সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৫ ২১:৪৯ পিএম
‘প্রদীপের নিচেই থাকে অন্ধকার’- প্রচলিত এ কথাটি যেন বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড (বিটিইবি)-কে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনায় যথার্থতা পেয়েছে। অভিযোগ উঠেছে ঋণের টাকার এ প্রকল্প থেকে লুটপাটের পরিকল্পনা সাজিয়েছে সংস্থাটি। যেখানে অন্যান্য প্রকল্পে প্রতি বর্গমিটার ভবন নির্মাণে খরচ ৪০-৫০ হাজার টাকা, সেখানে এ প্রকল্পে গড় ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৮ হাজার টাকা। এ ছাড়া অন্যান্য খাতেও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় ধরে লুটপাটের পরিকল্পনা করার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। জানা গেছে, সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্পটির পরিমার্জিত প্রস্তাব পাঠানো হয়। এর আগে ডিসেম্বরে প্রকল্পের মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় প্রকল্পের নানা খাতে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় প্রস্তাবের আপত্তি জানিয়ে ফেরত পাঠানো হয়। কিছু খাতে ব্যয় কিছুটা কমানো হলেও এখনও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অপ্রয়োজনীয় ও অত্যধিক ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে। উল্লেখ্য, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের আধুনিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আরও দক্ষ করে তুলতে একটি প্রকল্প গ্রহণ করছে সরকার। প্রকল্পটিতে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৯ কোটি টাকা। যার মধ্যে সরকার দেবে ২০৯ কোটি আর এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) এ প্রকল্পে ঋণ দেবে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। সে প্রকল্পের নামেই ঋণের টাকা নয়ছয়ের যত আয়োজন। পরিকল্পনা কমিশন বলছে, প্রকল্পটিতে এত ভবন নির্মাণের দরকার ছিল না। প্রকল্পে অপ্রয়োজনীয় নানা ব্যয় রয়েছে। এ প্রকল্পের জন্য ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা হলেই যথেষ্ট ছিল বলে ধারণা কমিশনের।
১৬ এপ্রিল প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘ঋণের টাকা লুটের যত আয়োজন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য। প্রতিবেদন বলছে, এ সংকটের সময়েও প্রকল্পটিতে ৩৭৮ জনের বিদেশ প্রশিক্ষণে ৬৫ কোটি ৪১ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। একেকজনের বিদেশ প্রশিক্ষণে খরচ পড়ছে ১৭ লাখ ৩০ হাজার টাকা। যদিও প্রথমে এ প্রকল্পে বিদেশ প্রশিক্ষণে ১৩৫ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছিল। প্রকল্পে পরামর্শক খাতে ১০০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। অথচ এ প্রকল্পের ভবন নির্মাণ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নিয়মিত কাজ। এ কাজে আদৌ কোনো পরামর্শকের প্রয়োজন নেই বলে মনে করছেন পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা। আরও উল্লেখ্য, প্রকল্পটিতে ভবন নির্মাণে ব্যয় প্রাক্কলন করেছে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর।
বিগত সরকারের সময় অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের চিত্র তুলে ধরে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ২০২২ সালে রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্প নেওয়া হয়। সেখানে ১০ তলা অনাবাসিক ভবন নির্মাণে প্রতি বর্গমিটারে ৩৮ হাজার টাকা ব্যয় ধরা হয়। ২০২৩ সালে আগারগাঁওয়ে সংসদ সচিবালয়ের সরকারি কর্মকর্তাদের ১৫ তলা আবাসিক ভবন নির্মাণে প্রতি বর্গমিটারে ৪৮ হাজার টাকা ব্যয় ধরা হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন আর্টস ফ্যাকাল্টি ভবন নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে মাত্র ২৩ হাজার টাকা। অথচ প্রস্তাবিত এ প্রকল্পে ১ লাখ ৩ হাজার ১০০ বর্গমিটার অনাবাসিক ভবন নির্মাণে ৭১১ কোটি ২৩ লাখ ৬১ হাজার টাকা ব্যয় ধরা হয়। অর্থাৎ প্রতি বর্গমিটারে ব্যয় পড়ছে ৬৮ হাজার ৯৮৫ টাকা। আর ৪০ হাজার ২১ বর্গমিটার আবাসিক ভবন নির্মাণে খরচ ধরা হয় ২৭০ কোটি ৪৪ লাখ ১০ হাজার টাকা। এখানে প্রতি বর্গমিটারে খরচ পড়ছে ৬৭ হাজার ৫৭৪ টাকা। এ পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে প্রকল্পের লক্ষ্যই সরকারি অর্থের তছরুপ করা।
এ কথা সত্য, একসময় কারিগরি শিক্ষাকে যথাযথ মূল্যায়ন না করলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জনমনে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এসেছে। অনেকেই এখন কারিগরি শিক্ষাকে সুন্দর ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নির্মাণের মাধ্যম হিসেবে গণ্য করেন। কারিগরি শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহও বেড়েছে শিক্ষার্থীদের। তবে এখনও দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নানা মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। শিক্ষায় আমরা এখনও কাঙ্ক্ষিত মান অর্জন করতে পারিনি। আর ভোকেশনাল ও কারিগরি খাতে তো নয়ই। এ কারণে দেশের গার্মেন্ট, টেক্সটাইলসহ প্রায় সব শিল্পের মূল কারিগরি ও প্রকৌশল খাতের কাজগুলো করানো হচ্ছে ভারত, চীন ও শ্রীলংকার কারিগরি কর্মকর্তাদের দিয়ে। এসব কারণে কারিগরি খাতের মোটা অঙ্কের অর্থ চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে। কমছে না কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় দেশি বেকারত্ব। যেখানে কারিগরি শিক্ষার মানোন্নয়ন ও দক্ষ কর্মী তৈরিতে হাত দেওয়া দরকার, সেখানে প্রকল্পের নামে অনিয়মের সংস্কৃতি বন্ধ হোক।
কোনো সেবাধর্মী সরকারি প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দুর্নীতি-অনিয়মের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা অত্যন্ত নিন্দনীয় কাজ, আর সেটি যদি হয় শিক্ষা বোর্ডের মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে, তাহলে সেই প্রতিক্রিয়ার কি কোনো ভাষা থাকে? প্রকল্পের এ অর্থ লুটের পরিকল্পনায় যারাই জড়িত থাকুক না কেন, চূড়ান্ত তদন্ত শেষে তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। আমরা মনে করি, দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিক্ষিত ও দক্ষ করে গড়ে তোলার মূল হাতিয়ার শিক্ষা বোর্ডগুলোকে আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। আশা করব, কারিগরিসহ সব ধরনের শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকার সচেষ্ট হবে এবং যেকোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবে।