলত একজন ইউরোপীয় শরণার্থী হিসেবে। কেননা তার নির্বাসনগুলো ছিল মূলত রাজনৈতিক।

মার্কসের কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো জার্মান ভাষায় প্রকাশিত হয় ১৮৪৮ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। বন্ধু স্যামুয়েল মুর ইংরেজিতে এর অনুবাদ করেন। তখন কে জানত ১৮৪৯ সাল থেকে জীবনের পরবর্তী ৩৪টি বছর তাকে ইংল্যান্ডে থাকতে হবে এবং সেখানেই চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন? জন্মভূমি ত্যাগ করে কার্ল মার্কস লন্ডনের রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে থাকেন। মলিন পোশাক, কালো শ্মশ্রুমণ্ডিত চেহারা, পুরো বোহেমিয়ান জীবন, দারিদ্র্যের দুর্দশা কোনোভাবেই কেটে উঠছে না তার। স্ত্রী-সন্তানের দায় বহন করতে পারছেন না। এর মধ্যেই শুরু হলো ব্রিটিশ মিউজিয়াম লাইব্রেরিতে যাতায়াতের দিনকাল। পড়তে শুরু করলেন বিচিত্র বিষয়ে। পুঁজিবাদ, পুঁজির বিকাশ ও ব্যবহার, শ্রমিক ও শ্রমজীবীদের ফেডারেশন বা সংঘগুলোর ভূতভবিষ্যৎ ইত্যাদি। তবে ফরাসি বিপ্লবের ওপর লেখা বইপুস্তক তাকে বেশি অনুপ্রেরণা জোগায়। লেখালেখি এবং খসড়ার পর খসড়া তৈরি হচ্ছে, বারবার কাটাছেঁড়া হচ্ছে কাগজের পর কাগজ। তিনি ১৮৫৭ সালে ক্যাপিটাল বা ‘পুজি’ লেখা শুরু করেন। ১৮৬৭ সালে এসে সৃষ্টি হয় তার জগদ্বিখ্যাত বই জার্মান ‘ডাস ক্যাপিটাল’-এর প্রথম খণ্ড। যার ইংরেজি সংস্করণ বের হয় মার্কসের মৃত্যুর পর ১৮৮৬ সালে। এটা তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রচনা বা মার্কসীয় অর্থনীতির মূলভিত্তি। কার্ল মার্কস পিএইচডি করেছিলেন ১৮৪১ সালেই। তার বয়স তখন চব্বিশের কাছাকাছি। 

কার্ল মার্কসের শ্রেষ্ঠ রচনা ডাস ক্যাপিটাল বা অ্যা ক্রিটিক অব পলিটিক্যাল ইকোনমি এ্যান্ড ফিলসফি, যা পরে আরও দুই খণ্ডে লেখা শেষ করেন। লন্ডনে বসেই তিনি তার জীবনের শ্রেষ্ঠ রচনাগুলো সম্পন্ন করেন। এমনকি ভারতে ব্রিটিশ শাসনের সূচনা, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিষ্ঠা, ব্রিটিশ শাসনের ভবিষ্যৎ ইত্যাদি নানান বিষয়ে তিনি অসংখ্য প্রবন্ধ রচনা করেছেন। তার কথা ছিল, ‘দার্শনিকরা কেবল বিভিন্ন সময়ে পৃথিবীটাকে ব্যাখ্যা করেছেন। আমার কাজ হলো এটাকে বদলে ফেলা।’

১৮৮১ সালে মার্কস তার প্রিয়তমা স্ত্রী জেনিকে হারান। ২৫ বছর বয়সে দুর্বার এবং এক অনবদ্য প্রেমের বিয়ে ছিল তাদের। সেরা জুটি বলতে যা বোঝায়। জেনি তার চেয়ে চার বছরের বড় ছিলেন। তিন কন্যা ও স্ত্রীর সংসারে অনির্বচনীয় আর্থিক টানাপড়েনের দুর্বিষহ জীবৎকাল ছিল কার্ল মার্কসের। স্ত্রীকে কখনও আর্থিক সুখের মুখ দেখাতে পারেননি। মূলত স্ত্রীর মৃত্যুর পরই কার্ল মার্কস মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। তার শরীর দুর্বল হয়ে যায়, অলক্ষ্যে ধীরে ধীরে মুষড়ে পড়তে থাকেন।

১৮৮৩ সালের ১৪ মার্চ। সম্পূর্ণ কপর্দকশূন্য অবস্থায় লন্ডনের একটি অস্বাস্থ্যকর ছোট্ট কক্ষে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তখন তার বুক পকেটে পাওয়া গেল বাবা, প্রিয়তমা স্ত্রী জেনি আর বড় মেয়ের ছবি। মৃত্যুর পরে সেই হরিহর আত্মা ফ্রেডরিখ এঙ্গেলসই পকেট থেকে সেগুলো বের করেন। তার শবদেহের সৎকার করার আয়োজন হলো। দুই দিন পর উত্তর লন্ডনে অবস্থিত ঐতিহাসিক হাইগেট সিমেট্রিতে নেওয়া হলো তার দেহ। সেখানে স্ত্রীর সমাধির পাশে তাকে সমাধিস্থ করা হলো। এ মহামতির শেষকৃত্যে উপস্থিত হয়েছিলেন মোট ১১ জন শুভার্থী ও বন্ধু। সেদিন কার্ল মার্কসের সমাধিতে তার মৃতদেহের সামনে দাঁড়িয়ে মাত্র একজন কথা বললেন, তিনি তার আমৃত্যু সহচর ও প্রিয়তম বন্ধু ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস। তিনি বলেছিলেন, হিজ নেম এ্যন্ড ওয়ার্কস উইল লাইভ অন থ্রু সেনঞ্চুরিস। 

এঙ্গেলসের এমন কালজয়ী ভবিষ্যদ্বাণী বৃথা যায়নি। এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে গত প্রায় দেড়শ বছর ধরে পৃথিবীর সর্বত্র সর্বাধিক পঠিত বিষয়গুলোর মধ্যে নিশ্চয় কার্ল মার্কস অন্যতম প্রধান।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা