হাওরের কৃষি
ড. মিহির কুমার রায়
প্রকাশ : ২২ এপ্রিল ২০২৫ ১৬:৫৯ পিএম
ড. মিহির কুমার রায়
বোরো মৌসুমে হাওরাঞ্চল দেশের ৩০ শতাংশের মতো চালের জোগান দেয়। সাত জেলার হাওরে এ বছর বোরো আবাদ হয়েছে ৪ লাখ ৫২ হাজার হেক্টর জমিতে, আর হাওর ও হাওরের বাইরে উঁচু জমি মিলে মোট বোরো আবাদ হয়েছে ৯ লাখ ৫৩ হাজার হেক্টর জমিতে, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ৪০ লাখ টন চাল। এবার বৃষ্টি না হওয়ায় হাওরের সব ধান কৃষকের ঘরে উঠবে এটা আশা করা যায়। কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম, মিঠামইন ও ইটনা উপজেলায় এবার ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। দেশের কয়েকটি হাওরের কৃষি বিষয়ক প্রতিবেদনে জানা যায়, বোরো ধান কাটার এ উৎসবে শুধু কিষান-কিষানিই নয়, বাড়ির সব বয়সি মানুষই এসে হাত লাগিয়েছেন ধান কাটা, মাড়াই এবং গোলায় তোলার উৎসবে। এদের কেউ ক্ষেত থেকে ধান কাটছেন, কেউ কেউ ক্ষেতেই ধানের ‘খলা’ তৈরিতে ব্যস্ত, ধান কাটা শেষে ইঞ্জিনচালিত ট্রাক্টর দিয়ে তা জমি থেকে খলায় নিয়ে আসা হচ্ছে, খলায় মেশিন (মাড়াই কল) দিয়ে চলে মাড়াই, পরে সেখানেই শুকানো হচ্ছে মাড়াইকৃত ধান। তীব্র রোদে শুকানো ধান বস্তা ভর্তি করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে গোলায়। বিভিন্ন উপজেলার হাওরে লেগেছে বোরো ধান কাটা ও মাড়াইয়ের ধুম। এটি মাত্র একটি জেলার চিত্র।
তবে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের হাওরের ৯০ শতাংশ ফসলই এখনও কাঁচা। নেত্রকোণার হাওরেও পাকেনি বেশিরভাগ জমির ধান। এর মধ্যে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর, যা চিন্তায় ফেলেছে ওই অঞ্চলের কৃষককে। জানা গেছে, মাঠের সব ধান পাকতে আরও সপ্তাহ দুয়েক লাগতে পারে। তার আগে অতিবৃষ্টি হলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টির পাশাপাশি উজানের ঢলে হাওররক্ষা বাঁধ ভেঙে ডুবে যেতে পারে ফসল। তাই আকাশে মেঘ করলেই বাড়ে আতঙ্ক। গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে এরই মধ্যে বাড়তে শুরু করেছে নদ-নদীর পানি। আগাম বন্যার শঙ্কায় কাটছে দিন। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে এবার সুনামগঞ্জে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫০২ হেক্টর জমিতে। এখনও সিংহভাগ জমির ফসল কাঁচা। তবে এ পর্যন্ত হাওরসহ উঁচু এলাকার ১৮ ভাগ ধান কাটা হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। সবচেয়ে বেশি হাওর অধ্যুষিত জেলা সুনামগঞ্জের কৃষি বিভাগ আগাম বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের আশঙ্কায় পাকা ধান দ্রুত কাটতে কৃষককে পরামর্শ দিয়েছে। উজানে ভারী বৃষ্টির এমন পূর্বাভাসে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরের কৃষক চিন্তিত। কারণ ধান এখনও পুরোপুরি পাকেনি। এক ফসলি এসব জমির দিকে সারা বছর তাকিয়ে থাকেন হাওর অধ্যুষিত সাত জেলার কৃষক। তবে সবচেয়ে বেশি ধান হয় নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জ জেলায়। ১৫ থেকে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত ধান কাটার চূড়ান্ত মুহূর্তে বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলের আশঙ্কা রয়েছে। তাই দ্রুত ধান কাটার তাগিদও দিয়েছে জেলা প্রশাসন। এদিকে নেত্রকোণার হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটা শুরু হলেও তিন দিন ধরে বৈরী আবহাওয়ার কারণে কৃষকের কপালে চিন্তার ভাঁজ। বজ্রপাতের কারণেও কৃষককে সতর্কতায় প্রশাসন মাইকিং করেছে। সম্প্রতি জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ভারী বর্ষণে আগাম বন্যার শঙ্কা নিয়ে ফসল ঘরে তুলতে ব্যস্ত কিষান-কিষানীরা। এরই মধ্যে হাওর এলাকায় ৩১ ভাগ ধান কাটা হয়েছে জানিয়ে ৩০ এপ্রিলের মধ্যে শতভাগ ধান কাটা শেষ হবে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ।
নেত্রকোণার ১০ উপজেলার মধ্যে মদন, মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুরী হাওরপ্রধান হলেও কলমাকান্দা, আটপাড়া ও কেন্দুয়ায় বেশ কিছু হাওর রয়েছে। এসব হাওরে বর্তমানে দ্রুতগতিতে চলছে বোরো ধান কাটা ও মাড়াই। এ বছর হাওরে স্বল্প জীবৎকালীন ও উচ্চফলনশীল জাতের ব্রি-ধান-৮৮, ব্রি-ধান-৯২-এর মতো হাইব্রিড জাতের ধান রেকর্ড পরিমাণে চাষ করেছেন কৃষক। এলাকার কৃষক আনন্দের সঙ্গে ধান কাটার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। দুই দিনের বৃষ্টিতে ধান কাটায় কিছুটা ভাটা পড়েছে। তবে তেমন ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা নেই। এখন ভয়ের কারণ বজ্রপাত। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, জেলায় এ বছর মোট ১ লাখ ৮৫ হাজার ৪৬০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরে আবাদ হয়েছে ৪১ হাজার ৭৫ হেক্টর জমিতে। এরই মধ্যে ১২ হাজার ৭৩৩ হেক্টর বা ৩১ ভাগ জমির ধান কাটা হয়েছে। বোরো মৌসুমে হাওরের কৃষক যাতে আগাম বন্যা থেকে ফসল রক্ষা করতে পারেন সেজন্য কৃষিশ্রমিকের পাশাপাশি ১ হাজারের বেশি কম্বাইন্ড হারভেস্টার মেশিন রাখা হয়েছে। এরই মধ্যে ১২ হাজার ৭৩৩ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে, যা রোপণ করা ধানের ৩১ ভাগ। ৩০ এপ্রিলের মধ্যে হাওরে শতভাগ ধান কাটা শেষ হবে বলে ধারণা করা যাচ্ছে। বৃষ্টির পাশাপাশি নেত্রকোণার হাওরাঞ্চলের কৃষকের মাঝে বজ্রপাতের আতঙ্কও রয়েছে। খালিয়াজুরীর পৃথক স্থানে সম্প্রতি বজ্রপাতে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছেন একজন। তাই প্রাকৃতিক এ দুর্যোগের বিষয়ে সতর্ক থাকার জন্য মাইকিংও করা হয়েছে প্রশাসনের পক্ষ থেকে। জানা গেছে, দুই সপ্তাহ আগে থেকে হাওরাঞ্চলের কোনো কোনো জায়গায় বিশেষ করে মদন, মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুরী উপজেলায় বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে। বৃষ্টিতে তেমন কোনো সমস্যা দেখা দেবে না বলে আশা করা যায়। এর আগেই ধান কাটা শেষ হবে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পাশাপাশি বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রও সম্প্রতি ভারতের উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছে। এতে সপ্তাহব্যাপী বৃষ্টিপাতের কথা বলা হয়েছে। এরই মধ্যে বৃষ্টিও শুরু হয়েছে। সুনামগঞ্জ কৃষি বিভাগ আগাম বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের আশঙ্কায় পাকা ধান দ্রুত কাটতে কৃষককে পরামর্শ দিয়েছে। উজানে ভারী বৃষ্টির এমন পূর্বাভাসে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরের কৃষক চিন্তিত। কারণ ধান এখনও পুরোপুরি পাকেনি। পাখিমারা হাওরের একজন কৃষকের ভাষ্য ‘আমি এবার ৪ একর জমিতে ধান আবাদ করেছি। আগাম জাতের ১ একরের ধান পেকে যাওয়ায় কেটে ঘরে তুলেছি। বাকি ধান পাকতে আরও সপ্তাহখানেক লাগবে। এখন বৃষ্টিপাতের যে খবর শুনছি তাতে আমরা ভয়ে আছি।’ ভয় তাদের, ভারী বৃষ্টিপাত হলে তো সবাই মাঠে মারা যাবে। একদিকে বাঁধ ভাঙা, অন্যদিকে জলাবদ্ধতা নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষক। ধারণা করা হয়, যেহেতু আবহাওয়া খারাপের পূর্বাভাস রয়েছে, তাই কালক্ষেপণ না করে কৃষককে দ্রুত ধান কাটার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এখন পর্যন্ত সুনামগঞ্জ সদর ও শান্তিগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন হাওরে বেশিরভাগ জমির ফসল কাঁচা অবস্থায় রয়েছে। কিছু জমিতে ধান কাটা হলেও তার পরিমাণ খুবই কম। দিরাই উপজেলার তাড়ল গ্রামের রাজন চৌধুরী ১০ একর জমিতে ধান লাগিয়েছেন। আগাম জাতের ধান কাটা শুরু করেছেন, আবহাওয়া ভালো থাকলে দ্রুত সময়ে বাকি ধানও কাটা শেষ করতে পারবেন বলে জানান। রয়েছে শ্রমিকের সংকটও রয়েছে। তবে অনেক শ্রমিক এসেছেন। আবহাওয়া খারাপ না হলে সহজে দ্রুত ধান তোলা যাবে।
ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাসে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত ধান কাটার ব্যবস্থা করার পরামর্শ দিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা। এ বিষয়ে সংস্থাটির সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, ‘আগামী এক সপ্তাহ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিতে হাওরের নিচু এলাকার জমির ধান নষ্ট হতে পারে। আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত ধান কাটার ব্যবস্থা করতে হবে।’ এক ফসলি এসব জমির দিকে সারা বছর তাকিয়ে থাকেন হাওর অধ্যুষিত সাত জেলার কৃষক। তবে সবচেয়ে বেশি ধান হয় নেত্রকোণা ও সুনামগঞ্জে। তবে ১৫ থেকে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত ধান কাটার চূড়ান্ত মুহূর্তে বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলের আশঙ্কা রয়েছে।
কৃষি ক্যালেন্ডার অনুসারে এপ্রিল-মে মাসেই বোরো ধান কাটার সময় এবং বন্যা, শিলাবৃষ্টির ঝুঁকিতে কৃষক দিন কাটান; কিন্তু এ বছরটি ব্যতিক্রম বিশেষত। অনাবৃষ্টির কারণে বোরো ধানসহ সব কৃষি উৎপাদনের ওপর এর প্রভাব লক্ষণীয়। অন্যান্য বছরের মতো এবার কৃষিশ্রমিকের ঘাটতির আশঙ্কা রয়েছে। এখন করণীয় হলো ১. বোরো ফসল কাটার সময় কৃষিশ্রমিকের ঘাটতি মেটাতে যান্ত্রিক হারভেস্টারের সংখ্যা বাড়ানো। ২. ধান কাটা ও মাড়াইয়ের যন্ত্র গতবারের মতো এবারও সরকার প্রস্তুত রেখেছে এবং আগ্রহী উদ্যোক্তাদের ক্রেডিটসহ প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করছে। ২০২০ সাল থেকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও কোভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় দেশের স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিঘ্নিত হচ্ছে। এর ফলে অন্যান্য খাতের মতো কৃষিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে কৃষি খাতে স্বল্পসুদে ঋণ সরবরাহ নিশ্চিত করে কৃষককে স্বাভাবিক উৎপাদনশীল কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনাসহ কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে এ খাতে ঋণ/বিনিয়োগের সুদ/মুনাফা হার হ্রাস করা প্রয়োজন। সরবরাহ পরিস্থিতি বাড়াতে এরই মধ্যে সরকারিভাবে চাল আমদানি করা হচ্ছে। এ ছাড়া বেসরকারিভাবে চাল আমদানিতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। আমরা আশা করছি সব বাধা দূরীভূত হবে এবং আমরা আমাদের আগের রেকর্ড ধরে রাখতে সক্ষম হব ধান-চাল উৎপাদনে। সেটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।